অভাবী দিদি–ভাইয়ের হাতেই লক্ষ্মীর ‘জন্ম’
এই সময়, ময়নাগুড়ি: ভাই মদন পাল বিশেষ ভাবে সক্ষম। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। দিদি সনকাবালা পালের বয়স ষাট। গত চার দশক ধরে দিদি–ভাইয়ে মিলে লক্ষ্মী প্রতিমা গড়ে চলেছেন। অভাব তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবু ময়নাগুড়ির বার্নিশ রোড পালপাড়ায় একচিলতে মাটির ঘরের বারান্দায় এক কোণে বসে চলছে দিদি–ভাইয়ের সংগ্রাম। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবু দম ফেলার সময় নেই। সামনেই লক্ষ্মীপুজো। তাঁদের তৈরি প্রতিমা পাড়ি দেবে জলপাইগুড়ি–সহ বিভিন্ন জেলায়।
সনকাবালার দুই ছেলে। তাঁরা নিজেদের সংসারের টানাপড়েনেই ব্যস্ত। মায়ের খেয়াল রাখার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। মা–ও ছেলেদের কাছে খুব কিছু প্রত্যাশা করেন না। অবিবাহিত ভাইকে নিয়ে ওই মাটির ঘরে বসবাস করেন। পালপাড়ায় বেশ কয়েকটি পরিবারের মতো সনকাবালারাও মূর্তি গড়ে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। বিয়ের পর থেকে স্বামীকে সহযোগিতা করতেন তিনি।
কয়েকবছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নতুন করে লড়াই শুরু হয় সনকাবালার। নিজের ছেলে থাকলেও বিশেষ ভাবে সক্ষম ভাইকে কখনও ছাড়েননি। সারাজীবন আগলে রেখেছেন। মদন ঠিক করে চলাফেরা করতে না–পারলেও মূর্তি গড়ার কাজে দিদিকে যোগ্য সঙ্গত দিয়ে আসছেন। সারাবছর মাটির ঘট, ধুনুচি, গ্লাস ইত্যাদি বানালেও শুধু এই সময়টায় চরম ব্যস্ত থাকেন দিদি–ভাই। কারণ, তাঁরা একমাত্র লক্ষ্মীমূর্তিই গড়েন।
এ ছাড়া সংসার চালাতে সারাবছর সনকাবালার সম্বল বিধবা ভাতার দেড় হাজার টাকা। মূর্তি গড়ে মুনাফা খুব একটা না–হলেও দীর্ঘদিনের পেশা হওয়ায় ছাড়তে পারেন না। এখন নেশাও হয়ে গিয়েছে। সনকাবালা বলছেন, ‘নতুন প্রজন্ম মাটির কাজে আগ্রহ খুব একটা দেখায় না। খুবই ধৈর্য্যের কাজ। গ্রাম বাংলায় লক্ষ্মী পুজোর রীতি বজায় আছে ঠিকই, তবে ধারাবাহিক ভাবে কাচামালের দাম বাড়লেও প্রতিমার মূল্য সেই তুলনায় বাড়েনি।’ এ নিয়ে আফসোস রয়েছে প্রৌঢ়ার। তবে এ বার কিছুটা দাম পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদী। ভাই মদনের কথায়, ‘ছোট থেকে দু’পায়ে জোর পেতাম না। সরকারি ভাতা মেলেনি। দিদিকে মাটির কাজে সহযোগিতা করি। তাতে যা উপার্জন হয়, কোনওমতে চলে যায় আর কি!’