আকাশ ভরে উঠছে কেঁদে, ‘হারিয়ে গেছি আমি’
টগর। নেক্সট। চম্পা। নেক্সট। জবা। নেক্সট। শিউলি। এটা জুলাই মাসে অরণ্য সপ্তাহের চারা বিলির লাইন নয়। তবে চারাগাছই। যারা মাথা তোলার আগেই নুইয়ে গিয়েছে। তাই ‘নির্ঝরের স্বপ্ন’ ভেঙে খানখান হয়ে বাড়ির লোক থানায় এসেছে মিসিং ডায়েরি করতে। এখন মেয়ের নামটুকুই সম্বল আর অ্যালবামের ক’টা ছবি। ব্যস, আর কিছুই নেই পরিবারের হাতে। বেলা বাড়ে। একে একে হিয়ারিংয়ের ডাক আসে।
‘শ্রীচরণেষু পুলিশ স্যর, প্রণাম নেবেন। তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে খুঁজে দ্যান। ইতি ডেমোনেসট্রেশন টুডু।’
অণুগল্পের লাইন নয়। পৃথিবীর সংক্ষিপ্ততম এক এফআইআর-এর বয়ান, যার অক্ষরে অক্ষরে দৃঢ়তার অভাব স্পষ্ট। পৃষ্ঠার যা হাল, পেছনেও চিঠির অম্লান মিরর ইমেজ দেখা যায়। চার লাইন লিখতেই পেনের কালি ফুরিয়ে আসে। ঘরে কলমের প্রয়োজন শেষ। তবু বহু খুঁজে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া কালির কলমেই হারানো মেয়ের জন্য যন্ত্রণার ডায়েরি লিখে এনেছেন হতভাগ্য বাবা। সিল মারা চিঠির ‘রিসিভড’ কপি নিয়ে পরম প্রত্যয়ে থানার করিডোরে অপেক্ষা করছেন। যেন জলজ্যান্ত মেয়েকে হাতে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন আজ।
আক্ষেপ এই যে, বাংলার পুজোমণ্ডপ আলো করে বসে থাকেন দেবীরা। তবু বছর বছর ঘরের লক্ষ্মীরাই এখানে ঘরছাড়া। সরস্বতীর নামে ‘সন্ধান চাই’ বিজ্ঞপ্তি জারি হয় পরিবারের তরফে। যা পরম আশ্চর্যের, বিপুল সঙ্কটেরও।
বাড়ির মেয়েদের পুজো, ঈদ, ছটপুজো, মহরম বা বড়দিনে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ বেশি। ফলে তখন ছোট ছোট ভুল বাড়ে, হারানোর সুযোগ বেড়ে যায় অহরহ। এক তদন্তকারী আধিকারিক জানালেন, উৎসবের মরসুমে মেয়েদের ‘মিসিং’ সংখ্যাও বাড়ে। অথচ যার সবটা থানায় নথিবদ্ধই হয় না। অধিকাংশ সরকারি হিসেবের বাইরেই থেকে যায় এই হারানো কন্যারা। আইন অনুযায়ী পুলিশের কাছে প্রমাণ ছাড়া সব অবিশ্বাস্য! তাই হারানোর উপযুক্ত প্রমাণ ও কারণ চায় থানা। প্রকৃত কারণ ছাড়া ডায়েরি গৃহীত হয় না। ফলে নিখোঁজ মেয়ের পরিবার ব্যর্থমনোরথ হয়ে ঘরে ফিরে যায়।
থানায় এই মুহূর্তে দূরের বেঞ্চে সার দিয়ে বসে আছেন বেলি টুডুর বাবার মতো আরও ক’জন পিতা। প্রত্যেকেই মেয়েকে গরু খোঁজার মতো খুঁজে খুঁজে শেষে নিরুপায় হয়ে থানায় এসেছেন ডায়েরি করতে। নদী, পুকুর, রেললাইনের শেষে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়েও মেয়েকে খুঁজে পাননি। কথা বলে উঠে আসে, কারও পেপারে বিজ্ঞাপন দেবার সামর্থ্য নেই, কেউ লোকলজ্জায় ক্ষতি পাহাড় ছোঁয়ার পর ছুটে এসেছেন থানায়। আবার অনেকে বিনা অর্থব্যয়ে কন্যাদায় থেকে মুক্তি পেতে সবটাই চেপে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সন্তানস্নেহে বাধ্য হয়ে এসেছেন। এমন সব অভিনব অভিভাবকরাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন থানার বারান্দায়।
চাকরির ইন্টারভিউয়ের মতো বড়বাবুর প্রশ্ন ধেয়ে আসে। কী কী পরেছিল মেয়ে? হাইট কত? তিল আছে? জড়ুল কোথায়? মাথার চুল কতটা? ভরদুপুরে প্রশ্নগুলো প্রতিধ্বনিত হয় থানার নিথর দেওয়ালে, কঠিন বারান্দায়, কয়েদিহীন শূন্য লকআপের কোণায় কোণায়।
এ দিকে বেলি টুডুর বাবা অন্ধকারে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নোটিস বোর্ডে টাঙানো সবগুলো মেয়ের ছবিকেই নিজের মেয়ে ভেবে ভ্রম হয়। ঘণ্টা পেরোয়, মিনিট ফুরোয় না। তার কন্যাভ্রম আর সংশোধন হয় না। থানার কোনও ঘরে দেখা যায় ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’-এর পর দু’টি মেয়ে দূরের ঘরটায় মুখোমুখি বসে আছে। কিন্তু এও এক অন্য রকম গল্প। কী রকম? নিখোঁজ হওয়ার দশ দিন পর খবর পেয়েও আত্মজাকে দেখতে আসেনি পরিবার। তাই কাল ভোরেই হোমে ফিরে যাবে ওরা। ‘সেফ হোম’। ‘হোম’ শব্দটাই পরিচিত, ‘সেফ’ কতটা কে জানে!
আইন বলছে, পুলিশ মিসিং ডায়েরি নিতে বাধ্য। অসহায়, কন্যাহারা মানুষকে বেশি প্রশ্ন করা নিষেধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা? সময়ে সময়ে সীমা ছাড়ায় এ প্রশ্নের সীমানা। একটা চার বাই তিনের টেবিল মুহূর্তে হয়ে ওঠে বিকল্প আদালত। মেয়ের কোনও সম্পর্ক ছিল? মিসিং-এর আগে শেষ ফোনে কার সঙ্গে কথা বলেছিল? ভেগে যায়নি তো? ভালবাসার কেস? প্রেগ টেস্ট করেছিলেন? শুনে করুণা, স্যাটায়ার রেলের বগির মতো পর পর লাইন ক্রস করতে থাকে। এক ঘণ্টার প্রশ্নবাণে জর্জরিত পিতার কন্যামুখ দর্শনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও এতে ফিকে হয়ে যায়। সরে যায় অভিভাবকের পায়ের তলার মাটি। মেয়ের পাতাল প্রবেশের আশঙ্কায় ক্রমে একটা নীরবতা ঘরময় ঘুরপাক খায়। যেন হারানো বেলির জন্য অলিখিত শোকসভার আয়োজন করেছেন থমথমে থানার বড়বাবু।
ডায়েরিটা পাক্কা তিন দিন পর ওপরতলার চাপে গ্রহণ করেছিল থানা। শবনমের মায়ের চেনাজানা লিডার ছিল কিন্তু সবার তো থাকে না। তাই এখনও বেশির ভাগ মিসিং ডায়েরি হয়তো প্রশ্নের জাঁতাকলে লিপিবদ্ধই হয় না। কারণ থানায় প্রমাণ ছাড়া সব ঘটনা অবিশ্বাস্য, অচল ও ডাহা মিথ্যে। তারা যোগ্য এভিডেন্স চায় কন্যাহারা পিতার কাছে।
একবার এক কুমোর মহল্লা শর্ট সার্কিটের আগুনে পুড়ে খাক। পরের দিন ইনসিওরেন্স কোম্পানির এক ছেলে যেচে দুয়ারে এল। সভ্য, ভদ্র, সুদর্শন। কয়েকটি কাগজে সই করিয়ে নিল। ভস্মীভূত কারখানা সারাইয়ে এক লক্ষ ক্যাশ বাবার হাতে, সঙ্গে মেয়ের জন্য চাকরি। মুম্বই গেল মেয়ে। দু’দিন পর ফোন নট রিচেবল্। পরে জানা গেল, টাকাটা ক্ষতিপূরণ নয়, ছিল মেয়ের দাম। এখন বহরমপুর রিহ্যাব সেন্টারের পাকা বাসিন্দা শহরসেরা মৃৎশিল্পী। মাঝে মাঝে টাউনবাবু আসেন দেখভালে। প্রশ্ন করলেই সে চিৎকার করে ওঠে— টাকা মাটি মাটি টাকা।
জানা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ভারতে ১৩ লক্ষের বেশি নারী ও কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র (এনসিআরবি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তারা বলছে, ওই তিন বছরে ১৮ বছরের বেশি ১০ লক্ষ ৬০ হাজার এবং ১৮ বছরের কম বয়সি আড়াই লক্ষ কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। এমনকি ২০২১ সালেই ১৮ বছরের বেশি ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার নারী ও ৯০ হাজার ১১৩ জন কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী নিখোঁজের ঘটনার রেকর্ড হয়েছে মধ্য প্রদেশে। সে রাজ্যে তিন বছরে প্রায় ১ লক্ষ ৯৮ হাজার নারী ও কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। এর পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ৯৩ হাজার নারী ও কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ৯১ হাজার নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে মহারাষ্ট্রে। তবে নিখোঁজদের মধ্যে কতজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র জানায়নি এনসিআরবি। এটাই পরিসংখ্যানের খাতায় মিশে থাকা জলের নির্ধারিত স্বরূপ ও নিত্যসঙ্গী অসত্য।
লেখক বালুরঘাট নিবাসী প্রাবন্ধিক