দুর্নীতি একশো কোটির, পর্যটনেও গুচ্ছ অনিয়ম
এই সময়: মোটা টাকার বিনিময়ে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির পাশাপাশি এ বার পর্যটন দপ্তরের টেন্ডারেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠল প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে দুর্নীতির অঙ্ক ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বৃহস্পতিবার আদালতে দাবি করেন তদন্তকারীরা। পুলিশের দাবি, ইন্দ্রনীল ছাড়াও তাঁর পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন সংস্থা এবং ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিশ পাওয়া গিয়েছে। যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। ওই তালিকায় উঠে এসেছে প্রাক্তন মন্ত্রীর স্ত্রীর নামও।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী তথা সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল এক সময়ে পর্যটন দপ্তরেরও দায়িত্বে ছিলেন। তখনই পর্যটন সংক্রান্ত টেন্ডারে অনিয়ম করে নিজের ঘনিষ্ঠ তিনটি সংস্থাকে তিনি টেন্ডার পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে কলকাতা পুলিশের অভিযোগ। ওই সংস্থাগুলি হলো– ‘থার্ড লাইন ক্রিয়েশন’, ‘জিডি ক্রিয়েশন’ এবং ‘রূপাকর ক্রিয়েশন’। তদন্তকারীদের দাবি, ওই তিন সংস্থার মাধ্যমে বিপুল টাকা ইন্দ্রনীল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে গিয়েছে।
ইডি ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশকে জানিয়েছে, পর্যটন দপ্তরের টেন্ডার এবং দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি মিলিয়ে অন্তত ১০০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইন্দ্রনীল, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের খোঁজ মিলেছে। পুলিশের দাবি, তদন্তের প্রয়োজনে প্রাক্তন মন্ত্রীর স্ত্রীকেও ডাকা হতে পারে। যদিও ‘মাস আর্ট’ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ইন্দ্রনীলের স্ত্রী কলকাতা হাইকোর্ট থেকে আগেই জামিন পেয়েছেন। তাই আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তাঁকে তলব করা হবে।
ইডির দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্তের একটি সংস্থা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা গিয়েছিল। তাহলে কি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকেও ডাকা হবে? কলকাতা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘আমরা ইডির কাছ থেকে সবে তথ্য সংগ্রহ করেছি। পুরোটা খতিয়ে দেখে তার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এফআইআরে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের শীঘ্রই তলব করা হবে।’
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লালবাজারে মূল অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়কে ডাকা হয়। তিনি বলেন, ‘এই দুর্নীতি সম্পর্কে আমার কাছে থাকা সমস্ত তথ্য তদন্তকারীদের জানাব।’
কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইন্দ্রনীলের স্ত্রীর ‘মাস আর্ট’ সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর টাইআপ সংক্রান্ত ২০২২–এর নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি ইউনেস্কোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। ওই চিঠির জবাব এলে সবকিছু আরও স্পষ্ট হবে।
অন্য দিকে, ইন্দ্রনীল হাইকোর্টে যে মামলা করেছিলেন, সেখানে রাজ্যের তরফে অভিযোগ করা হয়, তিনি সরকারি পদের অপব্যবহার করেছেন। ‘মাস আর্ট’-এর মাধ্যমে বিপুল টাকা প্রাক্তন মন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল। রাজ্যের বক্তব্য, ‘ইন্দ্রনীল মন্ত্রী থাকাকালীন মাত্র তিনটি সংস্থাই টেন্ডার পেয়েছিল।’
হাইকোর্টে রাজ্যের তরফে জানানো হয়, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে ‘জিডি ক্রিয়েশন’-কে ৫৩.৪৬ কোটি টাকার টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকার মধ্যে ৫০.৩১ কোটি টাকা ‘থার্ড লাইন ক্রিয়েশন’-কে দেওয়া হয় এবং ৪.৫ লক্ষ টাকা যায় ‘মাস আর্ট’-এ। এ ছাড়া ইন্দ্রনীলের আত্মীয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন আরও দুটি সংস্থায় ২২.৪৭ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের। সব মিলিয়ে ১২৮ লক্ষ টাকা লেনদেনের কথা রাজ্যের তরফে হাইকোর্টে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ধৃত ইন্দ্রনীলকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তকারী অফিসার আদালতকে জানান, ২০২২ থেকে ২০২৪–পর্যন্ত ‘মাস আর্ট’ থেকে বিপুল টাকা ইন্দ্রনীল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়েছে।
সরকারি আইনজীবী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় আদালতে বলেন, ‘মামলাটি প্রতারণা ও জালিয়াতির। ২৪টি পুজো ইউনেস্কো বেছে নেয়নি, বেছে নিয়েছিল মাস আর্ট। ওই সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর চুক্তি হয়েছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ২০২৫–এ হয়। অথচ ২০২২–থেকেই টাকা তোলা হচ্ছিল। ইউনেস্কোর লোগো কোনও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও টিকিটে ওই লোগো ছিল।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘মাস আর্ট’-এ যে টাকা ঢুকছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আবার মন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।’ তাঁর কথায়, ‘হি ওয়াজ লিডিং দ্য র্যাকেট, অ্যান্ড হি ইজ দ্য লিডার অফ দ্য চেন।’
প্রাক্তন মন্ত্রীর আইনজীবী সোমনাথ সান্যাল পাল্টা দাবি করেন, টিকিট বিলি করার দায়িত্বে ইন্দ্রনীল ছিলেন না। তাঁর প্রশ্ন, ‘পুজো সংক্রান্ত ওই কমিটির প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ট্রেজারার আগেই জামিন পেয়েছেন। সে ক্ষেত্রে ইন্দ্রনীলকে কেন হেফাজতে রাখা হবে?’ সোমনাথের দাবি, ‘মাস আর্ট’, ‘জিডি ক্রিয়েশন’, ‘রূপাকর ক্রিয়েশন’ এবং ‘থার্ড লাইন ক্রিয়েশন’—এই সংস্থাগুলির সঙ্গে ইন্দ্রনীলের কোনও যোগ নেই। সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলা পেন্ডিং রয়েছে। তা জানা সত্ত্বেও আগেভাগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মক্কেলকে।’ ইন্দ্রনীল কোনও দিন ফোন বন্ধ করেননি বলেও দাবি করেন তিনি। আইনজীবীর যুক্তি, ‘ইন্দ্রনীলের ফোন আগেই ইডি বাজেয়াপ্ত করেছিল। তাই পুলিশ ফোনটি সুইচড অফ পেয়েছে।’ সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পরে আদালত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ইন্দ্রনীল সেনকে পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়।