আরও ছেঁকা তেলে, কেন্দ্রের চিন্তা বাড়াচ্ছে ব্রেন্ট ক্রুড
এই সময়: হরমুজ়ের জলে ফের বাড়ছে যুদ্ধের তাত। যার জেরে চলতি বছর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দর দ্বিতীয় বার সেঞ্চুরির কোঠায় পা রাখার পরেও, তার ‘রানের’ খিদে কমছে না। সোমবার যা পৌঁছে গেল ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে।
ভারতের মতো বৃহৎ দেশ, যাদের বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেলই আমদানি করতে হয়, এই খবর যে তার নীতিনির্ধারকদের ‘খুশি’ করবে না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এইটুকু সরল পাটিগণিত এখন মোটামুটি সবাই জেনে গিয়েছেন, যে তেলের দর যত চড়বে, তত ভারতীয় অর্থনীতির মসৃণ অগ্রগতির পথে কাঁটা বাড়বে। যা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞদের এখন দাবি, বর্তমানে মূল প্রশ্নটা এটা নয় যে তেলের দর আগামী কয়েক দিন-সপ্তাহে কোন উচ্চতায় চড়বে? বরং নয়াদিল্লিকে যে বিষয়টা বেশি চিন্তিত করছে, সেটা হলো, অপরিশোধিত তেলের দরে এই লাফ কি সাময়িক-স্বল্পস্থায়ী, নাকি আগামী বেশ কয়েক মাস থ্রি-ফিগারেই তা ঘোরাফেরা করবে?
অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে চিন্তা বাড়াচ্ছে লিক্যুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাসের (এলএনজি) দরও। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইতিমধ্যেই যে দর বেড়েছে প্রায় ১২০%। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গেল-এর চেয়ারম্যান দীপক গুপ্তা সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন, এলএনজি’র দর ২০ ডলার/প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট ছাড়িয়ে যাওয়ার পরেই দেশে তার চাহিদা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। সোমবার যে দর পৌঁছে গিয়েছে ২৪.৯৬ ডলার/প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে।
তেল এবং সামগ্রিক ভাবে জ্বালানির দর বাড়লে ভারতীয় অর্থনীতির জন্য তা পঞ্চবাণ-এর আঘাত হানে। বাণিজ্য ঘাটতি-কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি এবং রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি টাকার নিরিখে ডলারের বিনিময়দরকেও অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। আর ডলারের ‘দাম’ বৃদ্ধির অবশ্যম্ভাবী ফল, আমদানি খাতে অতিরিক্ত বেশ কয়েক লক্ষ ডলার বাড়তি খরচ।
খোদ রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক রিসার্চ এস্টিমেট-এর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দরে ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার দামবৃদ্ধি দেশের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে ০.৪৯% করে বাড়িয়ে দেয়। এখন যদি কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, দামবৃদ্ধির ধাক্কা দেশবাসীর উপরে না চাপিয়ে পুরোটাই রাজকোষ থেকে ‘ভর্তুকি’ হিসেবে ‘ম্যানেজ’ করা হবে, সেক্ষেত্রে তা রাজস্ব ঘাটতিকে বাড়িয়ে দেবে ০.৪৩%। যা মোটেই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি নয় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর জন্য। আর দীর্ঘমেয়াদে তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠে গেলে তা ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি কেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমানকে বাড়িয়ে (০.৭%-০.৮%) তুলে দিতে পারে। যে জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই স্বল্পমেয়াদে তেলের আরও দরবৃদ্ধি দীর্ঘকালীন মেয়াদে তা শতকের ঘরে থাকার তুলনায় কাঙ্খিত বিকল্প।
বিশেষজ্ঞদের গরিষ্ঠ অংশের মত, কেন্দ্রের কাছে এখন পুরোটাই ক্যাচ-২২ সিচ্যুয়েশন। তেলের দর দেশবাসীর উপর চাপিয়ে মূল্যবৃদ্ধি বাড়তে দেওয়া অথবা দেশবাসীকে ‘স্বস্তি’ দিয়ে রাজকোষ ঘাটতির ফাটল আরও চওড়া হতে দেওয়া। বলাই বাহুল্য, দু’টি বিকল্পেই ‘খারাপ’ তকমা রয়েছে, তবে ব্যালান্সিং রোপ ধরে তাদের মধ্যে কী ভাবে হাঁটে নরেন্দ্র মোদী সরকার, সেটাই দেখার।