ডেঙ্গুতে পেঁপে পাতার রস কি সত্যিই প্লেটলেট বাড়ায়? জানুন চিকিৎসকের মত
কলকাতা: ডেঙ্গু (Dengue Treatment) হলে রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা কমে যাওয়া নিয়ে রোগী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এই কারণেই পেঁপে পাতার রস বা নির্যাস খাওয়ার প্রবণতাও অনেকের মধ্যে দেখা যায়। প্রচলিত ধারণা হল, পেঁপে পাতা ডেঙ্গুতে কমে যাওয়া প্লেটলেট দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এখনও পর্যন্ত গবেষণা পেঁপে পাতাকে ডেঙ্গুজনিত থ্রম্বোসাইটোপেনিয়ার প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি। কিছু গবেষণায় পেঁপে পাতার প্রস্তুতি ব্যবহারের পর প্লেটলেট দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, এর ফলে রক্তক্ষরণ, জটিলতা, হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমে কি না, সেই বিষয়ে প্রমাণ এখনও সীমিত।
Also Read | স্বাস্থ্যসাথী থাকছে, আসছে আয়ুষ্মান ভারতও! কারা পাবেন সুবিধা, কত টাকার ফ্রি চিকিৎসা?
দিল্লির অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট-ইন্টারনাল মেডিসিন চিকিৎসক ডা. সঞ্চয়ন রায় ব্যাখ্যা করেছেন, ডেঙ্গুতে কেন প্লেটলেট কমে, পেঁপে পাতার বিষয়ে গবেষণা কী বলছে এবং কেন শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখেই রোগের তীব্রতা বিচার করা ঠিক নয়।
ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কেন কমে?
ডেঙ্গু সংক্রমণের সময় প্লেটলেট কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। ভাইরাস সাময়িকভাবে অস্থিমজ্জার স্বাভাবিক কার্যকলাপে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে প্লেটলেট এবং প্লেটলেট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বসূরি কোষের উৎপাদন কমে যেতে পারে।
একই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়ায় প্লেটলেট দ্রুত নষ্ট হতে পারে বা রক্তপ্রবাহ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ার সময় প্লেটলেট সক্রিয় হয়ে ব্যবহৃতও হতে পারে।
ডা. রায়ের মতে, ডেঙ্গুর জ্বরের পর্যায় এবং সংকটজনক পর্যায়ে সাধারণত প্লেটলেটের মাত্রা কমতে দেখা যায়। তবে শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গু কতটা গুরুতর হয়েছে, তা নির্ধারণ করা যায় না।
রোগীর উপসর্গ, হেমাটোক্রিট এবং অন্যান্য শারীরিক ও রক্ত পরীক্ষার ফলও একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকাতেও প্লেটলেটের পাশাপাশি সতর্কতামূলক লক্ষণ, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
Also Read | খাওয়ার পর গ্যাস, পেট ফাঁপা? খাদ্যতালিকায় এই পরিবর্তনেই মিলতে পারে স্বস্তি
পেঁপে পাতা কি প্লেটলেট বাড়াতে পারে?
পেঁপে পাতা নিয়ে গবেষকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হল এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান। এর মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ফেনলিক যৌগ রয়েছে, যেগুলো তাত্ত্বিকভাবে প্লেটলেট তৈরি বা প্লেটলেট নষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডা. রায় জানিয়েছেন, মেগাকারিওসাইট এবং থ্রম্বোপোয়েটিক পথের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াগুলি এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
কিছু গবেষণায় পেঁপে পাতার নির্যাস ব্যবহারের পর ডেঙ্গু রোগীদের প্লেটলেট দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে চারটি পরীক্ষায় মোট ৪৩৯ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিশ্লেষণে পেঁপে পাতার নির্যাসের সঙ্গে প্লেটলেট বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও গবেষকরা বড় এবং উচ্চমানের গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
গবেষণার ফল কতটা নির্ভরযোগ্য?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। পেঁপে পাতার বিষয়ে হওয়া গবেষণাগুলিতে এক ধরনের প্রস্তুতি, নির্দিষ্ট মাত্রা বা একই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। ফলে একটি গবেষণার ফল অন্য ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।
পেঁপে পাতার রস নিয়ে করা একটি স্কোপিং রিভিউতেও দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের গবেষণা ও প্রস্তুতি নিয়ে তথ্য রয়েছে এবং পেঁপে পাতার রসের কার্যকারিতা নিয়ে আরও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। ডা. রায় স্পষ্ট করে বলেছেন, প্লেটলেটের সংখ্যা বেড়েছে মানেই রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পেঁপে পাতা ডেঙ্গুর চিকিৎসার বিকল্প নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জানায়, ডেঙ্গুর জন্য বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসাই গুরুত্বপূর্ণ।
পেঁপে পাতার রস কি ক্ষতি করতে পারে?
পেঁপে পাতার রস বা ঘন নির্যাসকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বলাও ঠিক নয়। বাড়িতে তৈরি রসের উপাদান ও ঘনত্ব একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। বিভিন্ন পণ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা বা অন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। প্রস্তুতির সময় দূষণ এবং অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করতে হয়।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হল, কেউ যদি চিকিৎসকের পরামর্শের বদলে শুধু পেঁপে পাতার রসের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলেও চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
ডা. রায়ের পরামর্শ, ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ কোনও ভেষজ প্রস্তুতি ব্যবহার করলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো উচিত। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক উপাদান বলেই সেটিকে নিরাপদ বা কার্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখলেই হবে?
না। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্লেটলেটের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি চিকিৎসার একমাত্র মাপকাঠি নয়। চিকিৎসকরা সাধারণত পেটের তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো সতর্কতামূলক লক্ষণও দেখেন। পাশাপাশি রক্তচাপ, নাড়ির গতি, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং হেমাটোক্রিটের মতো বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিশেষ করে প্লেটলেট দ্রুত কমার সঙ্গে হেমাটোক্রিট বেড়ে গেলে তা শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠ চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
তীব্র রক্তক্ষরণ, শক, গুরুতর অঙ্গের সমস্যা বা পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে না পারার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমা রোগের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে, কিন্তু শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যেই চিকিৎসা করা উচিত নয়। পেঁপে পাতার রস নিয়ে কিছু আশাব্যঞ্জক গবেষণা থাকলেও এটিকে এখনও ডেঙ্গুর প্রমাণিত চিকিৎসা বলা যায় না।
তাই ডেঙ্গু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা এবং সতর্কতামূলক লক্ষণগুলির দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পেঁপে পাতার রস ব্যবহার করতে চাইলে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাই নিরাপদ।