অসন্তোষকে অস্ত্র করেই ইউএস মিড-টার্মে ডেমোক্র্যাট ঝড়, ডনের হার, মুমকিন
এই সময়: ‘ও তুই উল্টা বুঝলি রাম…
আমি চড়বার ঘোড়া চাইতে শেষে, ওগো ঘোড়াই ঘাড়ে চড়ল এসে… ও বাব্বা!’
না, ১৯৩৬-এ রেকর্ডেড এই নজরুলগীতি কোনও ভাবেই জানার কথা নয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। জানলে, মিড-টার্ম ইলেকশনের মার্কশিট দেখে মনে-মনে নির্ঘাত গাইতেন! ভোটের ঠিক আগের দিন আস্তিন থেকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ বের করেছিলেন ডন। দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘ধরে নিন, সব আসনে আমিই প্রার্থী। এ ভাবেই ভোট দিন।’ ঠিক তা-ই হলো! কিন্তু ধাক্কাটা এলো ব্যুমেরাংয়ের মতো।
ইরান-যুদ্ধ থেকে শুরু করে শুল্ক-নীতি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা মাত্রাছাড়া জ্বালানির দাম ও বেকারত্বের চড়া গ্রাফ— ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জমতে থাকা যাবতীয় অসন্তোষই যেন ভোটবাক্সে উজাড় করে দিয়ে এলেন মার্কিন ভোটাররা। মুমকিন হ্যায়— ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ডনের দলকে ‘ওভারট্রাম্প’ করে বেরিয়ে গেল বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। রাজনৈতিক-মানচিত্র উল্টে রাতারাতি গোটা মার্কিন কংগ্রেসের দখল নিয়ে নিল তারা। সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস— কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা খোয়াল ট্রাম্পের দল।
ঠিক দু’বছর পরে প্রেসিডেন্ট ইলেকশন। তার আগে ডেমোক্র্যাট-ঝড়ে রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে শুধু একটা লাইন— ‘ট্রাম্প ইজ় স্টিল ইয়োর প্রেসিডেন্ট।’
বুধবার রাত পর্যন্ত (ভারতীয় সময়) খবর— ১০০ আসনের সেনেটে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে ৫৪টিতে এবং রিপাবলিকানরা ৪৪টিতে। আবার হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ২২৮টিতে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, ১৩৯টিতে রিপাবলিকানরা। বেশ কিছু আসনের রেজ়াল্ট আসা এখনও বাকি। তবে এখনই কংগ্রেসের দু’টি কক্ষে ম্যাজিক সংখ্যা পেরিয়ে গিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। যে ৪৮টি প্রদেশে গভর্নর বাছাইয়ের ভোট হয়েছিল, তাতেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ফল ২৮-২০। দলীয় প্রার্থীদের এই রেজ়াল্টে ভীষণ খুশি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশের দাবি, ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় ফলে তিনিই এক্স ফ্যাক্টর! ফল প্রকাশ্যে আসতেই সেই ওবামার বার্তা— ‘আমেরিকার মানুষ আজ একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তাঁরা বিভাজনের রাজনীতি চান না। যিনি সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবেন, এমন নেতাই চান সাধারণ মানুষ।’ পরোক্ষে ডনকে খোঁচা দিতে ছাড়েনি ইরানও। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, ‘ভোটের ফল থেকেই স্পষ্ট যে, আমেরিকার নাগরিকরা এই যুদ্ধ আর চাইছেন না। এই বার্তাকে আমরাও সমর্থন করছি।’
তাতে কী! ভাঙলেও মচকাতে নারাজ ডন। না, এ বার আর ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলেননি তিনি। বরং দলের হার কার্যত মেনেই নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার দায় নেওয়ার বান্দা তিনি নন। সব দোষ প্রেসিডেন্টেরই— ঘনিষ্ঠ মহলে হতাশা চেপে রাখতে পারছেন না রিপাবলিকানরা। অথচ ট্রাম্প দিব্যি ‘ফুরফুরে’। অপরাধবোধে ভোগার বদলে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেই দিলেন, ‘ব্যালটে আমার নাম ছিল না। থাকলে, নিশ্চিত বিপুল ভোটে জিততাম আমরা।’ অভিমানী-রসিকতাও করতে শোনা যায় তাঁকে— ‘বেশ, আমেরিকার মানুষ যখন আমাকে চাইছেন না, তখন না হয় আমি ইজরায়েলে গিয়ে ওদেরই পিএম হয়ে যাব!’
এ সব অবশ্য নেহাতই কথার কথা। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, ভোটের এই ফলাফল থেকে আসলে নিরাপদ দূরত্ব বজার রাখতে চাইছেন ডন। সঙ্গেও তিনি এ-ও প্রমাণে মরিয়া যে, দল হারলেও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। এখনও দু’বছর থাকতে হবে কুর্সিতে। সেই হিসেব মাথায় রেখেই ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়ে ট্রাম্পের বার্তা— মিলেমিশে কাজ করতে তিনি তৈরি। তবে একইসঙ্গে নিজের ‘ভেটো-পাওয়ার’ মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি ডন। লাল বেসবল-ক্যাপে বড়বড় করে লেখা ‘ভেটো’— সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনই ছবি পোস্ট করছেন ডন।
এই ভেটো-ক্ষমতা ব্য়বহার করে ট্রাম্প কিন্তু কংগ্রেসের দুই কক্ষে পাস হয়ে যাওয়ার পরেও যে কোনও সিদ্ধান্তে বেঁকে বসতে পারেন! সে ক্ষেত্রে আবার ট্রাম্পের ভেটো উড়িয়ে দেওয়ার জন্য দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন জোগাড় করতে হবে কংগ্রেসকে! এই আবহেই ওবামার বার্তা— ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে যে হেতু এখনও দু’বছর সময় রয়েছে, তাই আগামী দিনের জন্য কোমর বেঁধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে বিরোধীদের। যেখানে-যেখানে ক্ষমতা রয়েছে, সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি প্রশাসনের সম্ভাব্য ‘ক্ষতিকারক’ সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।
প্রকাশ না-করলেও ভোটের এই ভরাডুবিতে ট্রাম্পের অস্বস্তির কিন্তু বিস্তর কারণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে যাওয়ায় ট্রাম্পের অনেক পরিকল্পনাই এখন আইনি পথে আটকে দিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার এক্তিয়ারও পেয়ে গিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। যার ভিত্তিতে নানাবিধ সরকারি নথিপত্র যাচাই বা সাক্ষী-তলবও করতে পারবে তারা।
এমনকী, আরও একবার ট্রাম্পকে ইমপিচ করার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতাও পেয়ে গিয়েছে বাইডেন-ওবামার দল। খুলতে পারে এপস্টিন-ফাইলের কিছু বিস্ফোরক চ্যাপ্টারও! সব মিলিয়ে আগামী দু’বছর তাই কাঁটার মুকুট পরেই থাকতে হবে ডনকে। এখন এটাই দেখার যে, ইরান-যুদ্ধের কী হয়? ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতিতে কি রাশ টানতে পারবে মার্কিন কংগ্রেস? ভারতের সঙ্গে ‘প্রায় চূড়ান্ত’ বাণিজ্য-চুক্তিরই বা কী হবে? প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তরগুলো এখনও মিস্টার ট্রাম্পের মতোই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’।