স্কুলে পড়ুয়ারা কী করছে, মোবাইলে দেখছেন অভিভাবকরা
রাকিব ইকবাল, উলুবেড়িয়া: সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পরে অনেক বাবা–মায়েরই চিন্তা থাকে, ছেলে–মেয়েরা স্কুলে ঠিকমতো পড়াশোনা করছে তো? স্কুলে পড়ুয়াদের আচার আচরণ নিয়েও মাঝে মধ্যেই বিস্তর শুনতে পাওয়া যায়। স্কুলে যাওয়ার নাম করে অনেক পড়ুয়া নিরুদ্দেশও হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলেই ছাত্র–ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে। অনেক না জেনেই স্কুলের শিক্ষকদের উপরে চড়াও হন অভিভাবকরা। নিখোঁজ পড়ুয়াদের খুঁজে আনতে কালঘাম ছোটে পুলিশের।
দীর্ঘদনের এই সমস্যার মুশকিল আসান করে অনন্য নজির তৈরি করেছে হাওড়ার শ্যামপুরের রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই এই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৌরদীপ জানা। তার ফলে মোবাইল ফোনের সাহায্যে ছেলে–মেয়েরা স্কুলে কী করছে, পড়াশোনা ঠিকঠাক করছে কি না, তার উপর সর্বক্ষণ নজর রাখতে পারছেন অভিভাবকরা। রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এই উদ্যোগকে সম্প্রতি স্বীকৃতি জানিয়েছে ইন্ডিয়া বুক অব রেকর্ডস। ইন্ডিয়া বুক অব রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মিলেছে শংসাপত্র ও পদক।
শ্যামপুরের মতো হাওড়ার প্রত্যন্ত এলাকার একটি প্রাথমিক স্কুলে কীভাবে এটা বাস্তবায়িত হলো? স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৌরদীপ জানা বলেন, ‘এই সাফল্য শুধু আমার একার নয়, পড়ুয়া থেকে শুরু করে আমার সহকর্মী এবং অভিভাবকদের সহযোগিতায় এটা সম্ভব হয়েছে। তাই এই সাফল্যের ভাগীদার সবাই।’
প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেই জানা গেল, পড়ুয়াদের শিক্ষাদানের জন্য রামেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগেই আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম চালু হয়েছে। তার জন্য ক্লাসের মধ্যে প্রোজেক্টর, টিভি, এসি থেকে শুরু করে পুরো স্কুল চত্বরে সিসিটিভি বসানো হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরায় সারাক্ষণ স্কুল চত্বর এবং ক্লাসরুমে কী ঘটছে, তার ছবি উঠে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসরুমে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ অভিভাবকরা তাঁদের মোবাইলে সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন।
অভিভাবকরা ঘরে বসেই দেখতে পাচ্ছেন, ছেলে–মেয়েরা ঠিকমতো ক্লাস করছে কি না, কেউ ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে পড়ছে কি না, ক্লাসে কেউ দুষ্টুমি করছে কি না, সেটাও মোবাইলে দেখতে পাচ্ছেন অভিভাবকরা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছেলে–মেয়েরা আদৌ স্কুলে গেল কি না, সেটাও জেনে যাচ্ছেন তাঁরা। শিক্ষকরা ক্লাসে ফাঁকি দিচ্ছে কি না, সেটাও ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাচ্ছে। এতে অভিভাবকরা খুবই খুশি।
প্রধান শিক্ষকের কথায়, ‘এ ভাবে ক্লাসরুমের লাইভ ফুটেজ উন্মুক্ত করে দেওয়ার মতো সৎ সাহস ভারতের অন্য কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখাতে পেরেছে বলে আমি অন্তত কখনও শুনিনি। যেটা অন্য কেউ পারেনি, সেটা আমরা আমাদের মতো একটা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলে করে দেখিয়েছে। আমাদের এই উদ্যোগকে মান্যতা দিয়েছে ইন্ডিয়া বুক অব রেকর্ডস।’
রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন হাওড়া গ্রামীণ জেলার শিক্ষারত্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক অরুণকুমার পাত্র। তিনি বলেন, ‘ক্লাসরুমে লাইভ ক্যামেরা ফুটেজ ব্যবস্থাটা একটা অভিনব উদ্যোগ। এতে শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে সরাসরি অভিভাবকরাও যুক্ত হতে পারছেন। স্কুলে সন্তানকে পাঠিয়ে অভিভাবকরা একদিকে যেমন নিশ্চিন্ত হবেন, তেমনি শিক্ষকরাও তাঁদের কাজে বেশি করে মনোযোগী হবেন।’
অভিভাবক শান্তনু পুরকাইত বলেন, ‘স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৌরদীপ জানা এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মানোন্নয়ন ঘটিয়েছেন। এখন যে কোনও জায়গায় বসে আমরা স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ নিজেদের মোবাইল ফোনে দেখতে পাচ্ছি। ছেলে–মেয়েরা স্কুলে কোনও অন্যায় করলে সেটাও জানতে পারছি। ফলে ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে আমাদের দুঃশ্চিন্তা কমেছে।’