ইরানের হুঁশিয়ারি, উপসাগরে AI ডেটা সেন্টারও নিশানায়?
তেহরান: আমেরিকা ফের ইরানের উপর হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI পরিকাঠামো এবং সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলকে নিশানা করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এই পরিকাঠামোগুলিও ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, ওই অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত পরিকাঠামোর মূল্য ২ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি। তবে রেজায়ি স্পষ্ট করেছেন, এই মুহূর্তে ওই ডেটা সেন্টার বা সমুদ্রতলের কেবলগুলিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
এই হুঁশিয়ারি এমন সময়ে এসেছে, যখন উপসাগরীয় দেশগুলিতে ক্লাউড কম্পিউটিং এবং AI প্রযুক্তির পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করছে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে নিজেদের ব্যবসার পরিসর বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে এই পরিকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরবের মতো দেশ। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ায় এই বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে AI ও ক্লাউড পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, Microsoft ২০২৩ সাল থেকে ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে মোট ১৫২০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিনিয়োগের মধ্যে উন্নত AI ও ক্লাউড ডেটা সেন্টার এবং আমিরশাহির প্রযুক্তি সংস্থা G42-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বও রয়েছে।
অন্যদিকে, Amazon Web Services (AWS) সৌদি আরবে ক্লাউড পরিকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ৫৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। Google এবং সৌদি আরবের Public Investment Fund যৌথভাবে ১০০০ কোটি ডলারের AI হাব তৈরির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এই বিনিয়োগগুলি শুধু প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয় নয়। উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনীতিকে বহুমুখী করে তোলা, সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনার সঙ্গেও এগুলি যুক্ত।
ডেটা সেন্টারে হামলা হলে কেন বড় প্রভাব পড়তে পারে?
উপসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের বহু পরিকাঠামো ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। AWS সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও বাহরাইনে ক্লাউড অঞ্চল পরিচালনা করে। Microsoft, Google এবং Oracle-ও উপসাগরীয় বিভিন্ন বাজারে ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড কম্পিউটিং পরিষেবা চালায়।
এই পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ব্যবসা, সরকারি সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের তথ্য সংরক্ষণ, সফটওয়্যার পরিচালনা ও ডিজিটাল পরিষেবা চালু রাখে। AI-ভিত্তিক পরিকাঠামো পরিচালনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ, বিশেষায়িত প্রসেসর, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং উচ্চক্ষমতার যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয়।
ফলে কোনও ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সেই পরিকাঠামোর উপর নির্ভরশীল ব্যাঙ্ক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য পরিষেবাও ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক তথ্য আদানপ্রদানের উপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
২০২৬ সালের মার্চে AWS-এর পরিকাঠামোয় হামলার দাবি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে AWS-এর দুটি পরিকাঠামো ড্রোন হামলার সরাসরি আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাহরাইনে আরও একটি পরিকাঠামোর কাছাকাছি হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছিল।
এই ঘটনাগুলিতে ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। আগুন নেভানোর সময় জল ঢুকে অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতিও হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে একাধিক ক্লাউড পরিষেবা অনুপলব্ধ হয়ে পড়ে।
AWS-এর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিষেবা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কারণ, এখানে সমস্যা শুধু সফটওয়্যারের ত্রুটি নয়, বরং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অন্যান্য সহায়ক পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
এই ঘটনার প্রভাব আর্থিক প্রতিষ্ঠান-সহ ক্লাউড পরিষেবার উপর নির্ভরশীল গ্রাহকদের মধ্যেও পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে একটি ডেটা সেন্টারে হামলা কীভাবে একাধিক ক্ষেত্রের পরিষেবাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সমুদ্রতলের কেবল নিয়েও কেন উদ্বেগ?
আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই কেবলগুলি বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য আদানপ্রদান করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ডেটা সেন্টার, ক্লাউড পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পরিকাঠামো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় কোনও একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরানের হুঁশিয়ারিতে এই যোগাযোগ কেবলগুলির উল্লেখ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোন কেবল বা ডেটা সেন্টারকে নিশানা করা হতে পারে, সে সম্পর্কে রেজায়ির বক্তব্যে কোনও চূড়ান্ত তালিকার কথা বলা হয়নি।
প্রযুক্তি বিনিয়োগের সামনে বাড়তি নিরাপত্তার প্রশ্ন
উপসাগরীয় দেশগুলিতে AI ও ক্লাউড কম্পিউটিং পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বও বাড়ছে। ডেটা সেন্টার সচল রাখতে শুধু উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই হয় না, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভৌত নিরাপত্তাও অপরিহার্য।
ইরানের এই হুঁশিয়ারি নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু প্রচলিত সামরিক ঘাঁটি বা জ্বালানি পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে এই মুহূর্তে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টার বা সমুদ্রতলের কেবলগুলিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না। ইরানের বক্তব্যটি সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।