কোন অসীমের বাইরে যেতে চেয়েছেন ’৯৭-এ উত্তীর্ণ শিল্পীরা
অতনু বসু
কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে ’৯৭-এ উত্তীর্ণ ব্যাচটির তৃতীয় প্রদর্শনী শেষ হলো অ্যাকাডেমিতে। সকলেই যে নিরন্তর চর্চার মধ্যে আছেন তা নয়। প্রদর্শনীর জন্য কাজ করা, অধ্যাবসায়ের মধ্যে নিয়োজিত থাকা, দুটো আলাদা। এই দুই দর্শন অনেকের কাজে স্পষ্ট। দুর্বল, পরিশ্রমী, মননশীল, পারদর্শী এমনও ক’জন আছেন। কিছু কাজ শিল্পের দৃষ্টিনন্দন দিকগুলোকে প্রতীত করে। যৌথ প্রদর্শনী বরাবর দর্শকের মনস্তত্বকে নাড়া দেয়। বিবিধ সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা আঘাতও উপলব্ধ হয়। এই বৈপরীত্য স্বাভাবিক। যে সব গতিপথের ইঙ্গিত থাকে চিত্র-ভাস্কর্য-ড্রয়িং-এ, তাতে নির্দিষ্ট বস্তুর তাৎপর্য শিল্পের সামগ্রিকতায় আকর্ষক হয়। যদিও সব ক্ষেত্রে তা ফলপ্রসূও হয় না। শিল্পী তাঁর কাজটিতে পূর্ণ স্বাধীনতার চিহ্নিতকরণে ক্রিয়াশীল থাকবেন। প্রদর্শনীতে পেন্টিং, স্কাল্পচার, ড্রয়িং ছাড়া কোনও ছাপচিত্র (গ্রাফিকস-প্রিন্টমেকিং) ছিল না, কারণ নব্বই-এর দশকে ছাত্রাবস্থায় কেউই ডিপ্লোমায় এই মাধ্যমে স্পেশালাইজ়েশন করার সুযোগ পাননি।
প্রায় হারিয়ে যাওয়া পেন্সিল ড্রয়িংকে সামান্যতম কম্পোজ়িশনে গভীরতার বার্তা দিয়েছেন সুদীপ রায়। অবয়বী রিয়েলিজ়মে ইন্ডোর কম্পোজ়িশনের দ্য ফেমিনিন চ্যাপ্টার অব অ্যা মডারেট সিনারিও-র এই তিনটে ড্রয়িংয়ে সংক্ষিপ্ততম পিঙ্ক, ও ডিপ গ্রিন-এ পল্লবের ব্যবহার অনবদ্য। তাঁর কোনওটাই ইলাস্ট্রেটিভ নয়।
টোনাল ও সমতলীয় বর্ণের পটচিত্র সদৃশ এক লৌকিক চরিত্রের আঙ্গিকে প্যাঁচা ও বেড়াল পরিবারের দু’টি বড় অ্যাক্রিলিকের ক্যানভাসে অশোক অধিকারী বেশ মজার কাজ করেছেন। এই জ্যামিতিক রচনা ও স্টাইলাইজ়েশনে তাঁর দক্ষতা প্রশংসনীয়। বিপ্লব মান্নার মিশ্র ধাতুর ‘বায়োসেন্ট্রিজ়িম’ কি মানবকেন্দ্রিক বিরোধীতাকে আঘাত? বঁড়শির সম্মিলিত গুচ্ছকে সরু লোহার শিকের সঙ্গে উপরিভাগের জ্যামিতিক বিন্যাসের মিশ্রণ ও অন্য অনুষঙ্গের ফর্মেশন একটা আলাদা ধরনের ভাবনার রূপান্তরিত অবস্থাকে রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘ডার্ক মেকানিজ়ম’ তুলনায় অত গভীর নয়।

সফ্ট প্যাস্টেলে করা গার্গী গুপ্ত’র গাঢ় রক্তিম বর্ণের কোথাও হালকা সবুজ-নীল-ঘোর কালো মিশ্রিত রচনায় জ্যামিতি আছে, তবে তার বিন্যাসে স্পেস ও অ্যারেঞ্জমেন্টে তৈরি হওয়া সমস্যা কাটাতে হবে।
নীলাঞ্জনা বসুর দু’টি কাজই পেন্টিং কোয়ালিটির চমৎকার দৃষ্টান্ত। বিশেষত সূর্যরশ্মি ভেদ করা উত্থিত রঙিন দীর্ঘকায় বৃক্ষঘেরা আবহ। জলরঙে মৃত্তিকা বসুর পাহাড় মেঘের সহাবস্থানের ল্যান্ডস্কেপ যথাযথ। কিছুটা অনচ্ছ জলরঙের দৃশ্যকল্প।
খোকন রাউথ বরাবর টেক্সচারাল কোয়ালিটির রুক্ষতা তৈরি করেন পটে, এর পর ঘষামাজার প্রয়াসে সৃষ্টি হয় অনেক ক্ষত, তার মধ্যে ক্ষুদ্র উচ্চাবচ সাদা অ্যাক্রিলিক বা মিডিয়মের ব্যবহারে সম্পন্ন করেন কিছু লাইনস, টোন, স্ক্র্যাচ, বর্ণ, একটা অভিঘাত তৈরির উদ্দেশ্যে। শাঁওলী দে’র কাজে ইমপ্যাস্টোর মতো বর্ণ ব্যবহার ও রচনায় ভীষণ ইউরোপীয় প্রভাব। স্পেস নিয়ে সুমিত মজুমদার সমস্যায় ছিলেন কি? রং সব সময়ে ছবিকে উতরে দেয় না। তাঁকে কম্পোজ়িশন নিয়ে ভাবতে হবে।
তাপস সর্দারের দুই নারীর সহাবস্থান রচনা, স্টাইল, কম্পোজ়িশন, টেকনিক সমৃদ্ধ কাজটি অনন্য পেন্টিংয়ের দৃষ্টান্ত। অর্পিতা বসু রায়ের ছবিতে আলঙ্কারিক বিন্যাস, ট্রিটমেন্ট দৃষ্টিনন্দন। তবে গুস্তভ ক্লিমত্ আড়ালে রয়ে যান। তাঁর কাজে ফড়িং-সহ পদ্ম, কুঁড়ির সমগ্র রচনা বেশ জমাট। স্বপন বালা মেয়েদের আড্ডাকে অয়েলে চমৎকার কম্পোজ় করেছেন। ট্রিটমেন্ট যথার্থ, কিন্তু অন্য কাজে মেয়েটির অমন পৃথুল, স্ফীত হাতের ড্রয়িং বিসদৃশ। প্রবীর দত্ত দু’টি ঘোড়ার ফোর্স, ঝোড়ো দুরন্ত ব্রাশিংয়ে নিয়ন্ত্রিত স্টাইলে যথেষ্ট উন্নত মানের অয়েল করেছেন। হাইলাইটস, টোনাল ভেরিয়েশনও দেখার মতো। চন্দন মিশ্রর পেন্টিংয়ের সমগ্র আবহে রং রেখার কম্পোজ়িশন ট্রিটমেন্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট-এর গুণগত মান যথেষ্ট আকর্ষণীয়। অপেক্ষাকৃত ঔজ্জ্বল্যকে বরণ না করে নম্র মেদুর বর্ণের স্বপ্নিল পরিবেশের মোহময় আলো ও নৈসর্গিক এক মুগ্ধতা ছবিকে অন্য স্তরে নিয়ে যায়। প্রতিটি পেন্টিংয়ে সেই গভীরতা ও রিয়েলিজ়মের ছাপ স্পষ্ট।
বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মর্ডানিজ়মে হঠাৎই নারীদেহের উপরিভাগের সঙ্গে ওই কম্পোজি়শন বেমানান। সমীর পালের কাজ ভীষণ রিজিড। মৃণাল শীল আহামরি নয়। এ ছাড়া নিলয়কান্তি বিশ্বাস, সুপর্ণা মজুমদার, প্রশান্ত মল্লিক মোটামুটি।