পাঁচ বছরে মোট ঋণের ১০ শতাংশ হতে পারে Gold Loan, দাবি জেপি মরগ্যানের
নয়াদিল্লি: ভারতে সোনার ঋণের (Gold Loan) বাজার আগামী পাঁচ বছরে আরও দ্রুত বাড়তে পারে। মার্কিন আর্থিক সংস্থা জেপি মরগ্যানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট…
নয়াদিল্লি: ভারতে সোনার ঋণের (Gold Loan) বাজার আগামী পাঁচ বছরে আরও দ্রুত বাড়তে পারে। মার্কিন আর্থিক সংস্থা জেপি মরগ্যানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট ঋণের মধ্যে গোল্ড লোন বা সোনার বিনিময়ে নেওয়া ঋণের অংশ আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ২০২৪ অর্থবর্ষে এই অংশ ছিল প্রায় ২ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবর্ষে বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হয়েছে।
জেপি মরগ্যানের মতে, দেশে সোনাকে শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পদ বা গয়না হিসেবে দেখার প্রবণতা বদলাচ্ছে। ধীরে ধীরে সোনাকে প্রয়োজনের সময়ে নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ হিসেবে দেখছেন পরিবার ও ছোট ব্যবসাগুলি। আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঋণদাতাদের কম ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এই পরিবর্তনকে আরও গতি দিচ্ছে।
সোনার গয়না বন্ধক রেখে ঋণে আগ্রহ বাড়ছে
গোল্ড লোনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা সাধারণ ব্যক্তিগত ঋণের তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৬ শতাংশ কম সুদের হার পাওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে, ঋণদাতাদের কাছে সোনা একটি সুরক্ষিত জামানত হওয়ায় ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। তবে দ্রুত বৃদ্ধির পরেও দেশে গোল্ড লোনের ব্যবহার এখনও খুব বেশি নয়। জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, দেশের নিচের ৬০ শতাংশ পরিবারের হাতে থাকা সোনার মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ বর্তমানে জামানত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে গোল্ড লোনকে শক্তিশালী বৃদ্ধির সম্ভাবনাযুক্ত সুরক্ষিত খুচরো ঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেপি মরগ্যানের মতে, আগামী দিনের বৃদ্ধি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল হতে পারে।
খুচরো ঋণে গোল্ড লোনের অংশ বাড়ছে
খুচরো ঋণের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট। ২০২৬ অর্থবর্ষে মোট খুচরো ঋণ বিতরণের প্রায় ৪১ শতাংশ এসেছে গোল্ড লোন থেকে। ২০২৩ অর্থবর্ষে এই হার ছিল ১৮ শতাংশ এবং ২০২৪ অর্থবর্ষে ২০ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে ব্যক্তিগত ঋণের অংশ ১৬ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে নেমেছে। ব্যক্তিগত ঋণের সুদের হার সাধারণত গোল্ড লোনের তুলনায় ৩ থেকে ৬ শতাংশ বেশি হওয়ায় পরিবারের কাছে সোনার বিনিময়ে ঋণ নেওয়া ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
পড়াশোনা, চিকিৎসা থেকে ব্যবসার মূলধন
আর্থিক সচেতনতা বাড়ার ফলে অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা গয়না বন্ধক রেখে জরুরি অর্থের ব্যবস্থা করছে। শিক্ষার খরচ, চিকিৎসা, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে গোল্ড লোন ব্যবহার বাড়ছে। ছোট ব্যবসাগুলিও কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে সোনার বিনিময়ে ঋণের দিকে ঝুঁকছে।
বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কে দ্বিতীয় বৃহত্তম খুচরো ঋণ
গোল্ড লোন ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির খুচরো ঋণের অন্যতম বড় অংশ হয়ে উঠেছে। অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের ঋণ-সহ গোল্ড লোন ২০২৬ সালের মে মাসে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির মোট খুচরো ঋণের ১৫.৪ শতাংশ দখল করেছে। বন্ধকী ঋণের পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রেণি। গত দুই বছরে খুচরো গোল্ড লোন বেড়েছে ১১২ শতাংশ। একই সময়ে মোট খুচরো ঋণের বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ।
এখনও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে
বর্তমানে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় আনুমানিক ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ টন পারিবারিক সোনা জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের নিচের ৬০ শতাংশ পরিবারের হাতে আনুমানিক ১২,৫০০ টন সোনা রয়েছে। অর্থাৎ এই অংশের মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ সোনা বর্তমানে ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এনবিএফসি বা ব্যাঙ্ক-বহির্ভূত আর্থিক সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে এই অনুপ্রবেশ আরও কম, মাত্র ২.৬ শতাংশ। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রে তা ৯.৬ শতাংশ। জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় পরিবারগুলির হাতে মোট প্রায় ২৫,০০০ টন সোনা রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে রয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
দক্ষিণ ভারতেই কি সবচেয়ে বেশি গোল্ড লোন?
দক্ষিণ ভারত বর্তমানে দেশের মোট গোল্ড লোনের প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। কিন্তু জেপি মরগ্যান বলছে, এর অর্থ এই নয় যে দক্ষিণ ভারতের বাজার সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়ে গিয়েছে। দক্ষিণ ভারতে এনবিএফসি-র গোল্ড লোন অনুপ্রবেশের হার প্রায় ২.৬ শতাংশ। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তা প্রায় ২.১ থেকে ২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান খুব বেশি নয়।
দক্ষিণ ভারতের পরিবারগুলির হাতে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পারিবারিক সোনা থাকায় সেখানে এখনও বড় বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য ব্যাঙ্ক ও আর্থিক সংস্থাগুলিকে আরও বেশি শাখা এবং বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গোল্ড লোনের অনুপ্রবেশ এখনও মাত্র ৪ থেকে ৭ শতাংশ।
ব্যাঙ্ক-এনবিএফসির প্রতিযোগিতা বাড়বে
গোল্ড লোনের বাজারে ব্যাঙ্ক এবং এনবিএফসির মধ্যে প্রতিযোগিতাও আগামী দিনে বাড়তে পারে। তবে প্রতিষ্ঠিত গোল্ড লোন সংস্থাগুলির হাতে বড় শাখা নেটওয়ার্ক, উন্নত বিতরণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত ঋণ দেওয়ার সুবিধা রয়েছে। এই কারণগুলি নতুন সংস্থার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে এবং পুরনো ঋণদাতাদের মুনাফা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে বলে জানিয়েছে জেপি মরগ্যান।
বর্তমানে গোল্ড লোনের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির দখলে। তবে এনবিএফসিগুলিও ধীরে ধীরে তাদের অংশ বাড়াচ্ছে। গোল্ড লোন-কেন্দ্রিক এনবিএফসিগুলি মূলত জামানতের উপর ভিত্তি করে ঋণ অনুমোদন করে। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি তুলনামূলকভাবে ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থার উপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
সোনার দাম বাড়ায় ঋণের অঙ্কও বাড়ছে
গোল্ড লোনের বাজার বৃদ্ধির পিছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল সোনার দাম বৃদ্ধি। সোনার দাম বাড়ায় একই পরিমাণ সোনা বন্ধক রেখে আগের তুলনায় বেশি ঋণ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে ঋণের পরিমাণের বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে নতুন ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত হচ্ছে।
জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস সত্যি হলে, আগামী পাঁচ বছরে গোল্ড লোন ভারতের ঋণবাজারের আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের সঞ্চিত সোনাকে নগদে রূপান্তর করার প্রবণতা এবং তুলনামূলক কম সুদের হার এই বাজারের বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
Also Read | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের