Motorcycle Ride: মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৪২–বড়ন্তিতে বন ফায়ার এবং জঙ্গলের মাঝে রোমাঞ্চকর নিশিযাপন – Bengali News | How To Explore Purulia and Bankura From Kolkata By Bike
বড়ন্তিকে ভালভাবে আবিষ্কার করার জন্য আপনাকে দু’দিন দিতেই হবে। এখানে পাহাড়, পার্ক, ঝরনা এবং ড্যামের চারিদিকে ঘুরে বেড়ান। বসন্তের ভোরবেলার মেঘ বড়ন্তির পাম্প হাউসকে যখন পুরোটা ঢেকে দেয়, তখন তার মাঝে আবিষ্কার করতে পারবেন নিজেকে। খুঁজে নিতে চাইবেন আলো-আঁধারের প্রকৃতির মধ্যে সেই সুন্দর জীবন। আর এই মোটরসাইকেল থাকায় আপনি ঘুরে বেড়াতে পারবেন নিজের ইচ্ছে মতো পাহাড়ে ও জঙ্গলে।

পরের দিন সকালে বড়ন্তির গেস্ট হাউসে ব্রেকফাস্ট শেষ করে বেরিয়ে পড়ুন গড় পঞ্চকোটের উদ্দেশ্যে। অবশ্যই লাগেজপত্র বাইকে বেঁধে কারণ, একই জায়গায় বেশি দিন থাকার দরকার নেই। সকালের শান্ত প্রকৃতির মধ্যে বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব। বাইকের অফরোডিং-এর ক্ষেত্রে একটা কথা মাথায় রাখা খুবই দরকার, যা হল টায়ারটা যেন নতুন হয়। কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার কিলোমিটার চালানোর পর টায়ার অবশ্যই পাল্টানো উচিত। টায়ার নতুন থাকলে ছোটখাটো পরিস্থিতিতে সহজেই বিপদ এড়ানো যায়। বড়ন্তি থেকে গড় পঞ্চকোটের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার, যেখানে পৌঁছতে আপনার প্রায় আধ ঘণ্টা সময় লাগবে। গড় পঞ্চকোট হল পঞ্চকোট পাহাড়ের কোলে অবস্থিত একটি প্রত্নস্থান। এখানে প্রায় পাঁচ মাইল বিস্তীর্ণ একটি দুর্গ ছিল; এই দুর্গের চারপাশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১২ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ছিল। এখন এর অধিকাংশ স্থাপত্যই অবলুপ্তির পথে। এখানে আরও দেখতে পাবেন পঞ্চরত্ন মন্দির, কংকালী মাতার মন্দির এবং কল্যাণীদেবীর মূর্তি। এছাড়াও রয়েছে পঞ্চকোট পাহাড়, গড় পঞ্চকোট ভিউ পয়েন্ট, ইকো ট্যুরিজম এবং আরও অনেক কিছু।

এর ঠিক পাশেই রয়েছে পাঞ্চেত ড্যাম। এই ড্যামটি তার ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং বৈচিত্রের জন্য বিখ্যাত। বিস্তীর্ণ পাহাড় পরিবৃত বিশাল ড্যাম এটি, যা পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমান্ত এলাকা শেয়ার করে। এই ড্যামটি সময় কাটানোর জন্য অসাধারণ জায়গা। আপনি চাইলে ড্যামটির জলে বোটিং-ও করতে পারেন। এছাড়াও রয়েছে নেহেরু পার্ক, লক্ষণপুর পাম্প হাউস। এবং সব থেকে বড় কথা, বাইক নিয়ে আপনি মাইলের পর মাইল ড্যামটির উপরে ঘুরতে পারেন, তাতে নেই কোনও বাধা। ছবি তোলার জন্য এই ড্যামের জুড়ি মেলা ভার।

এখান থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সুন্দর পার্ক, যেখানে আপনি পরিবার এবং বাচ্চা থেকে বড়… সবাই আনন্দ করতে পারে। নাম স্বর্ণ জয়ন্তী পার্ক। পুরুলিয়ায় ঘুরতে এলে এই জায়গায় না-আসলে ঘোরা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পাঞ্চেত ড্যাম থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে অবস্থিত এই স্থান। এই ৩২ কিলোমিটার রাস্তা খুব সুন্দর; দুটপাশে পাহাড়ের মাঝে পলাশ ফুল এবং রুক্ষ কিছু গাছপালার নিয়ে গঠিত একটি সুন্দর পরিবেশ, যেখানে বাইক থামিয়ে প্রকৃতির ছবি তুলতে একপ্রকার বাধ্য হবেন আপনি।
এই পার্কের পাশে অবস্থিত আরেকটি সুন্দর ড্যাম, যেটি জঙ্গলের মাঝে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। যেটির নাম বেকো ড্যাম। এখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে এরপর চলে আসুন রাত কাটানোর একটি অসাধারণ ঠিকানায়। এখানে একটি ড্যামের পাশে নানা ধরনের স্পোর্টস অ্যাক্টিভিটি করতে পারেন। এ এমন এক নেচার ক্যাম্প, যেখানে আপনি বারবার যাবেন। বেকো ড্যাম থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফুটিয়ারি ড্যাম এবং ফুটিয়ারি নেচার ক্যাম্প। এখানে একটি রাত না কাটালে আপনি বুঝতেই পারবেন না প্রকৃতির মাঝে থাকার মজা। এখানে চাইলে কিছু টাকার বিনিময়ে আপনি নিজের তাঁবু খাটাতেও পারেন।

রাতে বন ফায়ার এবং জঙ্গলের মাঝে থাকার এক অনন্য অভিজ্ঞতাও আপনি কোনও দিন ভুলবেন না। ড্যামের জলের শান্ত আওয়াজ, আর তার সঙ্গে গান এবং লোকনৃত্যের মাধ্যমে কখন যে রাত কেটে গেল, বোঝাই গেল না। পরের দিন সকালে আরও কাছ থেকে এই ড্যামটিকে ভাল করে ঘুরে দেখে বেরিয়ে পড়লাম পাতলোই জলধারার উদ্দেশ্যে। যেটি পত্র লেখা ড্যামের উপরে অবস্থিত। এই সুন্দর জলধারার নীল জল আপনাকে মনের গহনে পাড়ি দিতে সাহায্য করবে। এখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে বাড়ির কথা মনে পড়লে বেরিয়ে পড়ুন কলকাতার উদ্দেশ্যে, যা মাত্র আড়াইশো কিলোমিটার দূরের রাস্তা। পৌঁছতে মোটামুটি ছ’ঘণ্টা লেগে যাবে। তাই বেরিয়ে পড়ুন বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, আরামবাগ হয়ে কলকাতা। মাঝে ‘বনলতা’য় আপনার দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিন, তাদেরই খাঁচায় থাকা নানা ধরনের পাখি এবং চাষ করা মাছ দিয়ে।

আগামী সপ্তাহে আমি পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ার মানুষদের আদব-কায়দা, রীতিনীতি, চালচলন এবং বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান নিয়ে এবং সেই অনুষ্ঠান কখন হয়, তা নিয়ে একটি বিশেষ পর্ব নিয়ে হাজির হব। যা না জানলে মানুষ তথা প্রকৃতিকে সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়…