ইউক্রেনের F-16 সংকট থেকে শিক্ষা, ভারতের অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্রে জোর
নয়াদিল্লি: যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক যুদ্ধবিমান হাতে থাকাই যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সেই বিমানকে সচল রাখা এবং পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের এফ-১৬ বহরকে ঘিরে তৈরি হওয়া রক্ষণাবেক্ষণ ও অস্ত্রভাণ্ডারের চাপ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। আর এই পরিস্থিতি ভারতের দেশীয় আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্র (Astra Missile) কর্মসূচির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ইউক্রেন এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি এফ-১৬ পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কিছু বিমান প্রশিক্ষণের কাজে দেশের বাইরে রয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি এফ-১৬ হারানোর বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং নরওয়ে মিলিয়ে আরও ১১০টি বিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণের চাপে ইউক্রেনের এফ-১৬
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেনের এফ-১৬ বহরের অর্ধেকেরও বেশি বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সমস্যায় আটকে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার অপারেশন চালানোর ফলে বিমানগুলির রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বাড়ছে।
একই সঙ্গে যুদ্ধবিমানগুলির জন্য প্রয়োজনীয় আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার এবং এআইএম-১২০ অ্যামরাম ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন মোকাবিলায় ব্যবহার করেছে।
ফলে পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে কিছু পরিস্থিতিতে ইউক্রেনীয় পাইলটদের অস্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এফ-১৬-এর ২০ মিলিমিটার কামানের গোলাবারুদের চাহিদাও বেড়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
বিমান থাকলেই যুদ্ধক্ষমতা নিশ্চিত হয় না
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা সামরিক বিমান পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একটি বিমানবাহিনীর সক্ষমতা শুধু তার হাতে থাকা যুদ্ধবিমানের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধ চলাকালীন সেই বিমানকে কতটা সময় আকাশে রাখা যাচ্ছে, পর্যাপ্ত অস্ত্র ও খুচরো যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা যাচ্ছে কি না এবং দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে কি না, সেগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চমাত্রার অপারেশনাল ব্যবহারে একদিকে যেমন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে, অন্যদিকে বিমানের উড়ানঘণ্টাও বাড়ে। তার ফলে আরও বেশি পরিদর্শন, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
ড্রোন এবং সাবসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র হিসেবে লেজার-গাইডেড ৭০ মিলিমিটার এপিকেডব্লিউএস-২ রকেট ব্যবহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে ইউক্রেনের এফ-১৬-এ এগুলি কতটা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।
এখানেই ভারতের অস্ত্রের গুরুত্ব
এই পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের দেশীয় অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ রয়েছে। অস্ত্র একটি দেশীয় বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল, যা ডিআরডিও তৈরি করেছে এবং সুখোই-৩০ এমকেআই-এর সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।
২০২২ সালের মে মাসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ভারতীয় বিমান বাহিনী ও ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য অস্ত্র এমকে-১ এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেডের সঙ্গে ২,৯৭১ কোটি টাকার চুক্তি করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেডে ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎপাদনও শুরু হয়েছে।
অস্ত্র এমকে-১-এর পাল্লা ১০০ কিলোমিটারের বেশি বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে সুখোই-৩০ এমকেআই-এর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করা হয়েছে এবং অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গেও ধাপে ধাপে একীকরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশীয় সিকারেও বড় অগ্রগতি
অস্ত্র কর্মসূচির আরও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে এর দেশীয় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিকার নিয়ে। ২০২৫ সালের ১১ জুলাই ওড়িশার উপকূলে সুখোই-৩০ এমকেআই থেকে দেশীয় আরএফ সিকার দিয়ে সজ্জিত অস্ত্রের সফল পরীক্ষা করে ডিআরডিও এবং ভারতীয় বিমান বাহিনী।
পরীক্ষায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র দুটি উচ্চগতির আনম্যানড আকাশীয় লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় এবং দুটিই লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সিকারটি ডিআরডিও দেশীয়ভাবে ডিজাইন ও তৈরি করেছে।
এই কর্মসূচিতে ডিআরডিও-র বিভিন্ন ল্যাবরেটরির পাশাপাশি হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডসহ ৫০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি শিল্প সংস্থা যুক্ত রয়েছে।
বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ
যুদ্ধের সময় বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে। উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত থাকা, অন্য দেশগুলির একই অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়া অথবা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা থাকলে ভারত নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মজুত তৈরি, পুনরায় সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্রের আপগ্রেডের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। অস্ত্রের ক্ষেত্রে সিকার, প্রপালশন, নির্দেশিকা ব্যবস্থা এবং উৎপাদন পরিকাঠামোকে ধীরে ধীরে দেশীয় করার প্রচেষ্টা সেই বৃহত্তর সক্ষমতা তৈরির অংশ।
ইউক্রেনের এফ-১৬ অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমান বা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় নয়। এটি দেখাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে যুদ্ধবিমান বহরের কার্যকর সক্ষমতা ধরে রাখতে বিমান, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে একসঙ্গে শক্তিশালী করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ক্ষেত্রে অস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি সেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধপ্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দেশীয় আরএফ সিকার পরীক্ষার সাফল্য এবং ৫০টিরও বেশি শিল্প সংস্থার অংশগ্রহণ দেখাচ্ছে যে কর্মসূচিটি শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বিস্তৃত দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।