কালীপুজো শুরুর আগে কেন শিয়ালের উদ্দেশে নিবেদন করা হয় খাবার? শিবাভোগ আসলে কী?
কেন দেওয়া হয় শিবা ভোগ?
জ্যোতিষবিদ দেবোজ্যোতি মজুমদার জানান, কালীপুজো তান্ত্রিক পুজো। এ পুজোয় বলি এক অপরিহার্য অঙ্গ। প্রচলিত বিশ্বাস, বলি ভিন্ন কালীপুজোয় অঙ্গহানি হয় এবং পুজো নিষ্ফল হয়। কৈলাচারে কালী পুজোয় একাধিক বলিদানের বিধি রয়েছে। যথা সর্ব ভূত কে বলিদান, সর্বপথিক দেবতাকে বলিদান গণেশকে বলিদান, যোগিনীকে বলিদান, ক্ষেত্রপাল কে বলিদান, বটুক কে বলিদান, শিবা কে বলিদান। এখানে শিবা অর্থাৎ শিয়াল।
কী ভাবে নিবেদন করতে হয় ভোগ?
এই শিবা হলেন স্বয়ং দেবী শিবের অর্ধাঙ্গিনী। অর্থাৎ, জগৎজননী দেবী প্রাণী দেহ ধারণ করে সাধকের উৎসর্গকৃত বলি গ্রহণ করেন। সাধুকে ভ্রষ্ট হওয়ার পথ থেকে রক্ষা করেন এবং সাধকের সাধনার উন্নতির দিক নির্ধারণ করেন। মহানির্মাণ তন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, বিল্লমূলে শ্মশান প্রান্তরে বাস শুন্য মন্ডপে শিবা আকর্ষণ মন্ত্র জপ করতে হয়। অর্থাৎ, শ্মশানে বেল গাছের তলায় শিয়ালের উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করতে হয়। নির্দিষ্ট মন্ত্র জপ করে শিয়ালের আবাহন করতে হয়।
বলিপাত্র পর্যন্ত শিবা আবাহন করতে হয়। শিবা বলি পাত্রে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ইষ্ট মন্ত্র জপ করতে হয়। এবং পঞ্চপচার দিয়ে ইষ্ট দেবতার পুজো করতে হয়। শিবা বলি গ্রহণের পর ডাকলে তা শুভ বলে মনে করা হয়। এই ডাকের মাধ্যমেই সাধক সাধনায় সফল হবে না বিফল হবে তা শিবা নির্দেশ করে চলে যায় বলেই বিশ্বাস।
কী ভাবে প্রচারিত হলো এই শিবাভোগের ধারণা?
শিবাভোগের নেপথ্যে রয়েছে তন্ত্রসাধনা ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধন। বাংলার লোকাচারে শিয়ালকে দেবীর দূত, সঙ্গী কিংবা শ্মশানচারী শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শাক্তধর্মে দেবী কালী শ্মশানবাসিনী, উগ্রশক্তির অধিষ্ঠাত্রী। সেই বিশ্বাস থেকেই শিয়ালকে দেবীর পরিবারের সদস্য মনে করে প্রথমে তাকে খাবার নিবেদন করার রীতি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।
শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রচলিত শাক্ত ও তন্ত্রসাধনার সাহিত্যে কালীপুজোর নানা বিধান থাকলেও, শিয়ালকে ভোগ দেওয়াকে সর্বজনীন শাস্ত্রীয় নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নির্দিষ্ট প্রমাণ মেলে না। তবে আজও বহু মন্দির ও বনেদি বাড়ির পুজোয় এই নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।