Economic Mobility in India: আপনি যে পরিবারে জন্মেছেন, তা আপনার ভবিষ্যৎ কতটা নির্ধারণ করে? | How much does the family you’re born into decide your future?
প্রতিভা কি সমান সুযোগে নিজের গণ্ডি পেরোতে পারে?
Image Credit: TV9 Bangla
বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছেলে এবং বেঙ্গালুরুর শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা আরেকটি ছেলেকে প্রায়ই তাঁদের অভিভাবক বা শুভাকাঙ্ক্ষী বড়রা বলেন, কঠোর পরিশ্রমই সব বাধা অতিক্রম করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রতিভা ও পরিশ্রমই ঠিক করে দেয়, জীবনে কে কোথায় পৌঁছবে। দু’জন ছেলেই হয়তো সমান পরিশ্রম করে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁদের সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় পৌঁছনোর সম্ভাবনা যে সমান নয়, তা স্পষ্ট। আর এই বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান যা বলছে, তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সাফল্য অর্জনের প্রচলিত ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং উদ্বেগজনক।
অর্থনীতিবিদরা প্রজন্মান্তরে আর্থিক অবস্থানের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন। অর্থাৎ, একজন সন্তানের আর্থিক অবস্থান তাঁর বাবা-মায়ের আর্থিক অবস্থানের উপর কতটা নির্ভরশীল, তা তাঁরা খতিয়ে দেখেন। এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারতে দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ধনীতম ২০ শতাংশের তালিকায় পৌঁছতে পারে। অন্যদিকে, দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে জন্ম নেওয়া ৫২ শতাংশ সন্তান বড় হয়েও সেই একই আর্থিক স্তরে থেকে যায়। অর্থাৎ, জন্মের সময় যে আর্থিক শ্রেণিতে তাদের অবস্থান ছিল, সেখান থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারে না। অন্য প্রান্তে, ধনীতম ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে জন্ম নেওয়া ৫৪ শতাংশ সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও সেই ধনী শ্রেণিতেই থেকে যায়। অন্য কথায়, একজন মানুষের জন্মপরিচয় তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন অনেক কিছু আগাম ইঙ্গিত দেয়, যা স্বীকার করতে অধিকাংশ মানুষই অস্বস্তি বোধ করেন।
জন্ম কতটা নির্ধারণ করে আর্থিক সুযোগের সম্ভাবনা?
এই বিষয়টি পরিমাপ করার জন্য অর্থনীতিবিদরা একটি বিশেষ মাপকাঠি ব্যবহার করেন, যার নাম ‘ইন্টারজেনারেশনাল ওয়েজ ইলাস্টিসিটি’। সহজভাবে বললে, এই মাপকাঠি বোঝায়, একজন বাবার আয় তাঁর ছেলের আয়কে কতটা প্রভাবিত করে। এই সূচকের মান শূন্য হলে ধরে নেওয়া হয়, জন্মপরিচয় ভবিষ্যৎ আয়ের উপর কোনও প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ, প্রত্যেকের জন্য সুযোগ সমান। অন্যদিকে, সূচকের মান এক হলে বোঝায়, জন্মপরিচয়ই প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভবিষ্যৎ আয় নির্ধারণ করে, আর্থিক অবস্থানের পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না বললেই চলে।
ভারতে এই সূচকের মান তফসিলি জাতি (SC) ও তফসিলি উপজাতি (ST)-র অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন পরিবারগুলির ক্ষেত্রে প্রায় ০.৬১। তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই মান প্রায় ০.৫৫। তুলনায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই মান প্রায় ০.৪, চিনে প্রায় ০.৫ এবং প্রধানত ধনী দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত OECD-র গড় প্রায় ০.৩৮।
এই মাপকাঠি অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের সুযোগের ক্ষেত্রে ভারত শুধু ধনী দেশগুলির তুলনায় নয়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রসঙ্গে যে চিনের সঙ্গে ভারতের প্রায়শই তুলনা করা হয়, সেই চিনের তুলনায়ও পিছিয়ে রয়েছে।
পেশাগত অবস্থানের ছবিটিও একই রকম স্তরভিত্তিক। ১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা গিয়েছে, যাঁদের বাবারা হোয়াইট-কলার বা অফিসভিত্তিক পেশায় কর্মরত ছিলেন, তাঁদের প্রায় ৩৯.৩ শতাংশ ছেলেও একই ধরনের পেশায় যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, অদক্ষ শ্রমিকদের পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেদের মাত্র ৪.৯ শতাংশ হোয়াইট-কলার চাকরি পেয়েছেন। কৃষক পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৬.৪ শতাংশ।
এদিকে, অদক্ষ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ৫৮.৫ শতাংশ সন্তান নিজেরাও অদক্ষ শ্রমের পেশাতেই থেকে গিয়েছেন। এই প্রবণতাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পছন্দের ফল বলা কঠিন। বরং মনে হয়, একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নীরবে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
ভৌগোলিক অবস্থান এই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া গ্রামীণ ছেলেদের মাত্র প্রায় ১০.৫ শতাংশ কেরানি বা অনুরূপ পেশায় যাওয়ার সুযোগ পান। অথচ প্রায় একই রকম প্রাথমিক আর্থিক পরিস্থিতিতে থাকা শহরের ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ২৬.৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, একজন মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ পাওয়ার আগেই তাঁর এলাকার ঠিকানা অনেকটা নির্ধারণ করে দিতে শুরু করে, ভবিষ্যতে তিনি কতটা এগোতে পারবেন।
অসম সূচনাটা বাস্তব জীবনে আদতে কেমন?
দু’জন নির্দিষ্ট তরুণের কথা ভাবুন। একজন এমন একটি শহরে বড় হচ্ছে, যেখানে ভালো স্কুল রয়েছে, কাছাকাছি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁর পরিবারের আত্মীয়স্বজনের অনেকেই অফিসে কাজ করেন। ফলে চাকরির ইন্টারভিউ কীভাবে দিতে হয়, কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে তিনি ছোটবেলা থেকেই ধারণা পান। পাশাপাশি, তাঁর আশপাশে এমন একটি কর্মসংস্থানের বাজার রয়েছে, যেখানে যাতায়াতের যুক্তিসংগত দূরত্বের মধ্যেই অফিসভিত্তিক চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়।
অন্য তরুণটি বড় হচ্ছে এমন একটি গ্রামে, যেখানে কার্যকর মাধ্যমিক স্কুলে পৌঁছতে এক ঘণ্টা সময় লাগে। তাঁর পরিবারের বিস্তৃত আত্মীয়বর্গের মধ্যে কেউ কোনও দিন অফিসে চাকরি করেননি। স্থানীয় অর্থনীতিতে কৃষিকাজ বা অদক্ষ শ্রম ছাড়া অন্য কাজের সুযোগও প্রায় নেই বললেই চলে।
এই দুই তরুণের কেউই নিজের বেড়ে ওঠার পরিবেশ বেছে নেয়নি। দু’জনেই হয়তো সমান নিষ্ঠা ও সংকল্প নিয়ে পরিশ্রম করছে। কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব পথ দু’জনের জন্য একেবারেই এক নয়। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যতই থাকুক, শুধু সেই প্রচেষ্টার জোরে এই ব্যবধান পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয় না।
এর অর্থ এই নয় যে কঠোর পরিশ্রম বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোনও মূল্য নেই। বরং মানুষের হাতে যে ধরনের সুযোগ রয়েছে, তার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিশ্রম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, প্রত্যেকের জীবনের শুরুর পরিস্থিতি এক নয়। আর সেই কারণেই গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষানবিশির সুযোগ, কর্মসংস্থানের জন্য অন্যত্র যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা এবং শহর ও গ্রামের পরিকাঠামোগত ব্যবধান কমানোর মতো নীতিগুলি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসন সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য রয়েছে। ভারতে অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের মাত্র প্রায় ১৪.৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা বিশেষভাবে কাজের সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়েছেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম, মাত্র ২ শতাংশ। অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়া বহু দেশের পরিবারগুলিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ভারতে এই পথ এখনও তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষই বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই প্রবণতা অত্যন্ত কম।
প্রতিভা কি সমান সুযোগে নিজের গণ্ডি পেরোতে পারে?
এই লেখা পড়ছেন যে নাগরিক, তাঁর কাছে ভেবে দেখার মতো প্রশ্নটি হল, প্রতিভা ও পরিশ্রমের গুরুত্ব রয়েছে কি না, তা নয়। নিঃসন্দেহে রয়েছে। বরং আসল প্রশ্ন হল, প্রতিভাকে তার প্রাপ্য উচ্চতায় পৌঁছতে সাহায্য করার মতো পরিকাঠামো ও সুযোগ কি দেশ গড়ে তুলতে পেরেছে?
একজন মানুষ যে পরিবারে, যে গ্রামে বা যে আর্থিক শ্রেণিতে জন্মেছেন, তা যেন তাঁর ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে না দেয়। তাঁর যোগ্যতা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে যত দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তাঁর প্রাপ্য, সেই সুযোগ কি আমরা নিশ্চিত করতে পারছি?
সূত্র: ভারতে প্রজন্মান্তরে আর্থিক অবস্থানের পরিবর্তন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ইন্টারজেনারেশনাল ওয়েজ ইলাস্টিসিটির তুলনা এবং জন্মের বছর অনুযায়ী পেশাগত অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে গবেষণা; ভারতে সামাজিক গতিশীলতার নির্ধারক বিষয়গুলি নিয়ে অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ; অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রবণতা ও অভিবাসনের কারণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য সংক্রান্ত গবেষণা।