EXPLAINED: ভোট না টাকা? বাংলায় ভুয়ো ভোটারের রমরমা কেন? – Bengali News | In depth: fake voters in West Bengal
ভারতীয় নাগরিক না হয়েও কীভাবে ভোটার কার্ড বানিয়ে ফেলছেন নিউটনরা?Image Credit source: TV9 Bangla
কলকাতা: হাতে গোনা আর কয়েকমাস। তারপরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। আর আগে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে রাজ্যে ভুয়ো ভোটার নিয়ে চাপানউতোর তৈরি হয়েছে। একদিকে, ভুয়ো ভোটার ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার লিস্টে নাম তোলা নিয়ে শাসকদলকে বিঁধছে বিরোধীরা। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভুয়ো ভোটার বেরিয়ে আসছে। দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে কোটা বিরোধী আন্দোলনে যোগদানকারী সেদেশের নাগরিকও এ রাজ্যের ভোটার। আবার কেউ প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের টাকা দিয়ে ভোটার কার্ড বানিয়েছেন। কী বলছে শাসকদল? কী বলছে বিরোধীরা?
রাজ্যে ভুয়ো ভোটার নিয়ে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-
গত ২৭ ফেব্রয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূলের সভায় ভুয়ো ভোটার নিয়ে সরব হয়েছিলেন শাসকদলের সুপ্রিমো তথা মুখ্য়মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলায় জেলায় ভুয়ো ভোটার ধরতে দলের কর্মীদের নির্দেশও দেন তিনি। এর জন্য শাসকদল একটি কোর কমিটি গঠন করেন। জেলা ভিত্তিক কোর কমিটি গঠন করা হয়। নেতাজি ইন্ডোরে ওই সভার আগে ভুয়ো ভোটার ইস্যুতে বিধানসভায়ও সরব হয়েছিলেন তিনি। তিনি দাবি করেন, ভিনরাজ্যের লোকেদের নাম অনলাইনে ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভুয়ো ভোটার নিয়ে শাসকদলকে নিশানা বিজেপির-
জেলায় জেলায় রাজ্যের শাসকদল যখন ভুয়ো ভোটারের খোঁজে নামে, তখন তৃণমূলকে পাল্টা নিশানা করে বিজেপি। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ভোটার তালিকা ভেরিফিকেশন অফিসার কে? বাংলায় ১৬ লক্ষ ভুয়ো ভোটার আমরা চিহ্নিত করে দিয়েছি। বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেগুলো আমরা ডিলিট করাব।” শুভেন্দুর মতো ভুয়ো ভোটার ইস্যুতে সরব হন বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। শাসকদলকে আক্রমণ করে তাঁর বক্তব্য ছিল, “তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেতৃত্বের কিছু বলার আগে কোনও ট্যাক্স লাগে না। যা পারছেন বলে দিচ্ছেন। ভোটার তালিকা বানানো, চেক করা, সংযোজন-বিয়োজন সবটাই তো জেলাশাসকের হাতে। জেলাশাসককে কে নিয়োগ করেন?”
জেলায় জেলায় ভুয়ো ভোটার-
শাসক-বিরোধীদের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের মধ্যে জেলায় জেলায় ভুটো ভোটারের হদিশ পাওয়া যায়। এমনকি, কেন্দ্রীয় সরকারের ভারতীয় পোস্ট অফিসে কর্মরত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ভুয়ো ভোটার কার্ড তৈরির অভিযোগ ওঠে। আবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে এমন এক ভোটারের খোঁজ পাওয়া যায়, যিনি বাংলাদেশের কোটা আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। তিনি ওই দেশেরই নাগরিক। ভারতীয় ভোটার কার্ড পেলেন কীভাবে? জেলায় জেলায় এর খোঁজ করতে গিয়েই সামনে এল অবাক করা সব তথ্য।
‘১০ হাজার টাকা তৃণমূলকে দিয়েছি’, বলছেন ‘বাংলাদেশি’
কাকদ্বীপের রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ ও প্রতাপাদিত্যনগর গ্রাম পঞ্চায়েত। এই তিনটি এলাকায় বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ এসে বসবাস করছেন বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। তাঁদের অনেকের ভোটার কার্ডও হয়েছে। কীভাবে তাঁরা ভোটার কার্ড পেলেন? সুজন সরকার নামে বাংলাদেশ থেকে এসে ভোটার কার্ড পাওয়া এক ব্যক্তির সরল স্বীকারোক্তি, “আমরা পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর এখানে আছি। জন্ম সার্টিফিকেট নেই। তবে আধার আছে।” এরপর তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী আগে ভোটার হয়েছেন। আমার কাগজপত্র অনেক দিন আগেই জমা দিয়েছি। কিন্তু হয়নি। পরে অল্প টাকা পয়সা দিয়ে ভোটার হয়ে গিয়েছে। দশ হাজার টাকা তৃণমূল পার্টিকে দিয়েছি। প্রায় চার-পাঁচ বছর হয়ে গিয়েছে…।” এখানেই বসবাসকারী অনেকে আবার বলছেন, তাঁরা টাকা দিতে পারেননি। তাই তাঁরা ভোটার কার্ড পাননি।
সরকারি কর্মীদের একাংশকেই তোপ তৃণমূল বিধায়ক মন্টুরামের-
কাকদ্বীপে এত ভুয়ো ভোটার কীভাবে? শাসকদলের বিধায়ক এর পিছনে প্রশাসনিক কর্মীদের একাংশকেই নিশানা করছেন। কাকদ্বীপের তৃণমূল বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরার বক্তব্য, “দীর্ঘদিন ধরে এরা এখানে আসে। আর কিছু দালাল চক্র আর কাকদ্বীপের এসডিও, বিডিও অফিসের লোকজন এই অনিয়ম করেছেন। তাদের প্রশাসন খুঁজে বের করুক। এখানে লক্ষ লক্ষ টাকার গল্প। অর্থের বিনিময়ে এই কার্ড বানিয়েছে।”
বাংলাদেশে কোটা বিরোধী আন্দোলনে যোগদানকারীর নাম বাংলার ভোটার তালিকায়-
বাংলাদেশে কোটা বিরোধী আন্দোলনে দেখা গিয়েছে তাঁকে। কাঁধে লাঠি নিয়ে সগর্বে দুই আঙুল দিয়ে জয়ের চিহ্ন দেখাচ্ছেন। সেই নিউটন দাস আবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের ভোটার। বাংলাদেশের আন্দোলনে তাঁর জড়িত থাকার ছবি ভাইরাল হতেই এই নিয়ে হইচই শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে তবে কি নিউটন বাংলাদেশি নাগরিক? তাহলে কাকদ্বীপের ভোটার হলেন কীভাবে? সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চায় রাজ্য নির্বাচন কমিশন।
কাকদ্বীপে থাকেন নিউটনের দাদা তপন দাস। তিনি বলছেন তাঁর ভাই বাংলাদেশেরই ভোটার। তাঁর কথায়, “চার বছর হল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ও এখানে থাকে না। এই বাংলায় পড়াশোনা করতে এসেছিল। তারপর আবার বাংলাদেশে চলে যায়। ও বাংলাদেশেরই ভোটার। কিন্তু এখানে কীভাবে ওকে ভোটার করা হয়েছে তা আমি জানি না।”
নিউটন যে শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সেই ছবিও সামনে এসেছে। শাসকদলের সুন্দরবন সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি দেবাশিস দাসের সঙ্গেও দেখা গিয়েছে এই ‘বাংলাদেশি’ নিউটনকে। সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, নিউটনের জন্মদিন পালন করছেন শাসকদলের ছাত্র পরিষদের এই নেতা।
নিউটনকে ভোটার কার্ড তৈরিতে কে সাহায্য করেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এসবের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যায় ‘বাংলাদেশি’ নিউটনের।
আফগানিস্তানের নাগরিকও বাংলার ভোটার-
শুধু বাংলাদেশি নয়। আফগানিস্তানের নাগরিকও বাংলার ভুয়ো ভোটার হয়ে গিয়েছেন। গনি খান নামে ওই আফগান নাগরিককে হাওড়ার নয়াবাজ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে হাওড়া সিটি পুলিশ। জানা গিয়েছে, ভুয়ো ভোটার ও আধার কার্ড বানিয়ে এদেশের নাগরিক হয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করছিলেন ওই ব্যক্তি। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাপড়ের ব্যবসা করেন। পুলিশকে ওই ব্যক্তি জানান, মহারাষ্ট্রে তাঁর জন্ম হলেও দীর্ঘদিন এই রাজ্যে তিনি থাকছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির আসল নাম আশরাফ খান। তবে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং প্যান কার্ডে গনি খান আছে। কীভাবে আফগানিস্তানের নাগরিক হয়েও নাম বদলে এখানকার আধার কার্ড এবং প্যান কার্ড পেলেন, সেটাই প্রশ্ন।
