In Depth on Tata Group Clash: রতন টাটা চোখ বুজতেই ভেঙে টুকরো টুকরো TATA সাম্রাজ্য! কী চলছে অন্দরে? – Bengali News | In Depth on TATA Group: After Ratan Tata’s Demise. is Tata group Breaking? What is Happening inside India’s Trusted Group
রতন টাটা। একটা নামই যথেষ্ট। দেশের মানুষের আশা-ভরসা ছিলেন এই ব্যক্তি এবং তার সংস্থা। দেশের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান টাটা গ্রুপ। তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যেমন টিসিএস, তেমনই টাটা স্টিল, টাটা মোটরস, টাটা পাওয়ার, টাটা ক্যাপিটালস, এয়ার ইন্ডিয়া, টাইটান- টাটা গোষ্ঠীর সংস্থা গুনে শেষ করা যাবে না। তবে রতন টাটার সাজানো সুখের সংসারে কি ফাটল ধরল তার অবর্তমানে? টাটা গ্রুপের অন্দরে এমন কিছু ঘটছে, যা নিয়ে এই প্রশ্নই উঠে আসছে। চিন্তায় পড়েছে সরকারও।
দেশের অন্যতম বড় শিল্পপতি তথা উদ্যোগপতি ছিলেন রতন টাটা। ১৯৩৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর টাটা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রতন টাটা। অল্প বয়সে তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হওয়ায় ঠাকুমার কাছে বড় হয়েছিলেন রতন টাটা।
আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে আর্কিটেকচার ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি এবং হার্ভার্ড অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন রতন টাটা। ১৯৬২ সালে টেলকো সংস্থায় সামান্য কর্মী হিসেবে কাজ করা শুরু করেছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান পদে বসেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন তিনি। এরপর তিনি চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে আসেন। তবে টাটা গ্রুপ ও ট্রাস্ট্রের বোর্ড সদস্য হিসাবে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
টাটা গ্রুপের শিরায় মিশে ছিল রতন টাটার নাম। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। এরপরে টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান পদে বসেন তাঁর সৎ ভাই নোয়েল টাটা। এক বছর সব ঠিকঠাকই চলল। তবে সংস্থার অন্দরে কি সব ঠিক আছে আদৌ। রতন টাটার প্রয়াণের পরই টাটা গ্রুপে (TATA Group) অশান্তি? বাড়ছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। টাটা গ্রুপের শীর্ষকর্তাদের মধ্যে ঝামেলা দেখে চুপ করে থাকতে পারল না কেন্দ্রীয় সরকারও। টাটা ট্রাস্টে আবার আগের মতো স্থিতাবস্থা ফেরানোর কথা বলল সরকার।
টাটা গ্রুপে অস্থিরতা-
দ্য ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, রতন টাটার অবর্তমানে দেশের সবথেকে বড় কনগ্লোমারেটে, টাটা ট্রাস্টের চারজন ট্রাস্ট্রি ‘সুপার বোর্ড’ হিসাবে কাজ করছেন। টাটা গ্রুপের নতুন চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার কর্তৃত্ব মানতে নারাজ তারা। নোয়েল টাটার নির্দেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
জানা গিয়েছে, টাটা গ্রুপের মধ্যে এই অস্থিরতার খবর পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা, ভাইস চেয়ারম্যন বেণু শ্রীনিবাসন, টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন এবং ট্রাস্ট্রি সদস্য ডারিয়াস খামবাটার সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে এবং সেই বৈঠকেই কেন্দ্রের তরফে কড়া বার্তা দেওয়া হয় যে টাটা গ্রুপে যেভাবেই হোক, স্থিতাবস্থা ফেরাতে হবে। আভ্যন্তরীণ বিরোধ যেন টাটা সন্স-র কাজে কোনওভাবে প্রভাব না ফেলে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, কেন্দ্রের তরফে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে টাটা গ্রুপের শীর্ষকর্তারা যেন পদক্ষেপ করেন, যদি কোনও ট্রাস্টির জন্য গ্রুপে স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়,তাহলে প্রয়োজনে তাঁকে বাদও দিতে পারেন। টাটা গ্রুপের বিশাল আকার, বাজারে তার প্রভাব, অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী। টাটা গ্রুপের অন্দরে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তা গোপনে এবং সংস্থার অন্দরেই যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। জনসমক্ষে বিষয়টি নিয়ে যেন শোরগোল না হয়।
সমস্যার মূলে কারা?
জানা গিয়েছে, মুম্বই ফেরার আগে টাটা গ্রুপের ৪ প্রতিনিধি নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেন। সূত্রের খবর, দারিয়াস খামবাটা, জাহাঙ্গির এইচসি, প্রমিত জাভেরি ও মেহলি মিস্ত্রি- এই চারজন ট্রাস্টিই সমস্যার মূলে। তারা ভেটোর ক্ষমতা প্রয়োগ করে টাটা সন্সের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন এবং ডিরেক্টর নিয়োগ করেছেন। এই নিয়েই সংস্থার অন্দরে শোরগোল পড়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর ৯ অক্টোবর রতন টাটার প্রয়াণের পরই টাটা গ্রুপের মধ্যে বিভেদ, বিরোধ দেখা গিয়েছে। নোয়েল টাটা ও দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
যে টাটা গ্রুপ সুশৃঙ্খল হিসাবেই পরিচিত, তা নিয়ে কিন্তু আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন রতন টাটা নিজেও জড়িয়ে পড়েছিলেন সেই ঝামেলায়। সময়টা ২০১৬ সাল। কর্পোরেট দুনিয়ায় আজও আলোচ্য রতন টাটার জীবনের সেই অন্ধকারময় অধ্যায়। কী ঘটেছিল? সাইরাস মিস্ত্রিকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল অপ্রত্যাশিতভাবে।
১৯৯১ সালে যখন জেআরডি টাটার উত্তরসূরি হিসেবে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে রতন টাটাকে নিয়োগ করা হয়েছিল, সেই সময় সমর্থন করেছিলেন সংস্থার শেয়ারহোল্ডার, পালোনজি মিস্ত্রি। তাঁর সমর্থন না থাকলে, টাটা সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করা রতন টাটার পক্ষে এত মসৃণ হত না। টাটা পরিবারের সঙ্গে মিস্ত্রি পরিবারের ঘনিষ্ঠতার শুরু হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। টাটা সন্সে অংশীদারিত্ব পেয়েছিল মিস্ত্রিরা। টাটা সন্সে মিস্ত্রি পরিবারের শেয়ার হোল্ডিং ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। সেই সময় সংস্থার ভোটে অংশ নিতে পারত না টাটা ট্রাস্ট। তাদের সিদ্ধান্তকে ভোটে জেতানোর কাজ করতেন পালোনজি। রতন টাটা যখন যেভাবে টাটা সাম্রাজ্যকে গড়তে, পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন, পালোনজি মিস্ত্রি তাতে সমর্থন করেছিলেন। রতন টাটার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেননি। রতন টাটার সঙ্গে পালোনজি মিস্ত্রির এই ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক, অবশেষে পারিবারিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। পালোনজি মিস্ত্রির মেয়ে বিয়ে করেছিলেন রতন টাটার সৎ ভাই, নোয়েলকে।
২০০০ সালে, সংস্থার পরিচলন পদ্ধতিতে এক বড় সংস্কার এনেছিলেন রতন টাটা। চাপ দিয়ে সরকারি আইন সংশোধন করিয়েছিলেন। যার ফলে, টাটা সন্সের বোর্ডে টাটা ট্রাস্ট সম্পূর্ণ ভোটাধিকার পেয়েছিল। ফলে, টাটা সন্স এবং টাটার অন্যান্য সংস্থাগুলির উপর টাটা ট্রাস্টের প্রভাব ফিরে আসে। পালোনজি মিস্ত্রির সমর্থনের প্রয়োজন ফুরোয়। ২৫ বছর দায়িত্ব পালনের পর, ২০০৫ সালে টাটা সন্সের বোর্ড থেকে অবসর নেন পালোনজি। তাঁর পর তাঁর জায়গা নেন তার ছেলে, সাইরাস মিস্ত্রি। তাঁর সঙ্গেও রতন টাটার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল।
বন্ধুত্ব থেকে শত্রুতা-
অবসর নেওয়ার আগে টাটা সন্স-এর অ্যাসোসিয়েশনের বিধিগুলি সংশোধন করে, টাটা ট্রাস্টকে ভেটো অধিকার এবং ডিরেক্টর মনোনীত করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন রতন টাটা। ফলে, টাটা সন্সের উপর টাটা ট্রাস্টের সম্পূর্ণ প্রভাব কায়েম হয়েছিল। টাটা সন্স থেকে অবসর গ্রহণের পরও, টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন রতন টাটা। সাইরাস মিস্ত্রির কাজকর্ম তত্ত্বাবধান করার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁর ছিল। প্রাথমিকভাবে এতে কোনও অসুবিধা না হলেও, পরের কয়েক বছরে রতন টাটা এবং সাইরাস মিস্ত্রির সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ফলে, ২০১৬ সালে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে সাইরাসকে সরিয়ে দিয়েছিলেন রতন টাটা।
কী ঘটেছিল বোর্ড মিটিংয়ে?
মিস্ত্রি ও টাটা ট্রাস্টের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে তৈরি হচ্ছিল মতবিরোধ। টাটা ট্রাস্ট -যারা টাটা সন্সের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে — দাবি করেছিল যে মিস্ত্রি তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় তৈরি করেননি।
২০১৬ সালের অক্টোবরে টাটা সন্স বোর্ড বৈঠকে “any other business” এজেন্ডায় সাইরাস মিস্ত্রিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বোর্ডের প্রায় সবাই এ সিদ্ধান্তে সায় দেন, কেবল দু’জন বিরত থাকেন। মিস্ত্রি নিজে দাবি করেছিলেন, তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগই দেওয়া হয়নি, যা কর্পোরেট নীতি অনুযায়ী অস্বাভাবিক।
মিস্ত্রি তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে বোর্ডকে লিখিত চিঠিতে বলেছিলেন, “চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়ার আগে তাকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি নিজেকে আত্মরক্ষা করার” — যা তিনি বলেন কর্পোরেট ইতিহাসে অনন্য ঘটনা।
মিস্ত্রিকে ‘ইচ্ছাকৃত পদত্যাগ’ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে সমঝোতা হিসাবে। তবে তিনি পদত্যাগ না করে তাঁর কথা বোর্ডে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। পরে মাত্র দুই সদস্য বাদে বেশিরভাগ বোর্ড সদস্য মিস্ত্রির অপসারণের পক্ষে ভোট দেন।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যপক। কর্পোরেট সেক্টরে ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যে এমন ভাবে সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে অপসারণ করা কি আদর্শ ও নীতি সম্মত?
মিস্ত্রি উল্লেখ করেছিলেন যে টাটা গ্রুপের বিভিন্ন শাখায় — বিশেষ করে টাটা স্টিল , টাটা পাওয়ার, টাটা ডোকোমো — ক্ষতির মুখোমুখি ছিল, এবং তিনি নিজেকে বাধ্যবাধকতার মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হত বলে অনুভব করতেন। এই বিতর্কগুলি শুধুমাত্র এক কোম্পানির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয় — কর্পোরেট শাসন, নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষের প্রতিফলনও ছিল।
২০১৬-র ডিসেম্বরেই টাটা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন সাইরাস। টাটাদের বিরুদ্ধে কর্পোরেট অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেন তিনি। এই আদালতের লড়াই চলেছিল ২০২১ সাল পর্যন্ত। প্রথমে মামলাটি কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনালে দায়ের করেছিলেন সাইরাস মিস্ত্রি। কিন্তু, এরপর তা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। সাইরাসের করা মামলাকে দেশের শীর্ষ আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছিল টাটা সন্স। ২০২১-এ টাটা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে করা সাইরাসের অভিযোগগুলি খারিজ করে দেয়। আইনি জয় পেয়েছিল টাটারা। কিন্তু, একইসঙ্গে হারিয়ে ছিল আট দশকের বিশ্বস্ব ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বন্ধুকে।
২০২২-এর জুনে পালোনজি মিস্ত্রির প্রয়াণ ঘটে। তার কয়েক মাস পরই, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে এক পথ দুর্ঘটনায় অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যু হয় সাইরাসেরও। পরপর দুটি মৃত্যুর পরও রতন টাটা একটিও কথা বলেননি। সামান্য শোকবার্তাটুকুও দেননি। যে রতন টাটা, সংস্থার কোনও সামান্য কর্মী অসুস্থ জানলেও মুম্বই থেকে পুনে ছুটে যেতেন, তাঁর এই আচরণ ছিল একেবারেই অচেনা।