নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কোটি ডলার আয়, উত্তর কোরিয়ার সাইবার নেটওয়ার্কের রহস্য - 24 Ghanta Bangla News
Home

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কোটি ডলার আয়, উত্তর কোরিয়ার সাইবার নেটওয়ার্কের রহস্য

Spread the love

নয়াদিল্লি: আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক অবরোধ এবং প্রচলিত বাণিজ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার (North Korea) অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ঢুকছে। এর পিছনে রয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট এক শক্তিশালী সাইবার নেটওয়ার্ক। বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এবং প্রযুক্তি সংস্থাকে নিশানা করে কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির অভিযোগ উঠেছে এই হ্যাকার গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে। সাইবার হামলা এখন পিয়ংইয়ংয়ের কাছে শুধু প্রযুক্তিগত শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থ সংগ্রহের অন্যতম হাতিয়ার।

সম্প্রতি Binance-এ ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের কথিত সাইবার চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সন্দেহজনক ভূমিকা সামনে এসেছে। ব্লকচেন গোয়েন্দা সংস্থা TRM Labs এবং Chainalysis-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবরের এই হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার যোগসূত্র থাকা TraderTraitor গোষ্ঠীর কার্যকলাপের মিল রয়েছে। যদিও এই হামলায় তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি এখনও সন্দেহের পর্যায়ে রয়েছে।

TraderTraitor-এর নাম এর আগেও একাধিক বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় উঠে এসেছে। এই গোষ্ঠীকে Lazarus Group-সহ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সাইবার ইউনিটের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। আর্থিক প্রতারণা, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি এবং সাইবার গুপ্তচরবৃত্তিতে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

কারা এই TraderTraitor, কী বলছে FBI?

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি যৌথ সাইবার নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় মার্কিন Federal Bureau of Investigation বা FBI TraderTraitor-কে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট Advanced Persistent Threat (APT) গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের কাছে এই গোষ্ঠী Lazarus Group, APT38, BlueNoroff এবং Stardust Chollima-সহ একাধিক নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হ্যাকারদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির অভিযোগ তুলেছে FBI।

২০২৩ সালের জুনে Atomic Wallet থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনায় এই গোষ্ঠীর যোগসূত্রের কথা জানায় মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা। একই বছরের জুলাইয়ে Alphapo থেকে প্রায় ৬ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনাতেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।

২০২৩ সালের আগস্টে FBI জানিয়েছিল, একাধিক ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হ্যাকারদের হাত ধরে প্রায় ১,৫৮০ বিটকয়েন চুরি হয়েছে বলে তারা শনাক্ত করেছে।

কীভাবে কাজ করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা?

উত্তর কোরিয়ার সাইবার হ্যাকারদের কৌশল এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আগে যেখানে সরাসরি কোনও সংস্থার কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা হত, এখন সেখানে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে সংস্থার ভিতরে ঢোকার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় Social Engineering।

বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি সংস্থার এমন কর্মীদের নিশানা করা হয়, যাঁদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সফটওয়্যার ডেভেলপার, IT অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং DevOps ইঞ্জিনিয়াররা এই ধরনের হামলার অন্যতম লক্ষ্য।

হ্যাকাররা পেশাদার নেটওয়ার্কিং ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো পরিচয়ে যোগাযোগ করে। কখনও নিজেদের নিয়োগকর্তা বা রিক্রুটার হিসেবে পরিচয় দিয়ে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করতে বলা হয়। এই অ্যাপগুলি দেখতে ট্রেডিং বা বাজারদর বিশ্লেষণের সফটওয়্যারের মতো হলেও তার মধ্যে ক্ষতিকর কোড থাকতে পারে।

কোনও কর্মী সেই সফটওয়্যার ইনস্টল করলে হ্যাকারদের হাতে সংস্থার অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এরপর তারা লগইন তথ্য, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ এবং ডিজিটাল সম্পদ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করে।

বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কোনও কর্মীর অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে বৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারণামূলক ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রান্সফার অনুমোদন করানো সম্ভব হতে পারে।

চুরি করা ডিজিটাল সম্পদ এরপর একাধিক ওয়ালেট এবং ব্লকচেন নেটওয়ার্কের মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি অন্য ধরনের ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর করা হয়। এর ফলে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা এবং চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে Bybit-এ বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির তদন্তে FBI এই ধরনের কৌশলের প্রমাণ পেয়েছিল। তদন্তে দেখা যায়, চুরি করা সম্পদ হাজার হাজার ওয়ালেট ঠিকানায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেগুলিকে বিভিন্ন ব্লকচেনের মাধ্যমে অন্য ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ প্রচলিত মুদ্রায় বদলে নেওয়াই ছিল লক্ষ্য।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কেন সাইবার চুরির উপর নির্ভরতা?

উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধের উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার পিছনে রয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে রাষ্ট্রসংঘ এবং পশ্চিমী দেশগুলির একাধিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে পিয়ংইয়ং। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং প্রচলিত আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল সম্পদ চুরি, অর্থ পাচার এবং বিদেশে কর্মরত IT কর্মীদের মাধ্যমে আয় করার কৌশলকে গুরুত্ব দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া বলে অভিযোগ।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত Multilateral Sanctions Monitoring Team (MSMT)-এর একটি রিপোর্টে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, অর্থ পাচার এবং বিদেশে IT কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে পিয়ংইয়ং নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করছে। সেই অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি, বিশেষ করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে।

চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই নেটওয়ার্কে বিদেশে থাকা উত্তর কোরীয় নাগরিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সহযোগীরাও রয়েছে বলে অভিযোগ। MSMT-র রিপোর্টে চিন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশের নাম উঠে এসেছে।

কত টাকার ডিজিটাল সম্পদ চুরি করেছে উত্তর কোরিয়া?

উত্তর কোরিয়ার সাইবার হামলার আর্থিক পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। Reuters-এর ৩০ অক্টোবরের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা অন্তত ৬.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে বলে অনুমান করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি চুরির ঘটনায় এই অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সাইবার হামলার বিশেষ সুবিধা হল, প্রচলিত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে ব্লকচেন প্রযুক্তিতে প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় তদন্তকারী সংস্থাগুলি অনেক সময় অর্থের গতিপথ শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার ওয়ালেট, একাধিক ব্লকচেন এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার সেই তদন্তকে জটিল করে তোলে।

উত্তর কোরিয়ার সাইবার নেটওয়ার্ক এখন আন্তর্জাতিক আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞার চাপে প্রচলিত অর্থনৈতিক পথ সীমিত হলেও ডিজিটাল দুনিয়ায় এই হ্যাকার নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ পিয়ংইয়ংয়ের অর্থ সংগ্রহের নতুন পথ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্ত ও রিপোর্টে উঠে এসেছে।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *