বয়স্কদের টোপ, নয়া ফাঁদ ‘ফ্রেন্ডশিপ ফ্রড’
বন্ধু চেনা বিষম দায়, এই আপ্তবাক্যের সঙ্গে তো কমবেশি সকলেই পরিচিত। অতএব বন্ধুর বেশে শত্রুর আগমনে আজ আর কেউ সে রকম অবাক হন না। তবে কিনা, তারও রকমফের আছে। ছাত্রজীবনে, কর্মজীবনে এ’ হেন উৎপাতের বিচিত্র ঘটনা দেখা যায়, তা থেকে বাঁচার নানা কারসাজির নিদানও শোনা যায়। কিন্তু খেলাটা কঠিন হয়ে যায়, যদি ব্যাপারটা ঘটে অবসরজীবনে।
দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে হঠাৎ অবসর নিলে বোঁ করে জীবনের সরলরেখাটা এলোমেলো হয়ে যায়। কেউ একাকীত্বে পড়েন, কেউ নিঃসঙ্গ হয়ে যান। কেউ হয়তো বিয়ে-থা করেননি, ফলে নিঃসঙ্গতার মাত্রাটা কিঞ্চিৎ বেশি। কেউ সংসারী হয়েও কালের নিয়মে সন্তানকে পাড়ি দিতে হয়েছে বিদেশ-বিভুঁইতে। কেউ বা নানা অন্যান্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা ছদ্ম চেষ্টা চালান। যার মধ্যে অন্যতম— সমাজমাধ্যমে উপস্থিতির হার বাড়িয়ে দেওয়া। আলাপ-পরিচয় হয় কখনও সমবয়স্ক প্রৌঢ়ের সঙ্গে, আবার কখনও সাক্ষাৎ হয় কোনও অসমবয়সী, অপেক্ষাকৃত তরুণ কারওর সঙ্গে। কিন্তু এই পথ ধরেই যে বিপদ আসতে পারে, সে নিয়েও এবার সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
এই নতুন বিপদের নাম ‘ফ্রেন্ডশিপ ফ্রড’ বা বন্ধুরূপী জালিয়াতি। কী রকম? অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়দের এই নিঃসঙ্গতা ভরাট করতেই সমাজমাধ্যমের সূত্র ধরেই আলাপ করে অল্পবয়সী কোনও জালিয়াত। গড়ে ওঠে অসমবয়সী বন্ধুত্ব। শুরু হয় আস্থা অর্জনের চেষ্টা। তার পরে শুরু হয় আসল খেলা। নানা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করে ক্রমশ সেই প্রৌঢ়কে বিশ্বাস করানো হয় যে, তাঁর নতুন বন্ধুটি অভাবী। ফলে সরল বিশ্বাসে সেই অভাব পূরণের ফাঁদে পা দেন তাঁরা। আর তাতেই ফাঁক হয়ে যায় তাঁদের সঞ্চয়। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন নাকি এ প্রায় ‘স্বাভাবিক’ ঘটনার পর্যায়েই চলে গিয়েছে।
এক ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাঙ্কের তরফে অন্তত এমনটাই জানানো হয়েছে। ব্যাঙ্কের সাইবার বিশেষজ্ঞদের কথায়, খুব নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে এই ধরনের জালিয়াতি হয়। প্রথমেই বেছে নেওয়া হয় একজন নিরীহ ‘টার্গেট’। অবসরপ্রাপ্ত, বয়স্ক ও নিঃসঙ্গ কোনও ব্যক্তি। সমাজমাধ্যমের নানা সূত্র ধরে তাঁর সঙ্গে আলাপ জমায় জালিয়াত। এমন ভাব করে, যেন নতুন আলাপী। পরিচয় দেয় কলেজের ছাত্র বা সদ্য চাকুরে বলে। তারপর শুরু হয় খেলা। একটু আলাপ জমাটি হলেই বলা হয়, কলেজের নতুন কোর্সের জন্য একটা পাঠ্যবই কিনতে হবে, কিছু টাকা ধার হবে? বয়স্ক ব্যক্তি ভালোই সঞ্চয় করেছেন, ওই ক’টা টাকা আর এমন কী! তা ছাড়া ছাত্রজীবনে বইপত্র কেনার ঝামেলা তো তাঁকেও পোহাতে হয়েছে। দিয়ে দিলেন টাকা! এখন তো আর টাকা দিতে গেলে দেখাসাক্ষাৎ করতে লাগে না, ফোন নম্বরেই কাজ হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শিকারের ক্ষেত্র। কখনও জালিয়াত বলে, তার বাড়ির লোক খুব অত্যাচারী, সে একা গিয়ে থাকছে কোথাও, কিছু টাকা পাঠান। কখনও বলে, নতুন ক্লাস শুরু, কিছু হাতখরচের টাকা দিন। এই করতে করতে কখন যে দেওয়া টাকার অঙ্ক হাজার-হাজার ছাড়িয়ে যায়, কেউ টেরই পান না। যখন টের পান, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।
তাহলে উপায় কী? ওই যে, ঘুরেফিরে সেই একই কথা। সাবধানতা, সতর্কতা। ব্রিটিশ ব্যাঙ্কের এক শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক যেমন বললেন, ‘নতুন বন্ধু পাতান, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু কথাবার্তা টাকাপয়সার দিকে এগোলেই সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হোন। দরকারে পুলিশের সাহায্য নিন।’
সৌরদীপ চট্টোপাধ্যায়