ক্ষোভ-বাষ্পে হাওয়া দেয় ‘অপারেশন বেঙ্গল’ই! নেপথ্যে ৩ পদ্ম-নেতা
অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
‘অপারেশন লোটাস’ অতীত! সোমবার সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করল ‘অপারেশন বেঙ্গল’ মডেল!
নতুন এই পলিটিক্যাল অপারেশনের জেরে ছারখার হয়ে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দল৷ দিন কয়েক আগে কলকাতায় যে বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিলেন তৃণমূল বিধায়ক এবং অধুনা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমবার রাজধানী দিল্লিতে সেই বৃত্তটা সম্পূর্ণ করলেন বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার৷ নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠকের পরে এ দিন দুপুরে বিদ্রোহী জোড়াফুল সাংসদদের একাংশ যান দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে।
বিক্ষুব্ধরা যে এ দিন হঠাৎ ৯ নম্বর মতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে চলে যাবেন, সেটা দিল্লির দুঁদে রাজনীতিবিদদের অনেকেই জানতেন না৷ জানতেন না পদ্ম শিবিরের অনেকেও। বিজেপি সূত্রের দাবি, ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বিদ্রোহী এমপিদের বৈঠক চলাকালীনই তাঁদের বলা হয়, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সেখানে পৌঁছচ্ছেন৷ প্রয়োজনে তৃণমূল সাংসদরা তাঁর সঙ্গেও কথা বলতে পারেন৷ কিছুক্ষণ পরে ভূপেন্দ্রর বাসভবনে পেঁৗছন শুভেন্দু এবং তাঁর সঙ্গে আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন তৃণমূল সাংসদরা৷
গত ক’দিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ অভিযোগ করছিলেন, যে মডেলে মহারাষ্ট্রে শরদ পাওয়ারের এনসিপি ও উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনাকে ভেঙেছে বিজেপি, এখানেও সেই একই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। তবে এ দিন সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন পদ্মের এক শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতা। ওই নেতার কথায়, ‘একটাই স্টাইল বা একটাই মডেল যে সব রাজ্যের জন্য প্রযোজ্য হবে, তা নাও হতে পারে৷ প্রত্যেকটি রাজ্যের প্রেক্ষিত আলাদা, ঘটনা আলাদা৷ এখানে কেস টু কেস বিচার করতে হয়৷’
তা হলে বাংলার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের ফারাক কোথায়? ওই কেন্দ্রীয় নেতার স্পষ্ট জবাব, ‘বাংলায় জনরোষ প্রবল ছিল৷ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল৷ রাজ্যের মানুষ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চেয়েছেন৷ ডাবল ইঞ্জিন সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়ন চেয়েছেন৷ মানুষের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতেই হবে৷ বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মহারাষ্ট্র বা হরিয়ানার প্রেক্ষাপটের কোনও মিল নেই৷ তৃণমূল কংগ্রেসের শেষ হওয়ার ছিল৷ সেটাই হয়েছে৷ সংসদীয় দলে ভাঙন ধরেছে৷ পর্যাপ্ত সংখ্যায় সাংসদরা এনডিএ-র প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন৷ আগামী দিনে সবাই মিলে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের নীতিতে বাংলার উন্নয়ন করা হবে৷’ এটাকেই ‘বেঙ্গল মডেল’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন পদ্মের এই কেন্দ্রীয় নেতা।
বিজেপি সূত্রের দাবি, পর্দার পিছনে থেকে এই ‘অপারেশন বেঙ্গল’ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন তিন জন হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতা৷ জল যে এত তাড়াতাড়ি গড়াতে চলেছে, সেটা কাকপক্ষীকেও টের পেতে দেননি তাঁরা৷ তা ছাড়া মহারাষ্ট্রে যখন পালাবদল হয়েছিল, সেই সময়ে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এনসিপি ও শিবসেনা শাসকের চেয়ারে ছিল। সেই অবস্থায় অজিত পাওয়ার এনসিপি থেকে এবং একনাথ শিন্ডে শিবসেনা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। বিক্ষুব্ধ শিবিরই ক্রমে এনসিপি ও শিবসেনার আইনি ভাবে ক্ষমতাসীন শিবির হয়ে ওঠে এবং তাদের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করে বিজেপি।
বাংলায় ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল পর্যুদস্ত হয়েছে। তারপরেও জোড়াফুলের হাতে ৮০ জন বিধায়ক, লোকসভা–রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪১ জন সাংসদ থাকা সত্ত্বেও একমাসের মধ্যে যে তৃণমূল ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, সেটা কেউই আঁচ করতে পারেননি। বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতার ব্যাখ্যা, ‘বাংলায় আমাদেরই যা শক্তি, তাতে এখন অন্য দল ভাঙানোর কোনও ইচ্ছেই আমাদের নেই। কিন্তু তৃণমূলের ভিতরেই যে এত ক্ষোভের বাষ্প, সেটাই ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে তাদের। এই বিক্ষুব্ধরা যদি এনডিএ–তে যোগ দিতে চান, দেবেন। এটাই বেঙ্গল মডেল।’ এই ‘অপারেশন বেঙ্গল’–এর অন্যতম কুশীলব তৃণমূলের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং লোকসভার সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের ক্ষোভের বাষ্পকে শুধু ‘চ্যানেলাইজ়’ করেছেন পদ্মের তিন কেন্দ্রীয় নেতা— এমনই দাবি বিজেপি সূত্রের।