আইফোনের ইএমআই থেকে সোনার ঋণ, Gen Z-এর ঋণের ফাঁদ কতটা গভীর?
মুম্বই: ভারতে তরুণ প্রজন্মে বা Gen Z-এর মধ্যে ঋণ নিয়ে ভোগ্যপণ্য কেনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। আইফোনের মতো দামি স্মার্টফোনের ইএমআই থেকে শুরু করে ক্রেডিট কার্ড,…
মুম্বই: ভারতে তরুণ প্রজন্মে বা Gen Z-এর মধ্যে ঋণ নিয়ে ভোগ্যপণ্য কেনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। আইফোনের মতো দামি স্মার্টফোনের ইএমআই থেকে শুরু করে ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ এবং সোনার বিনিময়ে ঋণ, সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে ধার নেওয়ার প্রবণতা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, ভারতের পারিবারিক ঋণের চরিত্র বদলাচ্ছে। সম্পদ তৈরির বদলে দৈনন্দিন ভোগের জন্য ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রবণতার মর্মান্তিক দিক সামনে এসেছে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে।
আইফোনের ইএমআই নিয়ে বিবাদ, মর্মান্তিক পরিণতি
গত ২১ আগস্ট ১৯ বছরের কুণাল চাঁদগুড়ের সঙ্গে তাঁর বাবার আইফোনের ইএমআই নিয়ে বচসা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের দাবি, কুণালের পক্ষে আইফোনের কিস্তি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরপর ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের উপকণ্ঠে খাভদা পাহাড়ে কুণাল চলে যান। সেখানে তিনি পাহাড়ের কিনারা থেকে পড়ে গেলে তাঁকে বাঁচাতে তাঁর বাবা মুরলিধর এগিয়ে যান। তিনিও পড়ে যান। তাঁদের মা সঙ্গীতা কয়েক মুহূর্ত পর ঝাঁপ দেন বলে জানা যায়। তিনজনেরই মৃত্যু হয়। এর আগে মে মাসে হায়দরাবাদেও আইফোন কেনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বিবাদের পর এক মহিলার মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছিল। দুটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কিন্তু দুটিই একটি বড় প্রবণতার দিকে নজর ফেরাচ্ছে, আর সেই প্রবণতা হল আয়ের তুলনায় বেশি খরচ মেটাতে ক্রমশ ঋণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।
Also Read | আগামী ২ বছরে ভারতের খাতে যোগ হবে ৫০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি
আইফোন কেন স্ট্যাটাস সিম্বল?
ভারতে কত মানুষ আইফোন কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছেন, অ্যাপল তার কোনও আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তবে ঋণ এবং অর্থায়ন সংক্রান্ত সংস্থাগুলির তথ্য থেকে প্রবণতাটি বোঝা যায়। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ভারতে বিক্রি হওয়া স্মার্টফোনের প্রায় ৪২ শতাংশ ইএমআইয়ের মাধ্যমে কেনা হতে পারে। প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি। এই বিভাগে প্রায় প্রতি তিনটি ফোনের মধ্যে দুটির কেনাকাটা কিস্তির মাধ্যমে হচ্ছে বলে ওই তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। আইফোনের ক্ষেত্রে কিস্তির মেয়াদও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতে অ্যাপল ফোনের গড় পরিশোধের মেয়াদ ছিল ১৭.২ মাস। মূলধারার খুচরো বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের গড় মেয়াদ ছিল প্রায় ১০ মাস। দীর্ঘ ইএমআই মেয়াদ ফোনটিকে সস্তা করে না। বরং বড় অঙ্কের দামকে দীর্ঘ সময়ে ভাগ করে মাসিক কিস্তির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম দেখায়।
Also Read | এলপিজি ভুলে পিএনজি গ্রহণে গতি বাড়ানোর তাগাদা মোদী সরকারের
আয়ের তুলনায় দাম কতটা বেশি?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ভারতে নিয়মিত বেতনভোগী কর্মীর গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ২০,৭০০ টাকা। অন্যদিকে ৭৫ হাজার টাকার একটি আইফোনের দাম দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের মাসিক আয়ের তুলনায় অনেকটাই বেশি। ফলে অনেক ক্রেতার ক্ষেত্রে ইএমআই সেই পণ্য কেনার সামর্থ্যের ফারাকটিকে আড়াল করছে। তবুও ভারতে অ্যাপলের ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১.৪ কোটি আইফোন সরবরাহ করেছে অ্যাপল। মোট স্মার্টফোন সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের বাজার অংশীদারিত্ব বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৭ শতাংশ। ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের স্মার্টফোনের বাজারও গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির পিছনে কিস্তিভিত্তিক কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পারিবারিক ঋণ বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
ভারতের পারিবারিক ঋণের ছবিও একই সঙ্গে বদলাচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আর্থিক স্থিতিশীলতা সংক্রান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ভারতের পারিবারিক ঋণ ছিল জিডিপির ৪১.৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনের রিপোর্টে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী এই হার বেড়ে ৪৫.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু মোট ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণ কোথায় যাচ্ছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নন-হাউজিং খুচরো ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং ভোগ্যপণ্য কেনার ঋণ এখন মোট পারিবারিক ঋণের প্রায় ৫৮.৪ শতাংশ। ২০১৯-২০ সালে এই অংশ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে বাড়ি কেনার মতো সম্পদ তৈরির সঙ্গে যুক্ত ঋণের অংশ মাত্র ২৬.৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভারতীয় পরিবারগুলির ঋণের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ সম্পদ তৈরির পরিবর্তে ভোগের পিছনে যাচ্ছে।
সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে সোনার ঋণ
এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় উদাহরণ সোনার বিনিময়ে ঋণ। ব্যাঙ্কগুলির সোনার গয়নার বিপরীতে দেওয়া ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩.১৬ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৪.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা হয়েছে। মাত্র সাত মাসে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। পরিবারের হাতে থাকা সোনা এখন শুধু সঞ্চয় বা অলঙ্কার হিসেবে নয়, বর্তমান খরচ মেটানোর জন্য দ্রুত নগদ পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
দ্রুত ঋণ ব্যবস্থায় ঢুকছে জেন-জ়ি
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য বয়সভিত্তিক ঋণের হিসাব দেয় না। তবে ট্রান্সইউনিয়ন সিআইবিআইএলের তথ্য থেকে তরুণদের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ সালে ভারতে নতুন করে ঋণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৪১ শতাংশই জেন-জ়ি। এই প্রজন্মের অনেকেই বাড়ি বা গাড়ির মতো বড় সম্পদের ঋণ দিয়ে ক্রেডিট ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে না। বরং ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ এবং ভোগ্যপণ্য কেনার ঋণ, যার মধ্যে স্মার্টফোনও রয়েছে, তাদের ঋণ ব্যবস্থায় প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে। ছোট অঙ্কের ৫০ হাজার টাকার নিচের ব্যক্তিগত ঋণের বাজারে ফিনটেক সংস্থাগুলির অংশীদারিত্ব প্রায় ৫৭ শতাংশ। তাদের ঋণের প্রায় ৭০.৫ শতাংশই জামানতবিহীন ঋণ। এই ধরনের ঋণের প্রায় অর্ধেকই ৩৫ বছরের কম বয়সি গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে।
ছোট ঋণে খেলাপির হারও বেশি
তরুণ এবং নতুন ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে উদ্বেগের আরও একটি কারণ হল ঋণ পরিশোধে অনিয়ম। ২০২৬ সালের মার্চে ৫০ হাজার টাকার নিচের ছোট অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণে খেলাপির হার ছিল প্রায় ৬.৪ শতাংশ। যেখানে সামগ্রিক জামানতবিহীন খুচরো ঋণের ক্ষেত্রে মোট অনুৎপাদক সম্পদের হার ছিল প্রায় ১.৭ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন এবং ছোট ঋণের গ্রাহকদের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি আর্থিক চাপে রয়েছে।
ক্রেডিট কার্ডেও বাড়ছে ধার
দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে ভারতে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা প্রায় ৫.২ কোটি। ২০১৬ সালের তুলনায় যা ৩.৬ গুণ বেশি। এই সময়ে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া ঋণের পরিমাণ আরও দ্রুত বেড়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় তা ৮.৩ গুণ বেড়ে ৩.১ লক্ষ কোটি টাকা হয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চে একজন ঋণগ্রহীতার গড় ঋণের পরিমাণ ছিল ৩.৪১ লক্ষ টাকা। তা বেড়ে এখন প্রায় ৪.৭৮ লক্ষ টাকা হয়েছে।
এখনও বড় ধরনের ঋণ সংকট নয়, কিন্তু ছবিটা বদলাচ্ছে
এখনও ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় কোনও বড় ধরনের ঋণ সংকট দেখা দেয়নি। ব্যাঙ্কগুলির মোট অনুৎপাদক সম্পদের হার বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, প্রায় ১.৮ শতাংশ। অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেও ভারতের পরিবারের আর্থিক অবস্থাকে অর্থনীতির শক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, পারিবারিক ঋণের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাড়ি বা অন্য কোনও সম্পদ তৈরির জন্য ঋণের পাশাপাশি এখন স্মার্টফোন, ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত খরচ এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণের ব্যবহার বাড়ছে। সোনার মতো পারিবারিক সম্পদও বর্তমান খরচ মেটাতে বন্ধক রাখা হচ্ছে।
ফলে ভারতের পরিবারগুলি পরিসংখ্যানের হিসাবে এখনও আর্থিকভাবে স্থিতিশীল দেখালেও, ঋণের চাপের প্রকৃতি যে বদলাচ্ছে, তা স্পষ্ট। আর ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের সেই মর্মান্তিক ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিল, এই পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।