কলেজের সংখ্যা বাড়লেই নারীশিক্ষার প্রসার? - 24 Ghanta Bangla News
Home

কলেজের সংখ্যা বাড়লেই নারীশিক্ষার প্রসার?

Spread the love

কয়েকটি মেয়ে-জীবনের কথা শোনা যাক। তারা গ্রামীণ ও দরিদ্র।

সুরাইয়া খাতুনের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বিথারী গ্রামে। সুরাইয়ার বাবা-মা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার সন্দেশখালির একটা ইটভাটাতে কাজ করেন। সুরাইয়ারা তিন ভাইবোন। সুরাইয়া সবার বড়। সুরাইয়া ক্লাস এইটে পড়ত। বাকি ভাই-বোন ক্লাস থ্রি ও ফাইভে পড়ত। কিন্তু সবার পড়াশোনাই ছিল অনিয়মিত, কারণ ওরা সবাই মিলে ইটভাটাতে থাকে। সুরাইয়া তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ইট তৈরির কাজে হাত লাগায়। ছোট ভাই-বোনদের ওখানেই রাখে, কাজের ফাঁকে দেখাশোনা করে সুরাইয়া। ইটভাটা বন্ধ থাকলে সুরাইয়ারা বাড়ি ফেরে। সুরাইয়া তখন স্কুলে যায়। সুরাইয়া স্কুলে পড়াশোনা ভালো পারে না বলে স্কুলের মাস্টারমশাইরা সুরাইয়াকে বকাবকি করত। সে জন্য সুরাইয়া আর স্কুলে যায় না। ইটভাটাতেই থাকে। পড়াশুনোর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সুরাইয়ার আর পড়াশোনা হলো না, মা-বাবার সঙ্গে আসতে আসতে ইটভাটার কাজেই লেগে গেল।

সুফিয়ার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তে হাকিমপুর গ্রামে। সুফিয়া হাকিমপুর হাই স্কুলে ক্লাস নাইনের ছাত্রী ছিল। সুফিয়ারা তিন ভাইবোন। সুফিয়ার বাবা ব্ল্যাকের কাজ করে। বাংলাদেশে গরু পাঠাত। কিন্তু হঠাৎই ব্ল্যাক বন্ধ হয়ে যায়। সুফিয়ার বাবার পক্ষে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হচ্ছিল। সুফিয়ার বাবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুফিয়াকে বেঙ্গালুরুতে পাঠিয়ে দেয়। চিংড়ি মাছের মাথা ছাড়ানোর কাজে। মাসে ১৫ হাজার টাকা মাইনে পাবে। পড়াশোনা করার ইচ্ছা ছিল। প্রতি মাসে বাড়িতে দশ হাজার টাকা পাঠায় এবং নিজে ব্যাঙ্কে পাঁচ হাজার টাকা জমায়। সুফিয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওর আর পড়াশোনা হলো না।

ধরতি উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বানারহাট ব্লকের তুলসীপাড়া চা বাগানের মেয়ে। তিন ভাই-বোন মা বাবা মিলে পাঁচজনের সংসার। মা চা-বাগানের পাতা তোলার শ্রমিক। বাবাও চা-বাগানেই কাজ করেন। দু’জনের রোজগার মিলে মাসে দশ হাজারের বেশি কিছুতেই হতো না। বাবা যা রোজগার করেন নেশাতেই তা পুরো খরচ হয়ে যায়। ধরতির স্কুলের যাতায়াত, অন্য খরচ চালানো কষ্টকর ছিল। ক্লাস এইট থেকে নাইনে ওঠার পরই ধরতি স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। দু’বছর হয়ে গেল ধরতি আর স্কুলে যায়নি। ১৪ বছর বয়স থেকেই ধরতি মাঝে মাঝে চা পাতা তোলার কাজও করে— সেটা ওর মায়ের বদলি। ধরতির মা স্নায়ু রোগে ভুগছেন। কোচবিহারের মিশন হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছিল, কিন্তু মায়ের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ধরতি নানা জায়গা থেকে পয়সা ধার করে হায়দরাবাদে নিয়ে যায় মাকে, চিকিৎসার জন্য। অনেক ধার হয়ে যায়, চা বাগানে অনেক লেবার এজেন্ট থাকে। এজেন্টের মাধ্যমে ধরতি চেন্নাই থেকে ৭০ কিমি দূরে, একটা গেস্ট হাউসের কিচেনে, সেখানে যে বাঙালিরা চিকিৎসা করাতে আসে তাদের খাওয়া-দাওয়া দেখভাল করার কাজ পেল। ১৪ হাজার টাকা মাইনে, কিন্তু ডিউটিতে জয়েন করতে হয় সকাল সাতটায় আর কাজ শেষ হতে হতে রাত আটটা। স্কুল শেষ হলো না।

পায়েল রায়: হায়দরাবাদের পার্লারে

পায়েল জলপাইগুড়ি জেলার বাতাবাড়ি চা বাগানের বাসিন্দা। তিন বোন, এক ভাই, বাবা-মা, দাদু দিদা— মোট আট জনের সংসার। মা চা পাতা তোলার কাজ করেন। দিনে ২৫০ টাকা মজুরি পান। বাবাও চা বাগানের কাজ করেন, কিন্তু যে টাকা মজুরি পান, সব টাকা মদ খেয়ে উড়িয়ে দেন। দাদু দিদা বুড়ো মানুষ, কোনও কাজ করতে পারেন না, উল্টে প্রতি মাসে এক হাজার টাকার ওষুধ লাগে। চার ভাইবোনের স্কুলে পড়ার খরচ অনেক। পায়েল ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ার পর চা বাগানের ফ্যাক্টরিতে মেশিনে পাতা দেওয়ার কাজে যোগ দেয়। যে টাকা পেত, সেই টাকা দিয়ে ভাইবোনেদের পড়ার খরচ জোগাত। মায়ের রোজগারে সংসার চলত। দাদু-দিদার ওষুধটা আর কেনা হতো না। এমন সময়ে ফ্যাক্টরির সহকর্মী বলে, ‘চল, আমরা হায়দরাবাদ যাই। ওখানে পার্লারের কাজ আছে। প্রথম তিন মাস ট্রেনিং হবে, সে সময়ে থাকা খাওয়া ছাড়াও মাসে ৬ হাজার টাকা দেবে। তিন মাস পর ১৬ হাজার টাকা মাইনে হবে আর থাকা-খাওয়াও পাওয়া যাবে।’ পায়েল হায়দরাবাদে যায়। এখন প্রতি মাসে বাড়িতে ১৫ হাজার টাকা পাঠায়। বাড়ির সবাই খুব খুশি, কিন্তু পায়েল বাড়ি ফিরতে চায়। জমানো টাকা দিয়ে স্কুলে পড়তে চায়।

পারুল মণ্ডল: বাঘের পেটে বাবা

পারুলের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনা জেলার যোগেশগঞ্জ গ্রামে। গ্রামটি সুন্দরবন রায়মঙ্গল আর কালিন্দি নদীর মুখে। পারুলরা চার বোন, পারুল সবার বড়ো। মাটির ঘর, বাবা-মা সবাই একসঙ্গে থাকে। উপার্জন বলতে নদীতে কাঁকড়া ধরা। বাবা-মা দু’জনেই কাঁকড়া ধরেন। পারুল ছোটবোনদের দেখাশোনা করে, ঘরে রান্না করে, আবার স্কুলেও যায়, ক্লাস ১০-এ পড়ে। সব কিছুই তার জীবনে খুব ভালো চলছিল। নদীতে কাঁকড়া ধরার সময়ে হঠাৎ বাপটাকে বাঘে নিয়ে গেল। সে বাধ্য হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে দিল্লি গিয়ে বাচ্চা দেখার কাজ নিতে। মাসে ১৫ হাজার টাকা মাইনে পায়। থাকা, খাওয়াও পায়। পুরো ১৫ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠায়। মা এখন আর নদীতে কাঁকড়া ধরতে যান না, পারুল মানা করেছে— মা যদি আবার বাঘের পেটে যান, ছোট বোনেদের কে দেখবে? পারুলের টাকায় সংসার চলে। বোনেদের পড়াতে চায় পারুল। পারুল পড়াশোনাতে খুব ভালো ছিল। গোবিন্দকাটি হাইস্কুলে পড়ত। প্রতি ক্লাসে প্রথম হতো। পারুল ভেবেছিল পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করবে।

স্কুলছুটের উপাখ্যান

এই মেয়েদের এবং আরও এ রকম অনেক মেয়ের কাহিনি বলেছিলেন ‘জবালা’র বৈতালী গঙ্গোপাধ্যায়। তাও তো এরা পাচার হয়নি, কাজ পেয়েছে, করছে, বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছে, বাড়ির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। দেখলাম যে এ বারের রাজ্য বাজেটে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৪ শতাংশ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করেছে। ছ’টি নতুন মেয়েদের কলেজ— কাঁথি, কালিয়াচক, জঙ্গিপুর, সাগর, তুফানগঞ্জ, ফলতা। প্রতি জেলায় মেয়েদের হোস্টেল যাতে মেয়েরা পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং আর গণিত (স্টেম) শিখতে পারে। আইটিআই-গুলির আধুনিকীকরণের জন্য ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে পিএম-সেতু প্রকল্পের সাহায্যে। এক হাজার স্কুলে অটল টিঙ্কারিং ল্যাব তৈরি হবে ছেলেমেয়েরা যাতে হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখতে পারে। তার জন্য দু’শো কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ছেলেমেয়েদের, বিশেষত মেয়েদের বিজ্ঞান শেখানোর এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু মেয়েরা কি সেই সুযোগগুলো নেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে? বহু মেয়েই নেই। পড়ার ইচ্ছে থাকলেও পড়া বন্ধ করে যে কাজ পাচ্ছে, নিতেই হচ্ছে, অভাব এমন হাঁ করে সংসারকে গিলে খেতে আসছে।

অসংখ্য ইস্কুল বন্ধ, ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পড়াশুনা বাদ দিয়ে হাজারো অন্য কাজ, স্কুলগুলি কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকা থেকে অন্য নানা কাজে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। আর উৎসশ্রীর মাধ্যমে বহু শিক্ষক, বিশেষত শিক্ষিকারা শহরের স্কুলে চলে এসে গ্রামের স্কুলগুলিকে একেবারে শিক্ষক-শূন্য করে দিয়েছে। তাই পরিযায়ী মা বাবারা পরীক্ষায় বসার জন্য একটা স্বীকৃত স্কুলে নাম লিখিয়ে রেখে আবাসিক উদ্যোগে পড়াশোনায় পাঠাচ্ছেন তাঁদের সন্তানদের। বাকি মেয়েরা কেউ পরিবারের অভাবের জন্য, কেউ বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ির জন্য, কেউ বাবাদের নেশার জন্য, কেউ পরিবারের ধার শোধ করতে গিয়ে, কেউ মায়ের বদলি হিসাবে কাজ করতে গিয়ে ইস্কুলের পড়াই শেষ করতে পারছে না। তাদের তো কলেজ দূরে না কাছে, সেটা ভাবার অবকাশই নেই।

এই মেয়েরা যাতে ইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে পারে, পরিবারের চাপ কী রকম, কেন দালালরা ঘুরে বেড়ায়, কোন ঘরে অভাবী মেয়ে আছে, তাঁকে কাজের সুযোগ করে দিয়ে দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, এ সব তো পঞ্চায়েতের দেখার কথা। যেমন এখানে লেখা হয়নি এমন একটি মেয়ের কথা, যার মাদ্রাসার শিক্ষকরা মেয়েটির প্রতি যত্ন নিতেন না, কারণ তাঁরা জানেন এই ছাত্রীর মা-মাসি মুম্বইতে রয়েছে, তাঁরা নিশ্চয়ই সন্দেহ করেন যে, সেই মা-মাসিরা খুব পরিচ্ছন্ন কোনও পেশায় নেই, ফলে সেই মেয়েটিও প্রভাবিত হতে পারে এবং বাকি সহপাঠীদের প্রভাবিত করতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই সেই ছাত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা হতো না। ফলে মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করতে পারল না। এ রকম অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে।

এক সময়ে কন্যাশ্রী ক্লাব হয়েছিল, তাদের দায়িত্ব ছিল এই সব স্কুলছুটদের ওপর নজরদারি করা। পঞ্চায়েতের পাশাপাশি এই রকম উদ্যোগও প্রয়োজন যাতে মেয়েরা দ্বাদশ শ্রেণি সাফল্যের সঙ্গে ডিঙিয়ে চলতি কলেজগুলোতেই যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে স্নাতক স্তরে নয় লক্ষের মতো আসন রয়েছে। এ বারে ভর্তি হয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ। বিখ্যাত দুই মেয়েদের কলেজ লেডি ব্রেবোর্ন ও বেথুন বলছে বহু বিষয়ে আসন পূর্ণ হচ্ছে না। দ্বাদশ শ্রেণি থেকে মেয়েরা কেন আশপাশের কলেজেই যেতে পারছে না, সেই বাধাগুলিকে জানা আর তার প্রতিকার করাই তো এখন জরুরি, কারণ স্কুলছুট মেয়েরাই তো এই রাজ্যের নাবালিকা বিয়ে আর নাবালিকা মাতৃত্বের পরিসংখ্যানকে ক্রমেই ঠেলে উপরে তুলে দিচ্ছে।

লেখক অর্থনীতির শিক্ষক ও সমাজকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *