সক্রিয় গোপন চক্র! কলকাতার শব্দদূষণের বড় উৎস চম্পাহাটি ও নুঙ্গি

কলকাতা: পুলিশি নজরদারি, ধরপাকড় এবং লাগাতার বাজি বাজেয়াপ্ত করার পরেও কলকাতায় নিষিদ্ধ শব্দবাজির (Illegal Firecrackers) সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি ও নুঙ্গির দুই বড় বাজি বাজার থেকে শহরে পৌঁছে যাচ্ছে নিষিদ্ধ বাজি। অভিযোগ, এই বেআইনি কারবারের পিছনে রয়েছে নির্মাতা, মধ্যস্থতাকারী এবং পরিবহণকারীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। পুলিশের নজর এড়িয়ে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে চলছে লেনদেন।
পুলিশ সূত্রে খবর, গত কয়েক দিনে চম্পাহাটি থেকে প্রায় ৩,৫০০ কেজি নিষিদ্ধ বাজি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩ জনকে। এই ঘটনায় মোট ১২টি মামলা দায়ের হয়েছে। তবে পুলিশের একাংশের মতে, উদ্ধার হওয়া বাজির পরিমাণ আসলে বেআইনি মজুতের তুলনায় খুবই সামান্য। চম্পাহাটি ও নুঙ্গি মিলিয়ে প্রায় ২,৫০০টি দোকান রয়েছে। পাশাপাশি এই দুই এলাকায় কাজ করেন কয়েক হাজার ছোট বাজি প্রস্তুতকারক।
বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জোনাল) অতীশ বিশ্বাস বলেন, “নিষিদ্ধ বাজি বিক্রির অভিযোগ পেলেই পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ করছে। বাজি পরিবহণ আটকাতে বিভিন্ন জায়গায় নাকা চেকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
দোকানে প্রকাশ্যে নেই নিষিদ্ধ বাজি, চলছে আড়ালে সরবরাহ
পুলিশ সূত্রের দাবি, নিষিদ্ধ বাজির কারবার ধরতে সমস্যা হচ্ছে কারণ দোকানে সেগুলি সাধারণত প্রকাশ্যে রাখা হয় না। বিক্রেতারা প্রদর্শনের জন্য সবুজ বাজি রাখছেন। কিন্তু কোনও ক্রেতা বেশি শব্দ হয় এমন বাজি চাইলে তাঁর কাছ থেকে ফোন নম্বর নেওয়া হচ্ছে। তার পরে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য কারও মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে নিষিদ্ধ বাজি।
অভিযোগ, কয়েকজন বাড়িতেই চকলেট বোম, দোদমা এবং নিষিদ্ধ শেল-সহ বিভিন্ন ধরনের বাজি তৈরি করছেন। পরে অটো বা ভ্যানরিকশায় করে সেগুলি কলকাতার দিকে পাঠানো হচ্ছে। এই পরিবহণে বাহক হিসেবে মহিলা ও কমবয়সি শিশুদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাঁদের দেখলে সহজে সন্দেহ হয় না বলেই এই পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছে পুলিশ।
এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, “রাস্তায় একাধিক নাকা চেকিং বসানো হলেও নিষিদ্ধ বাজির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।”
এক বাজি ব্যবসায়ীর বক্তব্য, “বিক্রেতারা দোকানে সবুজ বাজি সাজিয়ে রাখেন। কোনও ক্রেতা জোরে শব্দ হয় এমন বাজি চাইলে তাঁর ফোন নম্বর নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে বলা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে কোনও মহিলা বা শিশু অটো কিংবা রিকশায় করে সেই বাজি পৌঁছে দেয়।”
শহরের একাধিক এলাকায় নিষিদ্ধ বাজি ফাটানোর অভিযোগ
কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে নিষিদ্ধ বাজি ফাটানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। বড়বাজার, গিরিশ পার্ক, সিআর অ্যাভিনিউ, বাঙুর, কাঁকুড়গাছি, বাগুইআটি, নিউ টাউন, সিন্থি, কালিকাপুর, বেহালা, চেতলা, কসবা এবং নিউ আলিপুরের একাধিক অংশে নিয়ম ভেঙে বাজি ফাটানোর খবর মিলেছে।
আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরু গলি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাজি ফাটানো হচ্ছে। ফলে কারা এই কাজ করছে, তা চিহ্নিত করাও পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। শব্দদূষণের পাশাপাশি ব্যস্ত রাস্তায় পথচারী এবং বাইকচালকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৮ নভেম্বর রাত ৮টা থেকে ১০টা, শুধু সবুজ বাজি
রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ৮ নভেম্বর কালীপুজো ও দীপাবলিতে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজি ফাটানো যাবে। তবে এই সময়েও শুধুমাত্র অনুমোদিত সবুজ বাজি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। প্রচলিত শব্দবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিয়ম ভাঙলে বাজি বাজেয়াপ্ত করা থেকে শুরু করে গ্রেফতার পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, শুধুমাত্র NEERI-অনুমোদিত ১,৭০০টি প্রস্তুতকারকের তৈরি সবুজ বাজিই ব্যবহার করা যাবে। অনুমোদিত প্রস্তুতকারকদের তালিকা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা রয়েছে।
শব্দ উৎপন্নকারী বাজির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শব্দসীমা ১২৫ ডেসিবেল এবং আলো উৎপন্নকারী বাজির ক্ষেত্রে ৯০ ডেসিবেল নির্ধারিত হয়েছে। হাসপাতাল, নার্সিংহোম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সহ চিহ্নিত নীরব এলাকার ১০০ মিটারের মধ্যে বাজি ফাটানো নিষিদ্ধ। একইভাবে, দমকল বিভাগের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া আকাশে ফানুস বা স্কাই ল্যান্টার্ন ওড়ালেও আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে।
কালীপুজো ও দীপাবলির আগে পুলিশি নজরদারি বাড়লেও চম্পাহাটি ও নুঙ্গি থেকে নিষিদ্ধ বাজির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম ভেঙে বাজি ফাটানোর অভিযোগ সেই সমস্যাকেই আরও স্পষ্ট করছে।
The latest news from Kolkata, including traffic updates, civic issues, weather, accidents, administrative decisions, and other important information for daily life, is published in this section. Stay tuned regularly to keep up with all the latest updates from the city.