কলকাতা পুরভোটে ২০৯ ওয়ার্ড নিয়ে বিতর্ক, সরব বিরোধীরা
কলকাতা: কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন (Ward Delimitation) নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হল। মঙ্গলবার আলিপুরে আয়োজিত সর্বদলীয় বৈঠকে আটটি রাজনৈতিক দলের হাতে কলকাতা পুরভোটের খসড়া ভোটার তালিকার হার্ড কপি তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বৈঠকেই ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, সংরক্ষণ এবং ভোটার সংখ্যার তথ্য নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা। বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং মমতা তৃণমূলের অভিযোগ, তাঁদের আপত্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট উদ্বেগের নিষ্পত্তি না করেই পুরভোটের দিকে এগোতে চাইছে প্রশাসন।
১৪৪ থেকে বেড়ে ওয়ার্ডের সংখ্যা ২০৯, চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন
সিপিএমের কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুব্রত দত্তের দাবি, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের কাজের পরও নতুন সীমানা নিয়ে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি রাজ্য। ডিলিমিটেশনের ফলে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০৯ হয়েছে।
দত্ত জানান, কলকাতা পুরসভায় শুনানির সময় তাঁরা একাধিক ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আপত্তিগুলির পরিণতি কী হয়েছে, তা তাঁদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। বিরোধীদের বক্তব্য, ওয়ার্ডের সীমানা বদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও সংশয় তৈরি না হয়।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ডিলিমিটেশন এবং ওয়ার্ড সংরক্ষণের প্রক্রিয়া যথাযথ যাচাই ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আপত্তি ও তথ্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার ছিল।
ভোটারের মোট সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তৃণমূলের
সর্বদলীয় বৈঠকে ভোটারের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মমতা তৃণমূলের দক্ষিণ কলকাতা জেলা সভাপতি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, বৈঠকে মোট ভোটারের সংখ্যা জানতে চাওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ তা জানাতে পারেনি। এমনকি ২০২১ সালের কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যাও তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিজেপির তরফে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের কলকাতা পুরভোট সংক্রান্ত কমিটির সদস্য তথা বিধায়ক ঋত্বিক তিওয়ারি। ডিলিমিটেশন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে তাঁরা কোনও মন্তব্য করবেন না।
সূত্রের খবর, বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আটটি রাজনৈতিক দলকে। সেগুলি হল বিজেপি, সিপিএম, ফরওয়ার্ড ব্লক, কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, বহুজন সমাজ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এবং আম আদমি পার্টি।
১২ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা
রাজ্য নির্বাচন কমিশনার কৃষ্ণ গুপ্ত মঙ্গলবার জানান, খসড়া ভোটার তালিকা সোমবার প্রকাশ করা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ১২ নভেম্বর।
এক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হলে এবং সম্ভাব্যভাবে ২ নভেম্বর ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হলে ৩০ নভেম্বরের আগেই নির্বাচন সম্পন্ন করার মতো সময়সূচি তৈরি হতে পারে। তবে ভোটের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী সূচি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতে হবে।
নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, ভোটের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয় বলে এক আধিকারিক জানিয়েছেন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ভোটার তালিকা চূড়ান্তভাবে স্থির করা হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সেই তালিকা দিতে হয়।
ওই আধিকারিকের ব্যাখ্যা, পুরভোটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য সাত দিন সময় থাকে। এরপর এক দিন মনোনয়নপত্র যাচাই এবং আরও দু’দিন মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য বরাদ্দ থাকে।
ওয়ার্ডের সীমানা বদল নিয়ে হাইকোর্টে মামলা
এদিকে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টেও মামলা দায়ের হয়েছে। এক ভোটার বিচারপতি আর্যক দত্তের বেঞ্চে আবেদন জানিয়েছেন বলে খবর।
ফলে কলকাতা পুরভোটের আগে একদিকে ভোটার তালিকা প্রকাশ ও নির্বাচনী সূচি নিয়ে প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি এবং আইনি চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের উপরই এখন নজর থাকবে।