আফতাবের পথেই দুবাই থেকে ফেরানো হবে টুলুকে?
অমিত চক্রবর্তী
বিচারব্যবস্থা থেকে পুলিশ, সিবিআই, ইডি — প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ, তল্লাশি এড়িয়ে এখনও নাগালের বাইরে অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল, বিনয় মিশ্রের মতো ব্যবসায়ী–মাফিয়া থেকে এককালের বিডিও প্রশান্ত বর্মন। এঁদের কেউই ভারতে নেই। এর মধ্যে aওই হামলা ও ছ’জন পুলিশকর্মীকে খুনের পরে আফতাবও দুবাইয়ে পালিয়েছিলেন। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির ভিত্তিতে তাঁকে ফেরানো হয়। টুলুর ক্ষেত্রেও সে পথই ধরতে চাইছে সিবিআই। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টে টুলুর জামিন–মামলার শুনানিতে কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা তেমন জানান।
এ দিকে, প্রশান্ত নেপালে বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন এবং বিনয় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর নাগরিক হয়ে এখন দুবাই–লন্ডন করে বেড়াচ্ছেন! তিনজনের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে। বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী টুলু আর্থিক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, প্রশান্তর বিরুদ্ধে খুনের মামলা আর বিনয়ের বিরুদ্ধে কয়লা ও গোরু পাচার-সহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ। কী করে এঁরা পুলিশ, তদন্তকারীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছেন, তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। তা ছাড়া, এই ‘প্রভাবশালী’ অভিযুক্তদের ফেরাতেই বা এত সময় লাগছে কেন!
এ ক্ষেত্রেও আফতাবের উদাহরণ তুলে ধরছেন অভিজ্ঞদের অনেকে। ২০০১–এ খাদিম কর্তা পার্থ রায় বমর্নকে অপহরণের পরের বছর জানুয়ারিতে আমেরিকান সেন্টারে হামলা চালিয়ে পুলিশকর্মীদের খুন করেন আফতাব ও তাঁর দলবল। কিন্তু পরের মাসে তাঁকে দুবাই থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। টুলুকেও সেই বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি মেনে ফেরানো সম্ভব বলে মনে করেন ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ তথা শীর্ষ কোর্টের আইনজীবী কায়েশ বেগ।
বীরভূমে একের পর এক মামলা দায়ের হওয়ার পরেই দেশ ছাড়েন টুলু। একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের বেঞ্চ তাঁর আগাম জামিনের আর্জি খারিজও করে দেয়। কিন্তু এর পরে একাধিক বেঞ্চ তাঁর মামলার শুনানিতে বিরত থাকে! সেই সময়ে বিচারপতি অজয় মুখোপাধ্যায়ের এজলাসে মামলাগুলি অ্যাসাইন করে হাইকোর্ট। এর মধ্যে রস্টার অনুযায়ী, জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে চলে যান বিচারপতি মুখোপাধ্যায়। টুলুর বেশ ক’জন আইনজীবী সেখানে গিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ও সেখানেই দ্রুত মামলা শোনার আবেদন জানান। কোর্ট সম্মতি দিলে ৭ অক্টোবর তাঁর আইনজীবীরা কলকাতা থেকে গিয়ে জলপাইগুড়ি বেঞ্চের কাছে মক্কেলের স্বস্তির চেষ্টা চালাতে থাকেন।
সূত্রের খবর, গত বৃহস্পতিবার, ২৯ তারিখ সওয়াল চলাকালীন সেখানকারই কিছু আইনজীবী এর প্রতিবাদে সামিল হন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁদের দাবি, প্রধান বিচারপতির অনুমতি ছাড়া প্রিন্সিপাল বেঞ্চের মামলা আইনত সার্কিট বেঞ্চে শোনা যায় না। তার উপরে পুুজোর মুখে সার্কিট বেঞ্চে মামলার চাপ থাকা সত্ত্বেও কলকাতার মামলা সেখানে কী কারণে এবং কোন আইনি পদ্ধতিতে গেল, সে প্রশ্নও ওঠে। সে দিনই দুপুরের পরে শুনানি স্থগিত করে দেন বিচারপতি। পরে হাইকোর্টের বদলে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন টুলু। ৩ নভেম্বর তাঁর মামলার শুনানি।
তবে বিনয়কে ফেরানোর কাজটা কঠিন। আইনজীবীদের ব্যাখ্যা — তিনি এখন ভানুয়াতুর নাগরিক। ওই দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। যদিও ইডি–সিবিআই হাত গুটিয়ে বসে নেই। দুই তদন্তকারী সংস্থাই তাঁকে দেশে ফেরানোর অনুমতি চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছে গত অগস্টে। তৃণমূলের জমানায় দলের এক শীর্ষনেতার ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বিনয়। ফলে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে ওই নেতাই তাঁর বিদেশযাত্রার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে কানাঘুষো রয়েছে।
তিন অভিযুক্তের মধ্যে প্রশান্তর প্রোফাইল আলাদা বলে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা। সল্টলেকের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনে অভিযুক্ত প্রাক্তন বিডিও–কে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত একাধিক বার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। ঘটনার পরেই পুলিশ তাঁর অন্য সঙ্গীদের গ্রেপ্তার করলেও প্রশান্ত অধরা। প্রথমে জামিন পেলেও পরে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে গ্রেপ্তারির নির্দেশ দেয়। তা সত্ত্বেও ওই খুনের তদন্তে চার্জশিটে তাঁর নাম রাখা হয়নি বলে খবর। গত ২৫ মে আবার মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে ধাক্কা মেরে গ্রেপ্তারও হন প্রশান্ত, তার পরেও পুলিশ তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি! তাঁকে নেপাল থেকে ফেরাতে কেন্দ্র কী করছে, সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
তবে সব মিলিয়ে আইনজ্ঞ মহলের বড় অংশের বিস্ময় — কাদের এবং কতখানি প্রভাবশালীদের হাত এঁদের মাথার উপরে রয়েছে, যে আদালতের নির্দেশ নিয়ে তাঁরা কার্যত ছেলেখেলা করেন!