উয়েনো ব্যাঙ্ক বন্ধ, জেলবন্দি প্রতিষ্ঠাতা, পদত্যাগ প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের

আসুনসিওন: নিজের দেশে প্রথম ‘ইউনিকর্ন’ সংস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। পরিকল্পনা ছিল, প্যারাগুয়ের (Paraguay) কোনও সংস্থাকে প্রথমবার নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার। কিন্তু সেই স্বপ্নের বদলে এখন জেলবন্দি ৩৬ বছরের তরুণ ব্যাঙ্কার মিগুয়েল ভাজকেজ। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন উয়েনো ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দিয়েছে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে তারল্য সংকটের কথা। আর এই ব্যাঙ্কের পতনের জেরে বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করতে হয়েছে দেশের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকেও।
উয়েনো ব্যাঙ্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পেনার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন আইনপ্রণেতারা। ব্যাঙ্কটির বিনিয়োগকারী হিসেবে যেমন তাঁর নাম উঠে এসেছে, তেমনই তাঁর প্রশাসন বন্ধ হয়ে যাওয়া এই ব্যাঙ্কে ৮০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সরকারি অর্থ জমা রেখেছিল। প্যারাগুয়ের ইতিহাসে কোনও ব্যাঙ্কে সরকারি আমানতের ক্ষেত্রে এটি ছিল রেকর্ড পরিমাণ। অভিশংসন নিয়ে আইনপ্রণেতাদের আলোচনা চলাকালীন, কিন্তু ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগের ঘোষণা করেন পেনা।
৫০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যাঙ্ক, বিপাকে লক্ষ লক্ষ আমানতকারী
চলতি বছরের গোড়ায় উয়েনো ব্যাঙ্কের মূল্যায়ন হয়েছিল প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। জুন মাসে হাঙ্গেরির ব্যাঙ্ক OTP Bank Plc সংস্থাটির হোল্ডিং কোম্পানিতে নিজেদের অংশীদারি বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করে। তখন উয়েনোর মূল্যায়ন ছিল প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন ডলার। ব্যাঙ্কে ভাজকেজের নিজের অংশীদারির মূল্য একসময় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ফলে ব্যাঙ্কের পতনের আগে লাতিন আমেরিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ প্যারাগুয়ের ধনীতম ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্তের পর উয়েনোতে রাখা নিজেদের অর্থে প্রবেশাধিকার হারিয়েছেন লক্ষ লক্ষ গ্রাহক। একই পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকারি সংস্থাগুলিও। পেনা পদত্যাগের আগে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।
তাঁর বক্তব্য, “আমার একমাত্র অগ্রাধিকার সেই প্যারাগুয়ের নাগরিকদের স্বস্তি নিশ্চিত করা, যাঁরা আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার উপর ভরসা করে নিজেদের সঞ্চয় জমা রেখেছেন। প্রতিটি আমানতের পিছনে রয়েছে বছরের পর বছর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং পরিবারের নানা স্বপ্ন। সেই অর্থ ফিরিয়ে দেওয়াই আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা।”
প্যারাগুয়ের আমানত বিমা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার ডলার পর্যন্ত সুরক্ষার নিশ্চয়তা রয়েছে। তবে উয়েনো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাকি অর্থের কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বাবার ছোট ঋণ ব্যবসা থেকে দেশের অন্যতম বড় ব্যাঙ্ক
ভাজকেজের উত্থানের পিছনে রয়েছে পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস। তাঁর মাতামহ মার্সিডিজ বেঞ্জের স্থানীয় ডিলারশিপের মালিক ছিলেন। অন্যদিকে, পিতামহী বাজারে একটি ছোট দোকানে মুদির সামগ্রী বিক্রি করতেন। তাঁর বাবা সেই বাজারের দোকান থেকেই এমন একটি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসা শুরু করেন, যার লক্ষ্য ছিল ব্যাঙ্কিং পরিষেবার বাইরে থাকা মানুষদের ঋণ দেওয়া।
কিশোর বয়স থেকেই বাবার ব্যবসায় যুক্ত হয়ে ঋণ দেওয়ার কাজে সাহায্য করতেন ভাজকেজ। পরে বাবার তৈরি Credicentro-কে নতুন রূপ দিয়ে ২০২৩ সালে উয়েনো ব্যাঙ্কে পরিণত করেন তিনি। ২০১৪ সালে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে তাঁর LinkedIn প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক উত্তরাধিকার নিয়ে ভাজকেজ বলেছিলেন, “একজন উদ্যোক্তার চেয়েও বেশি, আমি তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। দুই বিশাল ব্যক্তিত্বের কাঁধের উপর দাঁড়িয়ে আমি তাঁদের তৈরি ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”
ব্যাঙ্কটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্যারাগুয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কোনও না কোনওভাবে উয়েনোর পরিষেবা ব্যবহার করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের জাতীয় ফুটবল দলের স্পনসরও হয় ব্যাঙ্কটি। বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারিয়ে প্যারাগুয়ের দল যখন দেশজুড়ে উন্মাদনা তৈরি করেছিল, তখন উয়েনোর নামও ছিল আলোচনায়।
ভাজকেজের মালিকানাধীন Grupo Vázquez-র ব্যবসা শুধু ব্যাঙ্কিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। পশুপালন থেকে ই-কমার্স, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ ছিল এই হোল্ডিং কোম্পানির। সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেখানে কাজ করতেন প্রায় ৬,০০০ কর্মী এবং আয় হয়েছিল ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২০ সালের তুলনায় সংস্থার অধীনস্থ ব্যবসার সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে গত বছরের শেষে দাঁড়িয়েছিল ২৮।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
উয়েনো ব্যাঙ্কের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেনার সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভাজকেজের একটি সংস্থায় বিনিয়োগ করেছিলেন পেনা। তবে সরাসরি উয়েনো ব্যাঙ্কে তাঁর বিনিয়োগ ছিল না।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন উয়েনোতে সরকারি অর্থ জমা রাখার সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন পেনা। তাঁর যুক্তি ছিল, ব্যাঙ্কটি আমানতকারীদের বেশি সুদ দিচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, সরকার আমানতকারীদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখছে। সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে সমালোচনাকে তখন তিনি ‘মিথ্যা ও তুচ্ছ সংবাদমাধ্যমের প্রচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
উয়েনো ব্যাঙ্কের লাইসেন্স পাওয়ার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পেনা ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার কিছুদিন পরেই ব্যাঙ্কিং লাইসেন্স পায় সংস্থাটি। লাইসেন্স অনুমোদন করেছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধান কার্লোস কারভালো। তিনি আগে ভাজকেজের হয়ে কাজ করেছিলেন এবং যে সংস্থাটি পরে উয়েনো ব্যাঙ্কে পরিণত হয়, তার প্রধান ছিলেন। ব্যাঙ্ক বন্ধের সিদ্ধান্তের পর কারভালোকেও পদত্যাগ করতে হয়েছে।
সরকারি আমানতের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উয়েনোতে সরকারি অর্থের পরিমাণ ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলারের কম। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের শেষে প্যারাগুয়ের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় জমা থাকা মোট সরকারি সঞ্চয়ের প্রায় ২০ শতাংশই ছিল উয়েনোতে। এর মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা সংস্থার কয়েকশো মিলিয়ন ডলারও ছিল।
ফুটবল দলের সদস্যরাও বিপাকে
উয়েনো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যদের উপরেও। ব্যাঙ্কটি দলের স্পনসর হওয়ার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের জন্য অ্যাকাউন্টের ব্যবস্থাও করেছিল। খেলোয়াড়দের তরফে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাঁরাও উয়েনোতে রাখা নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থে প্রবেশ করতে পারছেন না।
প্যারাগুয়ের অধিনায়ক গুসতাভো গোমেজ, যিনি বর্তমানে ব্রাজিলের পালমেইরাসেরও অধিনায়ক, তাঁর পোস্টে খেলোয়াড়দের বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছে, “আমরাও এই পরিস্থিতির শিকার। প্যারাগুয়ের বহু পরিবারের মতো আমরাও ক্ষুব্ধ। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত সেই পরিশ্রমী মানুষরা, যাঁরা জীবনের সমস্ত সঞ্চয় সেখানে রেখেছিলেন।”
এদিকে ভাজকেজের আইনজীবী ভিক্টর দান্তে গুলিনো ব্লুমবার্গের প্রশ্নের জবাব দেননি। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ABC-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপাতত বিচার-পূর্ব হেফাজতেই থাকতে হবে ভাজকেজকে।
একসময় গুগলের অফিসের আদলে তৈরি উয়েনোর আসুনসিওন সদর দফতর পরিচিত ছিল ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ নামে। কাচের দেওয়াল, ঝকঝকে কাঠের সাজসজ্জা, ঝুলন্ত গাছ এবং স্থানীয় শিল্পকর্মে সাজানো ছিল অফিসটি। বৈঠকের ঘরে ছিল দাবার বোর্ড। শীর্ষ কর্তাদের জন্য ছিল ব্যক্তিগত রাঁধুনি ও বাটলারের ব্যবস্থা।
আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, গাড়ি রেসিং এবং বিলাসবহুল স্পোর্টস কার সংগ্রহের শখ ছিল ভাজকেজের। নিজের ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে রেসিংয়ের তুলনা করতেন তিনি। উয়েনোর ওয়েবসাইটে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমি গতি ভালোবাসি, রেসিং ভালোবাসি।” কিন্তু দ্রুত উত্থানের সেই গল্পের পরিণতি এখন জেলবন্দি ব্যাঙ্কার, বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাঙ্ক এবং রাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত প্যারাগুয়ে।