হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে দেশ-বিদেশে…
কালকূট অর্থাৎ সমরেশ বসু বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক লেখক, যিনি মানুষের জীবনকে শুধু সামাজিক সম্পর্কের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। মানুষের শরীরী অস্তিত্ব, তার কামনা, দুঃখ, নিঃসঙ্গতা, বিশ্বাস, অবিশ্বাস এবং অজানার প্রতি আকর্ষণ তাঁর সাহিত্যে নানা রূপে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত ‘কালকূট’ নামের আড়ালে রচিত ভ্রমণকাহিনি ও উপন্যাসগুলিতে মানুষের বাইরের ভ্রমণের সঙ্গে ভিতরের ভ্রমণও গভীর ভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে। পথ এখানে স্রেফ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছনোর মাধ্যম নয়, পথ মানুষের নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে চিনে নেওয়ারও উপায়। ‘কোথায় পাবো তারে’ শিরোনামটির মধ্যেই আছে এক গভীর মানবিক ব্যাকুলতা। কাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, কোথায় তার সন্ধান, কী ভাবে সেই সন্ধানের পরিণতি ঘটবে— এই প্রশ্নগুলি শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়ার প্রশ্ন নয়। এগুলি মানুষের চিরকালীন অনুসন্ধানেরও প্রতীক। মানুষ কখনও খোঁজে ঈশ্বরকে, কখনও কোনও প্রিয় মানুষকে, কখনও জীবনের অর্থকে, আবার কখনও নিজের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া সত্তাটিকে। এই অনুসন্ধান যতটা বাহ্যিক, তার চেয়ে অনেক বেশি অন্তর্মুখী। কালকূটের সাহিত্যকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে মলুটির মতো লোকবিশ্বাসসমৃদ্ধ জনপদের তাৎপর্য নতুন মাত্রা পায়। মলুটির দীপাবলি বা কালীপুজো এই গ্রামের পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এখানে মা মৌলীক্ষার মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে ধর্মীয় আবহ গড়ে উঠেছে, তা সাধারণ উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। ঝাড়খণ্ডের এই জনপদে দীপাবলির দিন মা মৌলীক্ষাকে কালী রূপে আরাধনা করার ঐতিহ্য আছে। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। দূরে বসবাসকারী গ্রামের মানুষও এই সময় নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসে। ফলে দীপাবলি হয়ে ওঠে পারিবারিক স্মৃতি, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য এবং সমষ্টিগত পরিচয় পুনরুদ্ধারের উপলক্ষ।