জমা জল, ম্যালেরিয়ার ভূত ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ - আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় - 24 Ghanta Bangla News
Home

জমা জল, ম্যালেরিয়ার ভূত ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ – আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

Spread the love

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে স্বাস্থ্যবিধি ও প্রশাসনিক পরিকল্পনার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশাসনিক নানা পরিকল্পনা ও নগরোন্নয়ন প্রকল্পের পরেও কলকাতার মতো শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের স্থানিক বিভাজনের চর্চা ছিল। এক দিকে শহরের আধুনিকীকরণের নামে নানা কাঠামোগত পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এই পরিকল্পনাগুলি মূলত গড়ে উঠেছিল শাসক ও শাসিতের মধ্যে এক গভীর বিভাজন রচনার ভিত্তিতে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘টেক্সট অফ পাওয়ার’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, কী ভাবে ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ নাটকটির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শহর কলকাতার পরিকল্পনা এবং তার স্থাপত্য রূপ আসলে একটি রাজনৈতিক ভাষ্য রচনা করে। শহরটি ভাগ করা হয় ‘হোয়াইট টাউন’ ও ‘ব্ল্যাক টাউন’-এ, যেখানে এক দিকে ইউরোপীয়দের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়, অন্য দিকে ভারতীয়দের জন্য বরাদ্দ থাকে অব্যবস্থাপনার গলি। স্বাস্থ্য-পরিকল্পনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার যাবতীয় প্রচেষ্টা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল শ্বেতাঙ্গ পাড়াগুলিতে। ফলে কলকাতা শহর যতই পরিকল্পিত হোক, গ্রামীণ বাংলা ততটাই উপেক্ষিত থেকে যেত ঔপনিবেশিক প্রশাসনের দৃষ্টিতে।

তবে, এই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কিছু বাংলা গল্প আমাদের এক অন্য বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেমন, ‘ভুলোর ছলনা’ গল্পে আমরা দেখি, কী ভাবে প্রতি বছর বর্ষার পরে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে গেলে গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন। রাষ্ট্র যখন নেই, তখন মানুষ নিজেরাই তুলে নেয় স্বাস্থ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব। এ এক ধরনের নীরব প্রতিবাদও বটে, যেখানে গ্রামবাংলা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সচেষ্ট।

তবু, এত পরিকল্পনা ও প্রকল্পের পরেও ম্যালেরিয়া এক জেলার মধ্যে আটকে থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে বৃহৎ অঞ্চলে, প্রাণ নিয়েছে হাজার হাজার মানুষের। আজ, এত বছর পরেও আমাদের শহর, বিশেষ করে কলকাতা, একই চক্রে আবর্তিত হচ্ছে— একটু বৃষ্টি মানেই জল জমে, নর্দমা উপচে পড়ে, বাড়ে রোগের সংক্রমণ। কর্পোরেশনকে আজও ছুটতে হয় বাড়ি-বাড়ি, জ্বরের খোঁজে।

ইতিহাসবিদ প্রজিতবিহারী মুখোপাধ্যায় এক বার লিখেছিলেন— ভূতের গল্প আসলে একটি ‘কালচারাল মেমোরি’ বা সাংস্কৃতিক স্মৃতি। ‘রাতের অতিথি’ তেমনই এক দলিল, যেখানে আতিথেয়তার ছদ্মবেশে হাজির হয় রোগ, মৃত্যু আর উপনিবেশিক ব্যর্থতার ইতিহাস। প্রজিতবিহারী বলেন যে, আতিথেয়তার কথায় মনে পড়ে, সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য এক বার বলেছিলেন, তিনি এমন একটি ভূতের গল্প শুনেছেন, যেখানে এক স্ত্রী-ভূত তার স্বামীকে লেবু দিতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে গাছ পর্যন্ত। সেই ভূতের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে বাঙালির প্রথাগত আতিথেয়তা। যেখানে শরৎচন্দ্রের ‘পল্লী-সমাজ’ বা ‘শ্রীকান্ত’র মতো উপন্যাসে গ্রামীণ বাংলার সামাজিক স্বাস্থ্যসঙ্কট তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে হেমেন রায় বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূতের গল্পগুলি এমন ‘অল্টারনেটিভ ডিসকোর্স’কে স্পর্শ করে, যা হয়তো কখনও পাঠ্যপুস্তকে আসেনি। আজ যখন আমরা উন্নয়নের দৌড়ে প্রকৃতিকে ভুলি, যখন শহরে জল জমে, মশা বাড়ে, রোগ ছড়ায়, তখন আবার ফিরে দেখা দরকার এই সব গল্প। কারণ ভূতের গল্প যে শুধু ভূতের গল্প নয়, তা ‘রাতের অতিথি’ পড়লেই বোঝা যায়। এই সব গল্পে লেখা থাকে ইতিহাস, ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা— ‘জল বেরোবে তো?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *