ঝুড়িতে চেপে এসেছিলেন স্বয়ং দেবী? সাড়ে ৪০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে আজও অমলিন ‘হটনগর কালী’
মাথায় চিঁড়ের ঝুড়ি নিয়ে রোজ জঙ্গল থেকে হেঁটে ফিরতেন এক বৃদ্ধা। হঠাৎ একদিন খালের পাড়ে এক শিশুকন্যাকে দেখতে পান তিনি। তার বায়না, সেও যাবে বৃদ্ধার সঙ্গে। কিন্তু বৃদ্ধা তাকে নিয়ে যেতে চাননি। সেই কারণে ছোট্ট মেয়েটি উঠে বসে বৃদ্ধার মাথায় থাকা খালি ঝুড়িতে। ভারী হওয়া দূরে থাক, পলকে হাওয়ার মতো হালকা হয়ে যায় সেই ঝুড়ি। গন্তব্যে পৌঁছে ঝুড়ি নামাতেই চক্ষু চড়কগাছ বৃদ্ধার— মেয়েটি উধাও, পড়ে রয়েছে কেবল দু’টি পাথর। সাড়ে চারশো বছর আগের এই অলৌকিক ঘটনা আজ বাঁকুড়ার সোনামুখীর প্রাণভোমরা, যাঁর পরিচিতি ‘হটনগর কালী’ নামে।
‘কালী-কার্তিকের শহর’ সোনামুখীর পরতে পরতে ছড়িয়ে ইতিহাস। সারা বছর নিত্যপুজো চললেও দীপান্বিতা অমাবস্যা এলে গোটা শহরের চেহারা বদলে যায়। টানা পাঁচ দিন ধরে চলে হটনগর কালীর এই মহোৎসব। স্থানীয়দের বিশ্বাস, চিঁড়ে বিক্রেতা তারিণী সূত্রধর নামের সেই বৃদ্ধাকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং আদ্যাশক্তিরূপী কালী। পরে এক সিদ্ধপুরুষ এই পাথরের পুজো শুরু করেন। সেই সাধকের নাম অনুসারেই দেবীর নাম হয় হটনগর কালী।
মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখলেই এই লোকগাথা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মন্দিরের সম্পাদক দেবমাল্য হালদার জানিয়েছেন, মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অপূর্ব ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বৃদ্ধা তারিণী সূত্রধরের মাথায় ঝুড়িতে চেপে স্বয়ং মায়ের আগমনের সেই মুহূর্ত। ঠিক পাশেই ধ্যানমগ্ন সাধক হট যোগীর প্রতিমূর্তি, আর সবার শীর্ষে বিরাজ করছেন দেবাদিদেব মহাদেব। বহুদূর থেকেই চোখে পড়ে মন্দিরের চূড়ায় থাকা বিশালাকার এক সুন্দর পদ্মফুল। প্রাচীন সেই ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে আজও দেবীর পুজোর ঘট নিয়ে আসার একমাত্র অধিকার রয়েছে সূত্রধর পরিবারের হাতেই।
তবে হটনগরের আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে গর্ভগৃহের বাইরে। মায়ের নির্দেশে যে আঁকড় গাছের নীচে সেই দু’টি পাথর নামিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই গাছটি আজও অক্ষত। সাধারণ আঁকড় গাছে অজস্র কাঁটা থাকলেও এই বিশেষ গাছটিতে আশ্চর্য ভাবে কোনও কাঁটা নেই। এমনকী শত চেষ্টা করেও এই প্রাচীন গাছের আদি মূল বা শেকড়ের সন্ধান মেলেনি আজও। সেই গাছের নীচেই আজও পুজো পায় সাড়ে চারশো বছরের সেই শিলাখণ্ড দু’টি। ভক্তদের দাবি, বিভিন্ন ঋতুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাকি আজও বদলে যায় এই অলৌকিক পাথর দু’টির গায়ের রং। অলৌকিক রহস্য আর ভক্তির যুগলবন্দিতেই সোনামুখীর হটনগর কালী আজও এলাকার মানুষের পরম ভরসার ঠিকানা।