বঙ্গের পরিবর্তনে খুশি সিআর পার্ক, সিয়াটলও
সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
বাংলায় গেরুয়া ঝড়ের রেশ পৌঁছে গেল কলকাতা থেকে দেড় হাজার কিমি দূরে অবস্থিত ‘মিনি কলকাতা’ হিসেবে পরিচিত দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কেও৷ সোমবার ভোটগণনা শুরুর পরে বেলা যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে বিজেপির সাকসেস রেট৷ পাল্লা দিয়ে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গিয়েছে উল্লাস৷ দুপুরের পর থেকেই চিত্তরঞ্জন পার্কের বিভিন্ন ব্লকে বাজি পোড়ানো শুরু হয়ে যায়৷ সঙ্গে চলে গেরুয়া আবির খেলা এবং দেদার মিষ্টি বিতরণ৷ আট থেকে আশি সব বয়সের প্রবাসী বাঙালিদেরই একটা বড় অংশ উত্সবে মেতে ওঠেন৷ এমনকী, সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের প্রাক্তন স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল, বর্ষীয়ান আইনজীবী অভিজিত্ সেনগুপ্তকেও দেখা যায় গেরুয়া সেলিব্রেশনে৷ কোন অঙ্কে বঙ্গে বাজিমাত করল বিজেপি? কেন ব্যর্থ হল তৃণমূল? অভিজিতের ব্যাখ্যা, ‘বাংলার মানুষ ক্ষোভে ফুটছিলেন৷ তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভোটের ফলাফলে৷ আরজি কর কাণ্ড এবং তৃণমূল সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি বাংলার মানুষ সহ্য করতে পারেনি৷ যে সব নেতা মন্ত্রী বুক ফুলিয়ে দুর্নীতি করেছে, জেলে গিয়েছে, তাদেরই আবার ভোটে প্রার্থী করা হয়েছে৷ অন্য দিকে রাজ্যের খেটে খাওয়া সরকারি কর্মীদের ডিএ দেওয়া নিয়ে ছেলেখেলা করেছে রাজ্য সরকার৷ ডিএ যে দিতেই হবে, এটা জানার পরেও বিভিন্ন আইনি জটিলতা তৈরি করে তা আটকে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর৷ সব কিছুরই বদলা নিয়েছে জনতা।’
সিআর পার্কেরই বাসিন্দা ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উত্পল ভট্টাচার্য রাস্তায় নেমে বিজয়োল্লাসে মাতেননি৷ তবে তাঁরও মতে, তৃণমূল সরকারের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ আরজি কর চ্যাপ্টার৷ তাঁর কথায়, ‘হাসপাতালের কর্মরত চিকিত্সকের ওই নৃশংস হত্যা বাঙালির বিবেকে আঘাত করেছে৷ তারপরে রাজ্য সরকার যে ভাবে ওই হাসপাতালের অভিযুক্ত প্রিন্সিপালকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, তা আরও কদর্য রূপ দিয়েছে গোটা চিত্রনাট্যকে৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিসীম দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি হারানোর বিষয়টি৷ সবেরই ফল ভুগতে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে৷’
একই সুর শোনা গেল চিত্তরঞ্জন পার্কের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী দেবু ভট্টাচার্যের গলাতেও৷ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘বাংলায় একটা পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল৷ দূর থেকে বসে আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে যে রাজ্যের গোটা সিস্টেমটা কেমন একটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, যেখানে রাজ্যের সার্বিক বিকাশ থমকে গিয়েছে৷ ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার হাওয়া এতটাই প্রবল ছিল যে রাজ্যের ভোটাররা তাঁদের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন৷’
দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গের বাসিন্দা কোয়েলি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমেই জানান, তাঁর বাঙালি স্বামী সিআরপিএফ-এর উচ্চপদস্থ কর্তা এবং এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গেই আছেন, ভোটের কাজে৷ এর পরেই তাঁর দাবি, ‘এ বার বাংলার মহিলারা মাথা উঁচু করে ঘোরাফেরা করতে পারবেন৷ কর্তব্যরত অবস্থায় তাদের নিশ্চয়ই আর হেনস্থা, নৃশংসতার শিকার হতে হবে না৷ রাজ্য যতটা পিছিয়ে গিয়েছে গত ১৫ বছরে, ততধিক দ্রুত গতিতে এ বার বাংলাকে এগোতে হবে৷’
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলে একই রকম খুশির ছোঁয়া ধরা পড়েছে বিদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যেও৷ নিউ জ়িল্যান্ডের অকল্যান্ড থেকে যোগা-বিশেষজ্ঞ নীল ঘোষাল বলেন, ‘এ বার হয়ত আমরা সোনার বাংলা দেখতে পাব৷ ২০১১-য় যখন সিপিএম সরকার চলে গিয়ে তৃণমূলের সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনও বিদেশে বসেই ভেবেছিলাম বাংলার সার্বিক বিকাশ হবে৷ বাংলা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে জগত্সভায়৷ কিন্তু তা হয়নি৷ ফলে দেড় দশক পরে রাজ্যের উন্নতির স্বার্থে হওয়া এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানানোই আমাদের কর্তব্য৷’
বাংলা থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরে অবস্থিত মার্কিন মুলুকে মাইক্রোসফট কর্ণধার বিল গেটসের পাড়া বিজ়নেস হাব সিয়াটলে বসে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের হাল হকিকত জেনেছেন ‘বোয়িং’ সংস্থার ডিরেক্টর, কলকাতার আদি বাসিন্দা অভীক ভট্টাচার্য৷ তাঁর মতে, ‘আরজি কর, দুর্নীতি এবং ২৬ হাজার সরকারি কর্মীর চাকরি চলে যাওয়ার মতো ফ্যাক্টর গুলি তো আছেই, এর বাইরেও আমার মনে হয় বাংলার সাধারণ মানুষ এ বার রাজ্যের সার্বিক বিকাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন৷ গত ১৫ বছরে যে উন্নয়ন হয়নি, সেটা বুঝতে পেরেই তাঁরা এবার পরিবর্তন নিশ্চিত করেছেন৷’