‘ভারত ব্যানানা রিপাবলিক নয়’, রামলীলা সমাবেশ ঘিরে রাহুলকে নিশানা নাড্ডার - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘ভারত ব্যানানা রিপাবলিক নয়’, রামলীলা সমাবেশ ঘিরে রাহুলকে নিশানা নাড্ডার

Spread the love

নয়াদিল্লি: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডি জোটের সমাবেশ ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হল। রবিবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও বিরোধী জোটকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা (JP Nadda)। তাঁর অভিযোগ, গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিরোধীরা দেশে অস্থিরতা তৈরি, অর্থনীতির ক্ষতি এবং নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। রাহুল গান্ধীকে সরাসরি আক্রমণ করে নাড্ডার মন্তব্য, “ভারত কোনও ব্যানানা রিপাবলিক নয়।”

ইন্ডি জোটের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচিকে ‘গণতন্ত্রের নামে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে কটাক্ষ করেন নাড্ডা। তাঁর দাবি, নির্বাচনে পরাজিত ও জনতার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত দলগুলি রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই ধরনের কর্মসূচি করছে। তিনি এই সমাবেশকে ‘পরিকল্পিত ও নির্বোধ নাটক’ বলেও অভিহিত করেন।

রাহুল গান্ধীর রাজনীতির ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাড্ডা চারটি ধাপের কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রথমে মিথ্যা ও গুজব ছড়ানো হয়, এরপর রাস্তায় অশান্তি উসকে দেওয়া হয়, তারপর দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তির মদতে নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলে।

নাড্ডার আরও অভিযোগ, ১ নভেম্বরের সমাবেশের পিছনে চারটি উদ্দেশ্য রয়েছে। শিখ সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাত করা, দিল্লিতে হিংসা ছড়িয়ে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা, উৎসবের মরশুমে ব্যবসায়ীদের রোজগারে প্রভাব ফেলা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাই বিরোধীদের লক্ষ্য বলে দাবি করেন তিনি।

১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ

ইন্ডি জোটের এই কর্মসূচি মূলত ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR)-এ অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজন করা হয়েছে। তবে সমাবেশের দিনক্ষণ নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার বার্ষিকীতে রাজনৈতিক সমাবেশের আয়োজন করে কংগ্রেস শিখ সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

নাড্ডা ১৯৮৪ সালের হিংসার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ওই দিন কংগ্রেসের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা নিরীহ শিখদের হত্যা করেছিল। তাঁর দাবি, হাজার হাজার শিখ পরিবার রাতারাতি ঘরছাড়া হয়েছিল এবং বহু মহিলা স্বামীহারা হয়েছিলেন। দিল্লির ‘উইডো কলোনি’ এখনও সেই ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নাড্ডার অভিযোগ, এত বছর পরেও শিখ সম্প্রদায়ের কাছে গান্ধী পরিবার আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়নি।

তিনি আরও বলেন, যে দিন দেশের শহিদ ও হিংসার শিকার মানুষদের স্মরণ করার কথা, সেই দিন রাহুল গান্ধী নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে রামলীলা ময়দানে সমাবেশ করছেন।

এই উপলক্ষে পশ্চিম দিল্লিতে আলাদা পদযাত্রার আয়োজন করেছে বিজেপি। হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এই মিছিল হওয়ার কথা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং দিল্লি বিজেপির সভাপতি-সহ দলের একাধিক নেতা এতে অংশ নেবেন বলে জানা গিয়েছে।

মুম্বইয়েও বিজেপির পাল্টা কর্মসূচি

এদিকে রবিবার মুম্বইয়ে ‘লোকশাহি বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ পদযাত্রা করে বিজেপি ও তাদের মহাযুতি শরিক দলগুলি। মহারাষ্ট্র বিজেপির সভাপতি রবীন্দ্র চভন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থা ও সংসদের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানোর অভিযোগ করেন।

তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশ যখন উন্নয়নমুখী শাসনের পথে এগোচ্ছে, তখন কংগ্রেস অকারণে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। শিবসেনার সাংসদ নরেশ মাস্কেও রাহুল গান্ধী ও তাঁর সহযোগীদের কার্যকলাপকে সংবিধানবিরোধী বলে অভিযোগ করেন।

SIR নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের মোকাবিলায় দেশজুড়ে ‘লোকতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ প্রচারও শুরু করেছে বিজেপি। দলের কর্মীরা গ্রাম ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে দলের বক্তব্য তুলে ধরবেন বলে জানানো হয়েছে।

ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ বিরোধীদের

অন্যদিকে ইন্ডি জোটের নেতাদের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা এবং ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আনতেই এই সমাবেশ। হিমাচল প্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী মুকেশ অগ্নিহোত্রী অভিযোগ করেন, তাঁর রাজ্য থেকে দিল্লিগামী সমর্থকদের বাস বিভিন্ন জায়গায় আটকে দেওয়া হচ্ছে।

তাঁর দাবি, কয়েকটি বাস দূষণ সংক্রান্ত নিয়মের অজুহাতে এবং অন্য কয়েকটি কর সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলে আটকানো হয়েছে। অথচ বাসগুলি BS-VI নির্গমন মান মেনে চলে বলে দাবি করেন তিনি। অগ্নিহোত্রী জানান, বাধার মুখে পড়লে সমর্থকদের হেঁটেই হিমাচল ভবনে পৌঁছনোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে রামলীলা ময়দানে যাওয়ার জন্যও তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন।

হিমাচল প্রদেশের মন্ত্রী বিক্রমাদিত্য সিং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহির দাবি তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকায় অনিয়মের ঘটনায় প্রভাবিত ভোটারের সংখ্যা ১৩ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ কোটিতে পৌঁছেছে। অদূর ভবিষ্যতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

উত্তরাখণ্ডের বিরোধী দলনেতা যশপাল আর্য এই সমাবেশকে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার লড়াই বলে বর্ণনা করেছেন। কংগ্রেস নেতা কুনওয়ার দানিশ আলিও কর্মসূচিকে ঐতিহাসিক বলে দাবি করে অভিযোগ করেন, সরকার ছাত্রছাত্রী, যুবসমাজ ও কৃষকদের নিশানা করছে।

ইন্ডি জোটের দাবি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের পরিবর্তে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট করাতে হবে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। রাহুল গান্ধী দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির মানুষকে কনট প্লেস থেকে মিছিল করে অথবা সরাসরি রামলীলা ময়দানে পৌঁছে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা

দুই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা ANI সূত্রে খবর, দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, CRPF এবং Rapid Action Force-সহ প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রামলীলা ময়দান, মিন্টো ব্রিজ থেকে আসার রাস্তা এবং সংলগ্ন এলাকায় ৪ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছেন। কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট এবং নির্বাচন কমিশনের দফতরের আশপাশেও ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।

সংবেদনশীল এলাকায় বড় জমায়েত নিয়ন্ত্রণে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। CCTV ক্যামেরার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং ড্রোনের সাহায্যে ভিড়ের গতিবিধির উপর নজর রাখছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি।

দিল্লি-গুরুগ্রাম সীমান্তেও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে ব্যারিকেড বসিয়ে সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন এবং বিজেপির পাল্টা কর্মসূচিকে ঘিরে রবিবার রাজধানীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *