অর্ণব: আজ ল্যান্ডফল, ভুগতে হবে বাংলাকেও, সঙ্গী মৌসুমি অক্ষরেখা
এই সময়: সকালের ঝলমলে রোদ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ম্লান হতে শুরু করেছিল। তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ভ্যাপসা গরমের একটা অনুভূতি। আবহবিদদের কাছে এই লক্ষণ খুবই পরিচিত। কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের আকাশে ক্রমশ জলীয় বাষ্পে পরিপূর্ণ মেঘ জায়গা করে নিতে শুরু করার জন্যই আবহাওয়ার এমন হঠাৎ পরিবর্তন। আরও কিছুটা সময় গড়ানোর পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে উপকূলবর্তী এলাকায় শুরু হয়ে গিয়েছিল জোরালো হাওয়া এবং বৃষ্টি। তবে, কলকাতা থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব উপকূল–সংলগ্ন এলাকায় তখন প্রকৃত অর্থেই তাণ্ডব চলছে। আর রাতের দিকে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের উপকূলে বৃষ্টি শুরু হয়।
বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়েছে ‘অর্ণব’। একই সঙ্গে দক্ষিণ–পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে শ্রীলঙ্কার উপর দিয়ে একটি মৌসুমি অক্ষরেখা সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র (আই) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে ‘অর্ণব’ বাড়তি শক্তি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। মৌসম ভবনের বুলেটিন অনুযায়ী মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড়টি ‘তীব্র ঘূর্ণিঝড়’ থেকে শক্তি বাড়িয়ে ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়। তার পর থেকে পরবর্তী আট ঘণ্টা ধরে ঘণ্টায় প্রায় ২২ কিলোমিটার বেগে সেটি পশ্চিম দিকে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল বরাবর এগিয়েছে। এর পরে গতি কিছুটা কমে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার এবং আরও কমে ১৮ কিলোমিটার হয়। মঙ্গলবার সন্ধের মধ্যেই সেটি অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার এবং কাকিনাড়া থেকে ১৪০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, আজ বুধবার, বেলা বাড়ার আগেই বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূলে, ইয়ানাম সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি কোনও জায়গায় ল্যান্ডফল হবে ‘অর্ণবের’। স্থলভাগে ঝড়ের কেন্দ্রটি (আই অফ দ্য স্টর্ম) প্রবেশের সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতি ঘণ্টায় একটানা ১২৫–১৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আবহাওয়াবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই গতিকে ‘সাস্টেনেবল স্পিড’ বলা হয়। ঘূর্ণিঝড়ে দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারে। আবহবিদরা একে ‘গাস্টিং স্পিড’ বলে উল্লেখ করেন। অন্ধ্রপ্রদেশ এবং ওডিশা ছাড়াও তেলঙ্গানা, ছত্তিসগড় ও পুদুচেরিতে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নজরে অর্ণবের ‘দ্রুত গতি’
ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ শুধু তার সর্বোচ্চ বাতাসের বেগে সীমাবদ্ধ থাকে না। কত দ্রুত সেটি উপকূলের দিকে এগোচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্ণবের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২ কিলোমিটার। এই গতিতে ঝড়টি এগোলে উপকূলের বাসিন্দা, প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী দলগুলির প্রস্তুতির সময় কমে আসবে। আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ সরানো, মৎস্যজীবীদের নিরাপদে ফেরানো, বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বিপজ্জনক এলাকায় যাতায়াত বন্ধ করার মতো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে ফেলতে হবে।
এটা যেমন একটা সমস্যা, তেমনই রয়েছে আবহাওয়াগত কিছু ইতিবাচক দিকও। পুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি (আইআইটিএম)–এর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ঝড়ের তীব্রতা নির্ভর করে সমুদ্রের তাপ, বাতাসের আর্দ্রতা, সমুদ্র থেকে পাওয়া জলীয় বাষ্প, বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বাতাসের গতির পার্থক্য এবং ঝড়ের অভ্যন্তরীণ গঠনের উপরে। ঝড়ের গতি যত দ্রুত হয়, ওয়েদার সিস্টেমটির সমুদ্র থেকে জলীয় বাষ্প সংগ্রহের সময় তত কমে যায়। ফলে ল্যান্ডফলের পর তার দ্রুত শক্তিক্ষয় হয়। যদিও ঝড়ের সঙ্গে যুক্ত প্রবল হাওয়া, অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত, সমুদ্রের জল ফুলে ওঠা এবং স্থানীয় জলনিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এই কারণেই মৌসম ভবন প্রতি মুহূর্তে ‘অর্ণবের’ অগ্রসর হওয়ার গতির উপর নজর রাখছেন।
উষ্ণ সমুদ্রেই শক্তির রসদ
অর্ণবের জন্ম ও শক্তিবৃদ্ধির নেপথ্য বিষয়টি অবশ্য বিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জলভাগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সমুদ্রের উপরিতলের প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ জল থেকে বাষ্প উঠে বাতাসকে ক্রমাগত আর্দ্রতা জোগাচ্ছে। সেই আর্দ্র বাতাস উপরে উঠে ঠান্ডা হচ্ছে এবং জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে চলেছে।
ল্যান্ডফলের পরে উপকূল অতিক্রম করলে ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগ থেকে আর্দ্রতার জোগান পাবে না। ফলে ল্যান্ডফলের কিছুক্ষণের মধ্যেই সে শক্তি খোয়াতে শুরু করবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের উত্তর–পশ্চিম দিক থেকে ঢুকতে থাকা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং বাতাসের প্রবাহ ঘূর্ণিঝড়ের অবশিষ্টাংশকে বহুদূর পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ পর্যন্ত এই ঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলায় প্রভাব কেমন
মঙ্গলবার রাত আটটা নাগাদ কলকাতায় বৃষ্টি শুরু হয়। আলিপুর হাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ, বুধবার কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই বহু জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার দু’-একটি জায়গায় ভারী বৃষ্টি (৭–১১ সেন্টিমিটার) হতে পারে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরের দু’-একটি জায়গায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঘণ্টায় ৪০–৫০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া দিতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৩০–৪০ কিলোমিটার গতিবেগে হাওয়া দিতে পারে।
আগামী কাল, বৃহস্পতিবার পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম বর্ধমানে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলির বহু জায়গাতেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরের দু’-একটি জায়গায় ঘণ্টায় ৪০–৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলির দু’-একটি জায়গায় ঘণ্টায় ৩০–৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। সঙ্গে বজ্রবিদ্যুতেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার, উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলাতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ভারী বৃষ্টি (৭–১১ সেন্টিমিটার) হতে পারে। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলাতেই ঘণ্টায় ৩০–৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
শুক্রবারও উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা খুব বেশি। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ার জেলায় বিক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঘণ্টায় ৩০–৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।