Rathyatra: রথের দড়ি টানলে কী কী হয় জানেন? শাস্ত্র বলছে… | Rath yatra rope pulling significance and spiritual benefits according to shastra
রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে প্রতি বছরই পুরী থেকে শুরু করে বাংলার আনাচে-কানাচে লাখো ভক্তের ঢল নামে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন কেবল একটি মুহূর্তের জন্য— মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর রথের রশিতে একটু হাত দেওয়ার জন্য। আর পাঁচটা ধর্মীয় আচারের চেয়ে রথের দড়ি টানার প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই যে ব্যাকুলতা, তার নেপথ্যে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় কারণ।
শাস্ত্র মতে, রথের দড়ি টানা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি পরম মোক্ষ লাভের এক পরম মাধ্যম। হিন্দু সনাতন ধর্মে রথের রশিতে টান দেওয়ার মাহাত্ম্য ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে শাস্ত্রে কী বলা হয়েছে, আসুন জেনে নেওয়া যাক।
স্কন্দপুরাণ এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে রথযাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে একটি অত্যন্ত বিখ্যাত শ্লোক উল্লেখ করা হয়েছে:
“রথস্থং বামনং দৃষ্ট্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।”
অর্থাৎ, রথের ওপর উপবিষ্ট বামন রূপী জগন্নাথ দেবকে দর্শন করলে এবং তাঁর রথের রশি স্পর্শ করে টানলে মানুষকে আর পুনর্জন্মের চক্রে আবর্তিত হতে হয় না। শাস্ত্রমতে, রথের দড়ি টানলে মানুষের সমস্ত সঞ্চিত পাপ ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায় এবং আত্মা সরাসরি বৈকুণ্ঠ ধামে স্থান পায়।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে এবং রথকে টেনে নিয়ে গেলে যে পুণ্য অর্জিত হয়, তা শত শত অশ্বমেধ যজ্ঞ বা কঠিন তপস্যা করার চেয়েও বেশি। কলিযুগে যেখানে কঠোর তপস্যা বা যজ্ঞ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব, সেখানে মহাপ্রভুর রথের রশি টানাই ঈশ্বর লাভের সবচেয়ে সহজ সরল পথ বলে মনে করা হয়।
কঠোপনিষদ এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুযায়ী, আমাদের এই মানব শরীরটিকে একটি রথের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
শরীর হল রথ।
বুদ্ধি হল সারথি।
মন হল লাগাম।
ইন্দ্রিয়সমূহ হল রথের ঘোড়া।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যখন কোনো ভক্ত জগন্নাথ দেবের রথের দড়ি টানেন, তখন তিনি আসলে তাঁর জীবনের সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং মনের লাগাম পরমেশ্বর জগন্নাথের হাতে সঁপে দেন। এর ফলে ভক্তের জীবন সঠিক পথে পরিচালিত হয় এবং মানসিক শান্তি লাভ ঘটে।
রথযাত্রার মূল বিশেষত্ব হলো, এই দিন স্বয়ং ভগবান তাঁর গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে পতিত পাবন রূপে আপামর জনতাকে দর্শন দেন। রথের দড়ি টানার সময় রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ চণ্ডাল— সবাই এক সারিতে দাঁড়িয়ে রশি ধরেন। শাস্ত্রমতে, এই রশি টানার ফলে মানুষের ভেতরের সুপ্ত ‘অহংকার’ বা আমিত্বের বিনাশ ঘটে। আর যেখানে অহংকার নেই, সেখানেই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান হয়।
তাই সনাতন শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, রথের দড়ি টানা কেবল একটি লৌকিক উৎসব নয়; এটি প্রতিটি মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগ্রত করার এবং জাগতিক পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার এক পরম ঐশ্বরিক সুযোগ।