কলকাতায় বাড়বে বন্যা ও জলসংকটের ঝুঁকি, সময় জানাল IIT
কলকাতা: বিশ্ব উষ্ণায়নের (Climate Change) প্রভাবে আগামী দিনে আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর জলচক্র। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের উপরেও। একদিকে বৃষ্টির সময় অতিভারী বর্ষণ ও ভয়াবহ জল জমার আশঙ্কা, অন্যদিকে দীর্ঘ শুষ্ক সময় এবং পানীয় জল ও সেচের জলের সংকট। IIT খড়্গপুরের একটি গবেষণায় এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ নির্গমনের মাত্রা অনুযায়ী প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
IIT খড়্গপুরের Centre of Ocean, River, Atmosphere and Land Sciences (CORAL)-এর অধ্যাপক জয়নারায়ণ কুট্টিপুরথের নেতৃত্বে এই গবেষণা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়লেই যে সব জায়গায় সমানভাবে বেশি বৃষ্টি হবে, এমন নয়। বরং কোথাও অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হতে পারে, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টির দেখা মিলবে না।
২১০০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে জলীয় বাষ্প
গবেষণায় বলা হয়েছে, মাঝারি মাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। নির্গমনের মাত্রা বেশি হলে এই বৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
এই গবেষণার শিরোনাম ‘Global changes in precipitable water vapour during 1980–2100 and its spatial, temporal, radiative and causal insights for enhanced climate warming’। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Journal of Hydrology পত্রিকায়। গবেষকরা CMIP6 জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিবর্তনের পূর্বাভাস তৈরি করেছেন।
তবে অধ্যাপক কুট্টিপুরথ জানিয়েছেন, গবেষণাটি মূলত বিশ্বব্যাপী জলীয় বাষ্পের পরিবর্তন নিয়ে। কলকাতার জন্য আলাদা কোনও শহরভিত্তিক মডেল তৈরি করা হয়নি। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যান বৃহত্তর আঞ্চলিক গবেষণার ফলাফল থেকে পাওয়া ব্যাখ্যা।
বৃষ্টি বাড়লেও কমতে পারে জলের জোগান
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প বাড়া মানেই মাটিতে জলের জোগান বাড়া নয়। বরং বৃষ্টির ধরন অনিয়মিত হয়ে উঠলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অধ্যাপক কুট্টিপুরথের কথায়, “কলকাতায় বৃষ্টি হলে তা আরও ভারী হতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি না হলে জলের সংকট আরও বাড়তে পারে।”
অর্থাৎ, অল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টির কারণে শহরে জল জমা ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অথচ অন্য সময়ে বৃষ্টির অভাব এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পানীয় জল ও ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ বাড়তে পারে। ফলে একই শহরকে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত জল এবং জলের অভাব, দুই ধরনের সমস্যার জন্যই প্রস্তুত থাকতে হতে পারে।
গবেষণায় বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি নির্গমন পরিস্থিতিতে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ৫ থেকে ১৮ মিলিমিটার এবং উচ্চ নির্গমন পরিস্থিতিতে ৭ থেকে ২৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গে বন্যা, পশ্চিমাঞ্চলে খরার আশঙ্কা
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কলকাতার জল জমার সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রেও বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু নিচু এলাকায় অতিভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বীরভূম এবং ঝাড়গ্রামে দীর্ঘ শুষ্ক সময় ও সেচের জলের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে জলসংকট আরও তীব্র হতে পারে।
বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ধান চাষ। কারণ, অতিরিক্ত বৃষ্টি যেমন ফসলের ক্ষতি করতে পারে, তেমনই দীর্ঘ সময় বৃষ্টির অভাবেও ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবন অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সমুদ্রের জলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মিষ্টি জলের সীমিত জোগান কৃষিকাজের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
অধ্যাপক কুট্টিপুরথের মতে, “ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের কৃষি কতটা সফল হবে, তা শুধু রাজ্যে মোট কতটা বৃষ্টি হল তার উপর নির্ভর করবে না। কখন বৃষ্টি হচ্ছে, কতটা তীব্র হচ্ছে এবং শুষ্ক সময়ের জন্য সেই জল কতটা ধরে রাখা যাচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
এখন থেকেই প্রয়োজন জল সংরক্ষণ ও নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গকে একই সঙ্গে বন্যা এবং জলসংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। তার জন্য শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, জলাভূমি সংরক্ষণ, বৃষ্টির জল ধরে রাখা এবং জল সংরক্ষণের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার মূল কথা, ভবিষ্যতে বেশি বৃষ্টি হলেই জলের সমস্যা মিটবে না। বরং বৃষ্টির জল কতটা কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে এবং শুষ্ক মরশুমে তা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করতে পারে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের জলনিরাপত্তা।