২০-৩০-এর বয়সেই Diabetes-উচ্চ রক্তচাপ, কোন অভ্যাসে বাড়ছে ঝুঁকি?
অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: একসময় ডায়াবেটিস (Diabetes), উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ কিংবা ফ্যাটি লিভারের মতো শারীরিক সমস্যাকে মূলত বেশি বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হত। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। বয়স কুড়ি বা তিরিশের কোঠায় পৌঁছনোর আগেই অনেক তরুণ-তরুণীর শরীরে দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’। কর্মব্যস্ত জীবন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত শরীরচর্চার অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ঘুমের অনিয়ম, সব মিলিয়ে কম বয়সেই শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে যে রোগগুলিকে আগে মধ্যবয়স বা বার্ধক্যের সমস্যা বলে ভাবা হত, সেগুলিই এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে এই পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দিনের বড় একটা সময় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা মোবাইলের সামনে বসে কাটানো, অফিসে দীর্ঘক্ষণ চেয়ার থেকে না ওঠা এবং নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চার অভ্যাস না থাকা শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাইরে তৈরি খাবার, অতিরিক্ত তেল-মশলা, চিনি, নুন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরতা। ব্যস্ততার কারণে অনেকেই দিনের গুরুত্বপূর্ণ খাবার বাদ দেন, আবার কখনও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে বেশি পরিমাণে খাবার খান। এই অনিয়ম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ওজন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
Also Read | খাওয়ার পর গ্যাস, পেট ফাঁপা? খাদ্যতালিকায় এই পরিবর্তনেই মিলতে পারে স্বস্তি
তরুণদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শরীরে অতিরিক্ত মেদ, বিশেষ করে পেটের আশপাশে চর্বি জমা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ইনসুলিনের কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। অনেক সময় শুরুতে কোনও স্পষ্ট উপসর্গ না থাকায় সমস্যাটি বুঝতেও দেরি হয়। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে শুধু উপসর্গের উপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে উচ্চ রক্তচাপও আর শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়। মানসিক চাপ, অতিরিক্ত নুন খাওয়া, ওজন বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান এবং ঘুমের অনিয়ম রক্তচাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, উচ্চ রক্তচাপ অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে শরীরে প্রভাব ফেলতে থাকে। বাইরে থেকে কোনও অসুস্থতা বোঝা না গেলেও দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং রক্তনালির উপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই তরুণ বয়স থেকেই মাঝে মাঝে রক্তচাপ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
Also Read | ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় জয়: ভারতে এল প্রথম টিকা ‘কিউডেঙ্গা’
হৃদ্রোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কম বয়সে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তার মধ্যে অন্যতম। সারাদিন কাজের চাপের মধ্যে থাকা এবং বিশ্রামের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া শরীরের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বয়স কম বলেই হৃদ্যন্ত্র সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত, এমন ধারণা ঠিক নয়।
আরও একটি সমস্যা যা তরুণদের মধ্যে ক্রমশ আলোচনায় আসছে, তা হল নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে এই সমস্যার যোগ থাকতে পারে। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও অনেকের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করলে সমস্যাটি অজান্তেই থেকে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিরোধ। স্বাস্থ্যকর থাকার জন্য প্রতিদিন কঠিন কোনও রুটিন অনুসরণ করতেই হবে এমন নয়। নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মাঝে উঠে কিছুটা হাঁটাচলা করা এবং নিজের পছন্দের কোনও শারীরিক কার্যকলাপকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যেতে পারে। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন নিয়মিত শরীরচর্চা করার অভ্যাস ধীরে ধীরে তৈরি করা গেলে তা ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
Also Read | J&J-এর বিলিয়ন ডলারের মামলা: ভারতেও কি ক্যানসার দাবি? ট্যাল্ক কি নিষিদ্ধ?
খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া দরকার। অতিরিক্ত চিনি, নুন, ভাজাভুজি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং মিষ্টি পানীয়ের পরিবর্তে শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম ও উপযুক্ত পরিমাণে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারকে খাদ্যতালিকায় জায়গা দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনও একটি খাবারকে ‘ম্যাজিক ফুড’ মনে না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ঘুমকেও অবহেলা করা উচিত নয়। রাত জেগে কাজ করা, দীর্ঘ সময় ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা এবং প্রতিদিন আলাদা সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শখের কাজ করা কিংবা ধ্যান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মতো পদ্ধতিও অনেকের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কম বয়সে শরীরে কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধুমাত্র বয়সের কারণে উপেক্ষা না করা। পরিবারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। ওজন দ্রুত বাড়া, নিয়মিত ক্লান্তি, রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় কোনও পরীক্ষার ফল বদলে গেলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তবে মনে রাখা দরকার, এই ধরনের রোগের ঝুঁকি প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক রকম নয় এবং শুধুমাত্র জীবনযাত্রার কারণেই সবসময় রোগ হয় না। জেনেটিক কারণ, বয়স, অন্যান্য শারীরিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কোনও উপসর্গ বা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে উদ্বেগ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়। সময় থাকতে সচেতন হওয়া এবং ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলাই হতে পারে তরুণ বয়সে সুস্থ থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।