মোবাইল টাওয়ার ছাড়াই ফোনে নেটওয়ার্ক, ৬ ব্যান্ডে স্যাটেলাইট সংযোগের প্রস্তাব

নয়াদিল্লি: মোবাইল টাওয়ারের নেটওয়ার্ক না থাকলেও সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্মার্টফোনে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে ভারতে। সেই লক্ষ্যে ৬টি মোবাইল ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড স্যাটেলাইটভিত্তিক Direct-to-Device (D2D) পরিষেবার জন্য ব্যবহারের সুপারিশ করেছে টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা Telecom Regulatory Authority of India (TRAI)। প্রস্তাব কার্যকর হলে স্যাটেলাইট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তি করে দেশের প্রত্যন্ত ও নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় সংযোগ পৌঁছে দিতে পারবে।
TRAI-এর চিহ্নিত ছ’টি ব্যান্ড হল ৬০০MHz, ৭০০MHz, ৮০০MHz, ৯০০MHz, ১৮০০MHz এবং ২১০০MHz। এগুলি বর্তমানে প্রচলিত মোবাইল পরিষেবায় ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড। নির্দিষ্ট শর্ত মেনে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককেও এই ব্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
৫ নভেম্বর প্রকাশিত এই সুপারিশের লক্ষ্য স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার জন্য একটি পৃথক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা। এর প্রভাব পড়তে পারে Starlink, Bharti-সমর্থিত Eutelsat OneWeb এবং Reliance Jio-র স্যাটেলাইট ব্যবসার উপর। তবে এগুলি এখনও চূড়ান্ত সরকারি নিয়ম নয়। এবার প্রস্তাবগুলি বিবেচনা করবে Department of Telecommunications (DoT)।
কোন ৬টি মোবাইল ব্যান্ডে স্যাটেলাইট সংযোগের প্রস্তাব?
TRAI-এর সুপারিশ অনুযায়ী, Frequency Division Duplexing বা FDD ব্যবস্থার অধীনে ছ’টি মোবাইল ব্যান্ড স্যাটেলাইটভিত্তিক D2D পরিষেবায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
| ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড | প্রস্তাবিত ব্যবহার |
| ৬০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
| ৭০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
| ৮০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
| ৯০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
| ১৮০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
| ২১০০MHz | স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ |
সাধারণ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে অনেক সময় আলাদা ডিশ বা টার্মিনালের প্রয়োজন হয়। কিন্তু D2D প্রযুক্তির লক্ষ্য হল উপযুক্ত প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্টফোনের সঙ্গে সরাসরি স্যাটেলাইটের যোগাযোগ তৈরি করা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমানে বাজারে থাকা সমস্ত স্মার্টফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাটেলাইটের সিগন্যাল পেতে শুরু করবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার, ডিভাইসের সামঞ্জস্য, নেটওয়ার্ক সাপোর্ট এবং বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু হওয়া জরুরি।
স্যাটেলাইট সংযোগে টেলিকম সংস্থার ভূমিকা কী হবে?
TRAI-এর প্রস্তাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। যে স্যাটেলাইট সংস্থাগুলি D2D পরিষেবা দিতে চাইবে, তারা নিজেরা ইচ্ছামতো টেলিকম অপারেটরদের বরাদ্দ করা মোবাইল স্পেকট্রাম ব্যবহার করতে পারবে না।
এর জন্য সংশ্লিষ্ট স্পেকট্রামের মালিক টেলিকম অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। চুক্তিতে ভারতের ২২টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সার্ভিস এরিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি চ্যানেলের ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এক বা একাধিক যোগ্য টেলিকম অপারেটর যৌথভাবেও প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তিন পক্ষের ভূমিকা হবে আলাদা:
- স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রদানকারী: স্যাটেলাইট পরিকাঠামো পরিচালনা করবে এবং নেটওয়ার্ক সক্ষমতা সরবরাহ করবে।
- টেলিকম অপারেটর: নিজেদের বরাদ্দ করা মোবাইল স্পেকট্রাম ব্যবহারের অনুমতি দেবে এবং গ্রাহকদের পরিষেবা পৌঁছে দেবে।
- স্মার্টফোন ব্যবহারকারী: উপযুক্ত ডিভাইস ও সমর্থিত পরিষেবার মাধ্যমে স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করবেন।
স্পেকট্রামের মালিকানা টেলিকম অপারেটরের কাছেই থাকবে। স্যাটেলাইট সংস্থা চুক্তির ভিত্তিতে সেই স্পেকট্রাম ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
TRAI আরও সুপারিশ করেছে, ইতিমধ্যে বরাদ্দ পাওয়া মোবাইল স্পেকট্রাম স্যাটেলাইটভিত্তিক D2D পরিষেবায় ব্যবহারের জন্য টেলিকম অপারেটরদের অতিরিক্ত স্পেকট্রাম চার্জ দিতে হবে না। তাঁদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মে প্রযোজ্য স্পেকট্রাম চার্জই বহাল থাকবে।
WRC-27 সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না?
স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি মোবাইলে সংযোগের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল World Radiocommunication Conference 2027 বা WRC-27। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যান্ডে D2D পরিষেবা চালুর অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে TRAI।
তবে এই পরিষেবাকে Non-Interference and Non-Protection ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। অর্থাৎ, স্যাটেলাইট পরিষেবা কোনও অনুমোদিত নেটওয়ার্কে ক্ষতিকর সিগন্যালের বাধা তৈরি করতে পারবে না। আবার অন্য কোনও নেটওয়ার্কের কারণে স্যাটেলাইট পরিষেবায় বাধা তৈরি হলে সেই পরিষেবা বিশেষ সুরক্ষার অধিকারও পাবে না।
এছাড়া ভারতের National Frequency Allocation Plan-এ চিহ্নিত মোবাইল ব্যান্ডগুলিতে Mobile Satellite Service (MSS)-কে Secondary Service হিসেবে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিদ্যমান পরিষেবাগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে স্যাটেলাইট সিগন্যালের উপর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আরোপের কথাও বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতের স্মার্টফোনে স্যাটেলাইট সংযোগের হার্ডওয়্যার?
শুধু প্রচলিত মোবাইল ফ্রিকোয়েন্সি নয়, স্যাটেলাইট পরিষেবার জন্য নির্দিষ্ট Mobile Satellite Service বা MSS স্পেকট্রাম ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে TRAI-এর সুপারিশে। এর মধ্যে L-band এবং S-band ফ্রিকোয়েন্সিতে D2D পরিষেবা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে ভারতে বিক্রি হওয়া স্মার্টফোনে এই স্যাটেলাইট ফ্রিকোয়েন্সি সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় মডিউল যুক্ত করতে নির্মাতাদের উৎসাহিত করার সুপারিশ করেছে TRAI।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্মার্টফোন নির্মাতাদের প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার যুক্ত করতে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলেছে। প্রতিটি স্মার্টফোনে স্যাটেলাইট সংযোগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেয়নি।
Starlink, Jio ও OneWeb-এর জন্য কী সুযোগ তৈরি হতে পারে?
স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে এই প্রস্তাব। TRAI, Telecommunications Act, 2023-এর অধীনে Satellite Communication Network Provider Authorisation নামে একটি নতুন অনুমোদন কাঠামো তৈরির সুপারিশ করেছে।
এই অনুমোদন পাওয়া সংস্থাগুলি Satellite Communication Network as a Service বা SCNaaS হিসেবে যোগ্য টেলিকম অপারেটর এবং অন্যান্য অনুমোদিত পরিষেবা প্রদানকারীকে নেটওয়ার্ক পরিষেবা দিতে পারবে। সহজ কথায়, স্যাটেলাইট সংস্থাগুলি নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো পরিচালনা করবে এবং তার সক্ষমতা টেলিকম সংস্থাগুলিকে সরবরাহ করবে। টেলিকম সংস্থাগুলি সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করে গ্রাহকদের পরিষেবা দিতে পারবে।
প্রস্তাবিত অনুমোদন গোটা ভারতের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং এর মেয়াদ সর্বোচ্চ ২০ বছর রাখার কথা বলা হয়েছে। পরে আরও সর্বোচ্চ ২০ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
তবে এই অনুমোদনের আওতায় থাকা স্যাটেলাইট সংস্থাগুলি সরাসরি সাধারণ গ্রাহকদের টেলিকম পরিষেবা দিতে পারবে না। ফলে Starlink, OneWeb এবং Jio-র মতো সংস্থার জন্য টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে কাজ করার একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
এখানে মনে রাখতে হবে, TRAI-এর এই সুপারিশকে ভারতে Starlink-এর বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর অনুমোদন হিসেবে দেখা যাবে না। সংস্থাটির পরিষেবা কবে চালু হবে, সে সম্পর্কেও কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
স্যাটেলাইট সংস্থাগুলির জন্য কী কী ফি প্রস্তাব?
নতুন অনুমোদন পেতে আগ্রহী সংস্থাগুলির জন্য আর্থিক শর্তও নির্ধারণের সুপারিশ করেছে TRAI।
| আর্থিক শর্ত | প্রস্তাবিত পরিমাণ |
| প্রবেশমূল্য | ৩৭.৫ লক্ষ টাকা |
| প্রাথমিক ন্যূনতম গ্যারান্টি | ৪৫ লক্ষ টাকা |
| ন্যূনতম ইক্যুইটি | ৬০ লক্ষ টাকা |
| ন্যূনতম নেট ওয়ার্থ | ৬০ লক্ষ টাকা |
| আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ফি | ১০,০০০ টাকা |
| অনুমোদন ফি | Adjusted Gross Revenue (AGR)-এর ৮ শতাংশ |
এছাড়া TRAI সুপারিশ করেছে, ন্যূনতম অনুমোদন ফি ছাড়াই AGR-এর ৮ শতাংশ হারে অনুমোদন ফি নেওয়া যেতে পারে। সরকার কোনও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রদানকারীকে FSS বা MSS স্পেকট্রাম বরাদ্দ করলে প্রতি MHz পিছু বছরে ন্যূনতম ৩,৫০০ টাকা স্পেকট্রাম চার্জ ধার্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।
স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম বরাদ্দের মেয়াদ সাধারণত সর্বোচ্চ পাঁচ বছর রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
এরপর কী হবে?
TRAI জানিয়েছে, ৩১টি অংশীদার সংস্থার মতামত এবং ১২টি সংস্থার পাল্টা মতামত বিবেচনা করে এই সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রস্তাবগুলি নিয়ে ওপেন হাউস আলোচনাও হয়েছিল।
এবার DoT সুপারিশগুলি খতিয়ে দেখে কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এবং কীভাবে তা কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রস্তাবগুলি কার্যকর হলে মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমিত পরিসরের বাইরে থাকা এলাকায় যোগাযোগ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি ফোনে সংযোগ এখনই চালু হচ্ছে না। সরকারি অনুমোদনের পাশাপাশি স্যাটেলাইট সংস্থা ও টেলিকম অপারেটরদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে। ডিভাইসের সামঞ্জস্য এবং বাণিজ্যিক পরিষেবার প্রস্তুতিও এই প্রযুক্তির বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel