পেট ভরে খাবারের বন্দোবস্ত আর কত দিন
রাহুল রায়
স্প্যানিশ ভাষায় তার নামের অর্থ ‘ছোট ছেলে’। তা বলে তাকে উপেক্ষা করা মোটে ভাল কাজ হবে না। তার দস্যিপনার বহর একেবারেই ছোট মাপের নয়।
কে সে? সে এল নিনিও। যখন নিরক্ষীয় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক ঠান্ডা জল দীর্ঘকালীন গড় তাপমানের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়, তাকে বলে এল নিনিও। আবার, স্বাভাবিকের চেয়েও যখন আরও ঠান্ডা হয়ে যায়, সেটি লা নিনা। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস-এর সাপ্তাহিক ওয়েবসাইট-এ বিশিষ্ট মার্কিন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা ‘এল নিনিও/সাদার্ন অসিলেশন (এনসো) ডায়াগনস্টিক ডিসকাশন’ প্রতিবেদনে (১৩ অগস্ট, ২০২৬) সতর্ক করেছেন, এই বছরের শেষের দিকে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এনসো-র একটি ব্যতিক্রমী গ্রহ-উষ্ণকারী শক্তিশালী পর্যায় (যখন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়) দেখা দিতে পারে। ইউরোপীয় জলবায়ু মডেলগুলিও এই ‘সুপার এল নিনিও’-র সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলেছে। এই অস্বাভাবিক শক্তিশালী ‘এল নিনিও’-র সম্ভাবনা এমন একটি সময়ে দেখা দিচ্ছে, যখন আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন দেশ যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। ২০২৬-এর শেষের দিকে এটি আবিশ্ব খাদ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত করবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা।
বিপন্ন খাদ্যসুরক্ষা, দোসর ইরান যুদ্ধ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েল বিগত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সংযোগকারী, কৌশলগত ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ হরমুজ় প্রণালীর মধ্য দিয়ে নৌ-বাণিজ্য গুরুতর মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত। পণ্যের জোগান মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হওয়ায় খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সারের দাম রেকর্ড হারে বেড়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি তাদের খাদ্য আমদানির জন্যও এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এই যুদ্ধের জেরে সারা দুনিয়ায় সার সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে। এটি চাষিদের, বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত, আরও বিপন্ন করবে। বিশ্ব-বাজারে খাদ্যমূল্য অ-স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সমুদ্রপথে আর্ন্তজাতিক সার বাণিজ্যের মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ় প্রণালীর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। সার তৈরির কারখানাগুলি অত্যন্ত শক্তি-নিবিড় এবং কিছু রাসায়নিক তৈরি করতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। সুইস ব্যাঙ্ক ইউবিএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ডোনোভান জানাচ্ছেন, সারের মূল্যবৃদ্ধির চেয়েও এই বছরের কৃষিজ দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হলো, সুপার এল নিনিও আবহাওয়ার যে ধরন তৈরি করবে, তাতে খরার সম্ভাবনা এবং সীমিত জল সরবরাহ নাইট্রোজেনের ঘাটতির চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-এর খাদ্য ও কৃষির বরিষ্ঠ বিশ্লেষক ক্রিস জ্যাকারিনি জানাচ্ছেন, দু’টি কারণে খাদ্যের দাম ক্রমশ বাড়ছে। চরম জলবায়ুজনিত নানান ঘটনায় প্রধান উৎপাদক অঞ্চলগুলিতে ক্রমাগত ফলন ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্য-ব্যবস্থা এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর হওয়ায় গ্যাস, সার, পরিবহণ এবং মোড়ক-এর (প্যাকেজিং) খরচ বাড়ায় খাদ্যবস্তুর দামও ক্রমশ চড়ছে। তাই সুপার এল নিনিও-র সম্ভাবনা মানবকৃত কার্বন নির্গমনের ফলে ইতিমধ্যেই অ-স্থিতিশীল হয়ে ওঠা জলবায়ুতে আবহাওয়াজনিত বিপদ বহু গুণ বাড়াতে পারে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মুদ্রাস্ফীতিও প্রায় অবশ্যম্ভাবী। কোকো, ভোজ্য তেল, চাল এবং চিনির দামের ওপর আবহাওয়াজনিত চরম ঘটনার প্রভাব বিশেষ ভাবে পড়ে বলে, সুপার এল নিনিও-র সম্ভাবনায় বিজ্ঞানীরা সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। জ্যাকারিনি নিরক্ষীয় অঞ্চলের অন্যান্য পণ্য, যেমন, কলা, চা, কফি ও চকোলেট-এর ওপরেও এর প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন।
বাড়ছে খাদ্যসঙ্কট
গত অগস্ট মাসের গোড়ায় রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বিশ্বের ৪৫টি দেশে সমীক্ষার ভিত্তিতে লিখিত প্রতিবেদন ‘স্ট্রেংদেনিং এল নিনিও টু পুশ ফর্টিনাইন মিলিয়ন মোর পিপল ইনটু অ্যাকিউট হাঙ্গার’-এ সুপার এল নিনিও-র প্রভাবে সারা বিশ্বে আরও কত মানুষ খাদ্যসঙ্কটে পড়বে, তার একটি পূর্বাভাস দিয়েছে (নিম্নলিখিত পরিসংখ্যানের বন্ধনীতে ইতিমধ্যেই চরম খাদ্যসঙ্কটের ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যা দেওয়া হলো)।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যসঙ্কটে পড়বে আরও ৮২ লক্ষ মানুষ (৭ কোটি ৩৩ লক্ষ)। পূর্ব আফ্রিকায় এই সংখ্যাটি হবে ৫৯ লক্ষ (৫ কোটি ২৯ লক্ষ) মানুষ। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ (৪ কোটি ৮৯ লক্ষ) চরম খাদ্যসঙ্কটে পড়বে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই সংখ্যাটি হবে ১ কোটি ২২ লক্ষ (২ কোটি ৮৭ লক্ষ)। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও (১ কোটি ৬৩ লক্ষ) চরম খাদ্যসঙ্কটের মুখে আরও ১ কোটি ২২ লক্ষ মানুষ পড়বে বলে ডব্লিউএফপি-এর অনুমান। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সুপার এল নিনিও-র কারণে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ চরম খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়তে পারে, যা সারা পৃথিবীতে প্রায়-অনাহারী মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ২৭ কোটি ৪০ লক্ষ করে তুলতে পারে। মধ্য আমেরিকায় চরম খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়া মানুষের সংখ্যা বাড়বে সব চেয়ে বেশি, প্রায় ৮৩ শতাংশ। এর পরই আছে দক্ষিণ আফ্রিকা, যেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ অতি-ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে বলে প্রতিবেদনটি থেকে জানা যাচ্ছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপার এল নিনিও দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮১ শতাংশ। এর প্রভাবে সমুদ্রজলের উপরিভাগের তাপমাত্রা ১৯৮২ সাল থেকে নথিভুক্ত সকল উষ্ণতাকে ছাপিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। ১৯৫০ সালের পরে এই এল নিনিও সবচেয়ে শক্তিশালী রূপে দেখা দিতে চলেছে বলে তাঁদের অনুমান।
‘নাইনটি ওয়ান’ সংস্থা-র গ্লোবাল ন্যাচারাল রিসোর্স স্ট্র্যাটেজি-র দায়িত্বে থাকা ডেভিড হেইল জানাচ্ছেন, এল নিনিও-র সম্ভাবনায় খাদ্য-উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাত্রাটি নির্ভর করছে জলবায়ু-সংক্রান্ত ঘটনাগুলি কখন ঘটবে, কতটা চরমে পৌঁছাবে এবং কতক্ষণ স্থায়ী হবে তার ওপর। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজ়িল এবং আর্জেন্টিনা বিভিন্ন কারণে এল নিনিওর সংস্পর্শে আসতে পারে বলে তাঁর অভিমত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানাচ্ছে, চলতি বছরের শেষের দিকে সুপার এল নিনিওর ঘটনা উত্তর-পশ্চিম ইথিওপিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং সুদানকে আরও শুখা করে তুলতে পারে, যা তাদের প্রধান কৃষি মরশুমের জন্য এক বড় বিপদ। ডব্লিউএফপি পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলিতে বৃষ্টিপাতের ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সঙ্গে সোমালিয়া এবং তার পড়শি অঞ্চলে বন্যা দেখা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টির কারণে খরার সম্ভাবনা থাকায় কৃষিজ ফলনে ব্যাঘাত ঘটবে বলে তারা সতর্ক করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সুপার এল নিনিও-র প্রভাবে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে পূর্ব আফ্রিকার বেশ কিছু অংশে বন্যা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আবার খরা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই দু’টি ঘটনায় মহাদেশটির দু’টি দিকেই খাদ্য-জোগান ব্যাহত হবে। পৃথিবীর কিছু অংশে সুপার এল নিনিও-র প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান, যেমন— ভারতের বহু অংশে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি দেখা গিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় দেখা গিয়েছে বিধ্বংসী দাবানল। যুক্তরাজ্যে এই গ্রীষ্মে দাবদাহে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগামী শীতকালে আর্দ্র ও ঝোড়ো আবহাওয়া বিরাজ করবে বলে সেখানকার আবহাওয়া দপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছে।
ডব্লুএফপি-র ক্লাইমেট অ্যান্ড রেজ়িলিয়েন্স সার্ভিস-এর অধিকর্তা রিচার্ড চাওলারটন জানিয়েছেন, পৃথিবীর যে সব অঞ্চল ইতিমধ্যে খাদ্যসঙ্কটে পড়েছে, সে সব জায়গাতেই সুপার এল নিনিও-র প্রভাব বেশি দেখা দেবে। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে সে সব অঞ্চলের মানুষদের অনাহার ও দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে ক্লাইমেট অ্যান্ড রেজ়িলিয়েন্স সার্ভিস কাজ করে চললেও, আর্থিক তহবিলের স্বল্পতা এ কাজের ক্ষেত্রে এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। সুপার এল নিনিও-র প্রভাবে চলতি বছরের জরুরি খাদ্য-চাহিদা মেটাতে তাঁদের প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার দরকার হলেও হাতে পাওয়ার আশা প্রায় ৬৫০ কোটি মার্কিন ডলার, কারণ পৃথিবীর প্রধান অনুদান প্রদানকারী, অর্থাৎ ধনী দেশগুলি ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অর্থ সাহায্যের পরিমাণ কমিয়েছে। সুপার এল নিনিও-র প্রভাবে পৃথিবীর নানান অঞ্চলে খাদ্যসঙ্কট ঘটার আগাম অনুমান করে ডব্লিউএফপি পৃথিবীর ১৮টি দেশে প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষকে অগস্ট ২০২৬-এর গোড়ার দিক পর্যন্ত অার্থিক ও অন্যান্য সাহায্য করেছে।
অতঃ কিম্?
পরিবর্তিত জলবায়ুতে দুনিয়াজোড়া খাদ্যসঙ্কটের বিপদ রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যমূল্যের অস্থিরতা কমানো নির্ভর করে নেট জ়িরো এমিশন-এ পৌঁছানোর ওপর। এ ব্যাপারে ধনী দেশগুলি থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পিছিয়ে থাকা প্রধান ফসল উৎপাদক দেশগুলিতে অর্থসাহায্য চাষিদের পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং ফসল ও জীবিকা রক্ষা করতে যথেষ্ট সাহায্য করবে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন, চরম আবহাওয়াজনিত নানান বিপদের মধ্যে আছে এই গ্রহটি। এক দিকে আবহাওয়াজনিত বিপদ এবং অন্য দিকে জলবায়ু-কর্মসূচি সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি কতটা পালিত হয়েছে— মানবজাতি এই দুইয়ের এক দৌড়ের মধ্যে রয়েছে। এই দৌড়ে জিততেই হবে। অন্য পথ আর নেই।
লেখক শিক্ষক ও সমাজকর্মী