Operation Rising Lion: কীভাবে তেহরানের মাটিতে দাঁড়িয়ে অপারেশন চালাল মোসাদ? – Bengali News | How mossad planned and excecuted operation rising lion inside tehran
মোসাদ! ইজরায়েলের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। হিব্রুতে মোসাদের পুরো নাম, সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশ্যাল অপারেশন। ইজরায়েলের আরও দুই অভ্যন্তরীণ সংস্থা, একটি হল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ‘আমান’, আরেকটি হল ইন্টারনাল সিকিউরিটি এজেন্সি ‘শিন বেট’– এই দুই সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে মোসাদ। সংস্থার সদর দফতর তেল আভিভে। কমবেশি ৭০০০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে মোসাদের, যদিও আসল সংখ্যাটা কারও জানা নেই।
সেই মোসাদ, ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের সঙ্গে যৌথ অপারেশন ‘রাইজিং লায়ন’ সেরে ফেলল একেবারে নিখুঁভাবে। বছরের পর বছর তেহরানের মাটিতে বসেই এই অপারেশনের চূড়ান্ত ছক কষা চলে। ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেট (আমান) মেজর জেনারেল শ্লমি বিন্ডার এই অপারেশনের আগে ইজরায়েলি বায়ুসেনার বাছাই করা অফিসারদের ডেকে বলেন, ‘আজ আমরা এমন এক লড়ায়ে নামছি, যে লড়াই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আমাদের শত্রুরা আমাদের বিনাশ করতে চায়। আর তাই তারা (পড়ুন ইরান) নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে বৃদ্ধি করছে। আমাদের এই আগ্রাসী মনোভাবকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আজ এই ঘরে যাঁরা যাঁরা রয়েছো, তাঁরা প্রত্যেকে এই লড়াইয়ে জিতে ফিরে আসবে। শুধু এটুকুই বলব, খুব সাবধানে লড়বে প্রত্যেকে। ইজরায়েলি গুপ্তচরেরা অনেক পরিশ্রম করে গোপন সব তথ্য জোগাড় করে এনেছে। সবাইকে গুড লাক!’
বস্তুত, ইজরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে এই হামলার পরিকল্পনা করেছে। এমনকী, এই হামলার জন্য ইরানের মাটিতে আস্ত একটা ড্রোন ঘাঁটি বানিয়ে ফেলে ইজরায়েল। যার কথা ঘুণাক্ষরে জানতেও পারেনি তেহরান। শুক্রবারের এই একটা অপারেশনের জন্য বছরের পর বছর ধরে ইরানের সীমান্ত পেরিয়ে গাড়িতে চাপিয়ে ড্রোন স্মাগল করা হয়েছে তেহরানে। একসঙ্গে অনেকগুলো নয়, অল্প অল্প করে। যাতে এক আধটা ট্রাক ধরা পড়ে গেলেও অপারেশনের পরিকল্পনা ভেস্তে না যায়। ইজরায়েলি সেনার বক্তব্য, ইরানের মাটিতে ড্রোন জমিয়ে কার্যত স্তূপ তৈরি করে ফেলা হয়েছিল। শুক্রবার হামলার সময় রিমোটের সাহায্যে ড্রোনগুলি ইজরায়েলে বসেই সক্রিয় করা হয়। একটার পর একটা ড্রোন গিয়ে তেহরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চারে হামলা চালায়। যার ফলে ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে।
আর তখনই চূড়ান্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে ইজরায়েলি বায়ুসেনা। একেএকে প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান উড়ে যায় মিসাইল নিয়ে। মিসাইলগুলি নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত করে পশ্চিমী ইরানের সামরিক অস্ত্রঘাঁটিতে। হামলায় ইরানের কয়েক ডজন রেডার, সারফেস টু এয়ার মিসাইল নষ্ট হয়ে যায় বলে দাবি ইজরায়েলি সেনার। এমনকী, ইজরায়েলি সেনা ভিডিও প্রকাশ করে প্রমাণ দিয়েছে কীভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল পর্যন্ত আইডিএফ ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তবে ইজরায়েলের মূল টার্গেট ছিল ইরানের পারমাণবিক গবেষণাগার। ইরানের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট সাইট নাতাঞ্জের কাছে আছড়ে পড়ে ইজরায়েলের বিমানহানা। ইজরায়েলের অভিযোগ, এখানেই বছরের পর বছর ধরে সামরিক কাজে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের জন্য পরীক্ষা চালাচ্ছিল তেহরান। হামলায় যে তাদের পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রের ক্ষতি হয়েছে সে কথা স্বীকার করেছে ইরান। তবে ইরানের দাবি, তিনটি নয়, একটি গবেষণাকেন্দ্রেই হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তির নিয়ামক সংস্থাও সেই দাবিকে মান্যতা দিয়েছে। এখানে মাটির নিচে অনেকটা গভীরে পারমাণবিক গবেষণা চালাত ইরান। আন্ডারগ্রাউন্ড সেই এলাকার সেন্ট্রিফিউজ, ইলেক্ট্রিক্যাল রুম-সহ যাবতীয় পরিমকাঠামোই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে দাবি ইজরায়েলের। ইজরায়েলের সেনার তরফে এই হামলার থ্রিডি ভিডিও অ্যানিমেশন প্রকাশ করা হয়েছে।
ভাবা যায়! মাত্র একদিন একটা হামলা করা হবে সেই লক্ষ্যে বছরের পর বছর ধরে প্ল্যানিং করেছে মোসাদ। গাড়িতে ভরে সামরিক অস্ত্র স্মাগল করে পাঠানো হয়েছে তেহরানে। এই ড্রোনগুলিই ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে অকেজো করে রেখে ইজরায়েলি বায়ুসেনাকে হামলার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে শুধু ড্রোন বা সামরিক অস্ত্র নয়, প্রথম দুটি পরিকল্পনাই যদি ভেস্তে যেত, তাই তৈরি ছিল তৃতীয় প্ল্যানও। মোসাদের কমান্ডোরা কোভার্ট অপারেশন চালাতে ইরানে প্রস্তুত ছিলেন। শুক্রবার যখন ইজরায়েলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ইরানে হামলার স্রোত বইয়ে দিচ্ছে, তখন মোসাদের কমান্ডোরা মধ্য ইরানে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট সাইটগুলিতে প্রিসিশন মিসাইল স্ট্রাইক চালাচ্ছে। সবমিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় চারবার ইরানে হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। ইজরায়েলি সেনার প্রায় ৬০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জামই দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। পাশাপাশি, আমেরিকার কাছ থেকে কেনা যুদ্ধবিমানও এই অপারেশনে ব্যবহার করেছে ইজরায়েল। ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন এফ-৩৫, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ফিফ্থ জেনারেশনের স্টেলথ ফাইটার জেট। ইজরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সামরিক বন্ধুত্ব। ইজরায়েলের দাবি, অপারেশন রাইজিং লায়নে ২০০টি যুদ্ধবিমান ৩৩০ রকমের অস্ত্র নিয়ে ইরানে হামলা করেছে। হামলার আগে পেন্টাগনকে আগাম জানানো হয়েছিল, দাবি ইজরায়েলের।
ইজরায়েলের এই হামলার ছক মনে করিয়ে দিচ্ছে কয়েকদিন আগেই রাশিয়াতে ইউক্রেনের হামলার ছক। অপারেশন স্পাইডার ওয়েব। ১৮ মাসের চূড়ান্ত গোপনীয় প্ল্যানিংয়ের পর পয়লা জুন রাতে অন্তত পাঁচটি রুশ বোমারু বিমানঘাঁটিতে নিখুঁত নিশানায় আঘাত করে ইউক্রেনের কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন। একটা দুটো নয়, পতঙ্গের মতো একের পর এক ১১৭-টা ড্রোন আছড়ে পড়ে রুশ বিমানঘাঁটিগুলিতে। রুশ সীমান্তের প্রায় ২০০০ কিলোমিটার ভিতরে ওলেনয়া এয়ারবেস, সাইবেরিয়ার ৪৩০০ কিলোমিটার ভিতরে বেলায়া এয়ারবেসের মতো পাঁচটি স্ট্র্যাটেজিক লোকেশনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তত ৪১টি যুদ্ধবিমান, রানওয়ে, হ্যাঙারে আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করে ইউক্রেনের সিকিউরিটি সার্ভিস বা SBU। ওই হামলায় টিইউ-৯৫ বা টিইউ-২২ এম-এর মতো পরমাণু হামলা চালাতে সক্ষম যুদ্ধবিমান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেবারও রাশিয়ার এস-৪০০ বা এস-৫০০-এর মতো মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কাজে লাগেনি। ধ্বংস হয়ে যায় এ-৫০ রেডার ডিটেকশন প্লেনও। প্রায় সেই একই কায়দায় ইজরায়েলি হামলাতেও ইরানের বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহত হয়েছেন ইরানের আধডজন পরমাণু বিজ্ঞানী-সহ শীর্ষ সেনাকর্তারা। ট্রাম্পও ইরানকে সতর্ক করে বলে রেখেছেন, এখনই পরমাণু চুক্তি না করে ফেললে পরের ইজরায়েলি হামলা আরও ভয়াবহ হবে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেইনি ইজরায়েলকে ‘ভয়ঙ্কর শাস্তি’র হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।