জাপানের কাছে চিন-রাশিয়ার ৫ গোয়েন্দা বিমান, পাল্টা যুদ্ধবিমান ওড়াল টোকিও
টোকিও: জাপানের আশপাশে চিন ও রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা বিমানের তৎপরতা বাড়ায় সতর্কতা জারি করেছে জাপান। ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর, টানা চার দিনে জাপানের কাছাকাছি এলাকায় চিনের তিনটি Y-9 এবং রাশিয়ার দুটি Il-20 গোয়েন্দা বিমান মোট পাঁচটি উড়ান চালায় বলে জানিয়েছে জাপানের জয়েন্ট স্টাফ। এর জেরে জাপান এয়ার সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্স (JASDF) পাল্টা যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠায়। তবে এই উড়ানগুলির কোনওটিই জাপানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেনি বলে সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এই তৎপরতা এমন সময়ে দেখা গেল, যখন জাপান ও আমেরিকা যৌথভাবে ‘কিন সোর্ড ২০২৭’ সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। ১৯ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই মহড়ায় জাপানের প্রায় ৪৫ হাজার সেনা, ২৬০টি বিমান এবং ৪০টি জাহাজ অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে যৌথ সামরিক মহড়ার সময়ে চিন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা বিমানগুলির উড়ান আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ওকিনাওয়া ও মিয়াকো দ্বীপের কাছে চিনা বিমানের উড়ান
জাপানের জয়েন্ট স্টাফের তথ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর চিনের একটি Y-9 টহল বিমান পূর্ব চিন সাগর থেকে ওকিনাওয়ার প্রধান দ্বীপ এবং মিয়াকো-জিমার মধ্যবর্তী জলপথ পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে যায়। এরপর বিমানটি আমামি ওশিমার কাছাকাছি জলসীমার দিকে এগিয়ে ফিরে আসে।
একই দিনে চিনের আরও একটি Y-9 গোয়েন্দা বিমান নাগাসাকি প্রিফেকচারের দানজো দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের জলসীমা থেকে ওকিনাওয়ার উত্তর-পশ্চিমের একটি অঞ্চলের মধ্যে পূর্ব চিন সাগরের উপর যাতায়াত করে। পরের দিন, ২১ অক্টোবর, আরেকটি চিনা Y-9 একই ধরনের পথে ওকিনাওয়া-মিয়াকো জলপথ অতিক্রম করে।
Y-9 একটি চার ইঞ্জিনের সামরিক বিমান। এর বিভিন্ন সংস্করণ সামুদ্রিক টহল, নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হয়। জাপানের কাছাকাছি এই উড়ানগুলির জবাবে JASDF-এর যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
জাপান সাগরের উপর দিয়ে রুশ Il-20 বিমানের উড়ান
২২ ও ২৩ অক্টোবর রাশিয়ার দুটি Il-20 গোয়েন্দা বিমান জাপান সাগরের উপর দিয়ে উড়ে জাপানের মূল ভূখণ্ডের পশ্চিম উপকূলে শিমানে প্রিফেকচারের কাছাকাছি জলসীমার দিকে এগিয়ে যায়। এরপর বিমানগুলি ফিরে যায়। দুই দিনই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানের যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠানো হয়।
Il-20 মূলত ইলেকট্রনিক ও সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত একটি টার্বোপ্রপ বিমান। সামরিক যোগাযোগ, রাডার এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক সংকেত পর্যবেক্ষণের কাজে এই ধরনের বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট উড়ানগুলির মাধ্যমে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

আমেরিকা-জাপানের ‘কিন সোর্ড ২০২৭’ মহড়ার মধ্যেই তৎপরতা
জাপান ও আমেরিকার যৌথ সামরিক মহড়া ‘কিন সোর্ড ২০২৭’ ১৯ অক্টোবর শুরু হয়েছে এবং ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। এই মহড়ায় জাপানের প্রায় ৪৫ হাজার সেনা, ২৬০টি বিমান এবং ৪০টি জাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহৎ এই সামরিক মহড়ার সময় চিন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা বিমানগুলির উড়ান আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতার দিকে নজর বাড়িয়েছে। তবে শুধু সময়ের মিল থেকে এই উড়ানগুলি মহড়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই পরিচালিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
জাপানের যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘটনা থেকে বোঝা যায়, দেশটি তার আশপাশের আকাশসীমা ও সামরিক গতিবিধির উপর নজর রাখছে। তবে জাপানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট উড়ানগুলির সময় কোনও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের কাছে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া
জাপানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কেও সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে। সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে রাশিয়া জাপানের দাবি করা কুরিল দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া চালায়। ওই মহড়ায় রাশিয়ার Bastion উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে P-800 ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে অন্তত ৩০০ কিলোমিটার দূরের কাল্পনিক শত্রু নৌ-লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার অনুশীলন করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওই অঞ্চলে সফরের পর এই মহড়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মস্কো ও টোকিওর দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এই সামরিক কার্যকলাপ নতুন করে নজর কেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওকিনাওয়া ও তাইওয়ান প্রণালীর কাছাকাছি চিনা Y-9 গোয়েন্দা বিমানের উড়ানের সময়ও জাপান F-15 যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। তবে এই ঘটনার নির্দিষ্ট তারিখ এবং আগস্টের রুশ ক্ষেপণাস্ত্র মহড়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাড়তি নজর
জাপানের আশপাশে চিন ও রাশিয়ার সামরিক বিমান চলাচল এবং আমেরিকা-জাপানের যৌথ মহড়া, সব মিলিয়ে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে। গোয়েন্দা বিমানগুলি সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, কোনও নির্দিষ্ট উড়ানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি বিবৃতি ও অন্যান্য যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন।
বর্তমান ঘটনাগুলিতে জাপান যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে নজরদারি জোরদার করেছে, কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী কোনও আকাশসীমা লঙ্ঘন ঘটেনি। তাই এই উড়ানগুলিকে সামরিক নজরদারি ও আঞ্চলিক তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা গেলেও, সরাসরি সংঘাতের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।