ভক্তিই আসল, জাত-লিঙ্গের ভেদাভেদ, পুরোহিততন্ত্র ভেঙে অন্য রকম দুর্গাপুজো দেবী-লিলিদের - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভক্তিই আসল, জাত-লিঙ্গের ভেদাভেদ, পুরোহিততন্ত্র ভেঙে অন্য রকম দুর্গাপুজো দেবী-লিলিদের

Spread the love

বাঙালির দুর্গাপুজো মানে কি শুধুই দেবীর আরাধনা, নতুন পোশাক, অঞ্জলি আর বিসর্জনের বিষাদ? নাকি এই উৎসবের অলিন্দে লুকিয়ে থাকে নারীর নিজস্ব এক পৃথিবী? রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে নারীর আত্মান্বেষণ, শরৎচন্দ্রের দৃঢ়চেতা নারীচরিত্র থেকে আশাপূর্ণা দেবীর ঘরোয়া জীবনের অন্তঃসলিলা প্রতিবাদ — বাংলা সাহিত্য বার বার চিনিয়েছে নারীর বহুমাত্রিক সত্তাকে। দুর্গাপুজোও সেই নারীশক্তিরই বন্দনা। কখনও তিনি উমা, কখনও ঘরের মেয়ে, কখনও সংসারের নীরব চালিকাশক্তি, আবার কখনও নিজের শর্তে বাঁচতে চাওয়া এক স্বতন্ত্র মানুষ। উৎসবের আলোয় তাঁর হাসি, ক্লান্তি, দায়িত্ব, বন্ধুত্ব, প্রেম আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা — সব মিলিয়েই তৈরি হয় মহিলাদের দুর্গাপুজোর নিজস্ব আখ্যান। সেটাই যেন আরও একবার দেখিয়ে দিলেন দেবী সাহা, লিলি বিশ্বাসরা। একদম আনকোরা নবীশ থেকে মাত্র এক মাসের ট্রেনিংয়ে দুর্গাপুজো করা, সেটা কি সহজ কথা? আজ, লক্ষ্ণীপুজোর দিন, দেবীপক্ষের শেষ দিনে রইল অ্যাঙ্কর, প্রাক্তন আরজে ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার দেবী সাহার সেই দুর্গাপুজোর গল্প।

প্রতি বছর শরৎ আকাশ মেঘমুক্ত হতেই ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হয় বাংলার মাটি। পঞ্জিকার নিয়ম মেনে মহালয়া থেকে দশমী — এই ক’টা দিন যেন এক অন্য ভুবন। কিন্তু এই প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়েও তো একটা অন্য জগৎ তৈরি করা যায়, যেখানে আচার সর্বস্বতার চেয়ে মনের ভক্তি আর মানুষের অংশগ্রহণই বড় হয়ে ওঠে। রেডিয়ো মির্চিতে কাজ করার সময়ে ড. নন্দিনী ভৌমিককে নিজের মনের ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন দেবী। মনে মনে তাঁর ইচ্ছে ছিল প্রথাগত গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে নিজের মতো করে মায়ের পুজো করার। কে বলে সব নিয়ম কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বাঁধা থাকবে?

দেবীর কাছে সুযোগটা আসে হঠাৎ করেই। আবাসনের পুজোর স্থানকে কেন্দ্র করে একটা সমস্যা হওয়ায় তা একপ্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়, দাবি দেবীর। সেই খবর পেয়েই আসরে নামেন তিনি, পুজোর ভার একার কাঁধে তুলে নেন। দেবীর মতে, ঈশ্বর কখনও লিঙ্গ বা জাত দেখে বিচার করেন না। মন্ত্র উচ্চারণে ভুলত্রুটি কিংবা পৌরহিত্যের একচ্ছত্র অধিকারে তাঁর তীব্র অনীহা ছিল। তাই প্রথাসিদ্ধ ধারার বাইরে কোনও এক মহিলা পুরোহিতের কাছে পুজো করা শিখতে চাইলেন দেবী।

আর এই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় নন্দিনী ভৌমিক ও লিলি বিশ্বাসদের ‘শুভমস্তু’ দল। নাটকের খসড়ার মতো নিখুঁত নির্দেশিকা আর লিপিবদ্ধ পাণ্ডুলিপি নিয়ে শুরু হয় দেবীর এক মাসের কঠিন প্রস্তুতি। কী ভাবে কুশ হাতে নিয়ে আচমন করতে হবে, কী ভাবে ঘণ্টা বাজাতে হবে কিংবা কোন মন্ত্রের কী অর্থ — তার প্রতিটি পাঠ লিলি বিশ্বাসের কাছ থেকে টিউটোরিয়ালের মতো করে শিখতে শুরু করেন দেবী। এখানে বলে রাখা ভালো, লিলি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক। এখন পুরোদস্তুর পৌরোহিত্য করেন তিনি। অকালবোধন থেকে শুরু করে সপ্তমীর নবপত্রিকা পুজো, অষ্টমীর সন্ধিপুজো কিংবা নবমীর যজ্ঞ — প্রতিটা আচারকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন গভীর আন্তরিকতায়।

পুজো মানেই তো শুধু জাঁকজমক নয়, পুজো মানে সমাজের সব স্তরের মানুষকে আপন করে নেওয়া। তাই তো এই পুজোয় কোনও ভেদাভেদ ছিল না। সে কারণেই দেবীর পুজোয় হাত হাতে সাহায্য করতে পারেন মুসলিম বন্ধু শাহিনা থেকে শুরু করে পিরিয়ডস চলা বন্ধুও। নিয়ম ছিল একটাই — মন থেকে দেবীর সেবা করা, মায়ের মধ্যে নিজের ঘরের মেয়েকে খুঁজে পাওয়া।

দশমীর দিন সিঁদুর খেলা আর বিষাদের সুরের পাশাপাশি এই পুজোয় ছিল এক অদ্ভুত ঘরোয়া আমেজ। এ যেন ঘরের এক মেয়ের পুজো, যাকে নিজের হাতে সাজিয়ে তুলেছে বাড়িরই নারীরা।

দেবীর কথায়, ‘এই উদ্যোগ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভক্তি যখন কৃত্রিমতার খোলস ছেড়ে মুক্ত হয়, তখন তা এক অনন্য রূপ নেয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বা পুরোহিততন্ত্রের শত বছরের পুরনো নিয়মকে ভেঙে নারীরাও যে মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেন, পুজো মণ্ডপের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারেন — এই পুজোই তারই সবচেয়ে বড় দলিল।’

এ বিষয়ে লিলি এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমি গত তিন বছর নেদারল্যান্ডসে আলমেয়ারে দুর্গাপুজো করেছি একা। ঠিক করেছিলাম, এ বছর আমি আর পুজো করব না। একা পুজো করতে অনেক বেশি পরিশ্রম হয়। দেবী আমাকে অনুরোধ করে। তারপর দেবীই পুরো ব্যাপারটা নিজের দায়িত্ব হিসেবে নেয়। দেবী সাহায্য করবে বলাতেই আমি রাজি হই।’

লিলি জানান, দেবী খুব সিরিয়াস ছাত্রী। তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকদিন দেবী আমার সঙ্গে বসেছে। আমি আলাদা আলাদা করে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমীর গুরুত্ব ওকে বলেছি। বিভিন্ন পুরাণে দুর্গার যে আখ্যান আছে, সেগুলো দেবীকে আলাদা করে শুনিয়েছি, যাতে ও বুঝতে পারে যে, কোন অনুষ্ঠান কেন হয়? কেন অকালবোধন, কেন ষষ্ঠীর রাতে অধিবাস হয়, অধিবাসের অর্থ কী, কেন সপ্তমীতে কলাবৌ স্নান করানো হয়? দেবীর সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। শেষ অবধি প্রত্যেক অনুষ্ঠানই খুব ভালো ভাবে আমরা মেনে চলেছি, রীতি অনুযায়ী সব কিছু করেছি।’ দেবী বলেন, ‘শুভমস্তুর পুজোর নিয়ম কানুন সব নাটকের স্ক্রিপ্টের মতো করে লেখা থাকে। তা পড়লেই সবটা হয়ে যায়। কোন হাতে কুশ ধরতে হবে, কীসের পর কী করতে হবে… সবটা। তাই পুজো করাটাও অনেক সহজ। একই সঙ্গে এখানে কোনও বাধ্যবাধ্যকতা নেই। নিষ্ঠা আর ভক্তটাই আসল। সকালে অন্নভোগ দিতে হবে মানে যে, খিচুড়িই করতে হবে, এমন নিয়ম নেই। সেদ্ধ ভাত দিলেও হবে। মা তাতেই খুশি। এই ভাবনাই আমাকে আরও আকর্ষণ করে।’

কেন এই অভিনব রীতি মেনে পুজো? লিলি বলেন, ‘আমাদের বাঙালি মেয়েরা অসম্ভব স্নেহপ্রবণ। ভক্তির মধ্যেও সেই স্নেহ বিদ্যমান। ভক্তি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছয় ভক্ত আর ঈশ্বরের মধ্যে, মানে পূজক আর উপাসকের মধ্যে, তখন কোনও তফাত থাকে না। তাঁরা খুব নিকট হয়ে যায়। মা দুর্গাকে আমরা ওই সিংহের উপরে আসীন মহাদেবী পরমেশ্বরী রাজরাজেশ্বরী হিসেবে আমরা পুজো করছি ঠিকই, কিন্তু আমরা সবসময় তাঁকে নিজের ঘরের মেয়েই ভাবি। এই ভাবনাটাকে আমি উৎসাহ দিই। এখানে আন্তরিকতাটাই আসল। যিনি আমাকে পুজো শিখিয়েছিলেন, তিনি একটা কথা সবসময় বলতেন, ঈশ্বর কিন্তু যত্নটা দেখেন, বাহুল্য নয়।’

লিলি আরও বলেন, ‘শাস্ত্রে বলাই আছে যে, মায়ের পুজো সবাই করতে পারে। শূদ্রও করতে পারে, মনুষ্য করতে পারে, মনুষ্যেতর প্রাণীও করতে পারে। মায়ের পুজো সমাজের যে কোনও স্তরের লোক করতে পারে, তাঁদের সেই অধিকার আছে। আমি নিজেই অব্রাহ্মণ, তারপরে মহিলা। কিন্তু পুজোর কাজটা খুব ভালো ভাবে জানি এবং আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে। আর ব্রাহ্মণত্ব তো অর্জনের জিনিস। বার বার স্মৃতিতে বলা আছে, মহাভারতে, রামায়ণও বহুবার বলা আছে যে, জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ সে তো ব্রাহ্মণ বটে, কিন্তু ব্রাহ্মণত্ব অর্জনের জিনিস। বিশেষ বিশেষ কিছু চরিত্র থাকলে তবেই সে ব্রাহ্মণ পদবাচ্য হতে পারে। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে গেলে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে। ব্রাহ্মণ কায়মনোবাক্যে সংযত হবেন। শরীরে সংযম, মনে সংযম, বাক্যে সংযম। বিশ্বামিত্র জন্মসূত্রে ক্ষত্ৰিয় ছিলেন, কিন্তু তিনি তপস্যার দ্বারা ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি ব্রাহ্মণত্ব অর্জনের জিনিস।’

নিজের বাড়িতে পুজো করতে চাইলে কী করবেন?

লিলি জানান, শুভমস্তুর পুজো পদ্ধতি কেবল সেই দলের সদস্য বা পুরোহিতদের কাছেই সীমাবদ্ধ। সেটা বাইরে কাউকে শেখানো হয় না। তবে কেউ যদি বাড়িতে পুজো করতে চান, আমি গাইড করতে পারি। চিরাচরিত ঐতিহ্য অনুযায়ী যে পুজোগুলো আমরা করি, আমাদের কালিকাপুরান অনুসারে যে দুর্গাপুজো হয়, তা আমি যতটুকু জানি, সে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু পুজো পদ্ধতি একদম হুবহু, অর্থাৎ যে ভাবে আমি পুজো করেছি, সে ভাবে পুজো পদ্ধতি শেখানোটা সম্ভব নয়। সেটা শুধু শুভমস্তুর মধ্যেই থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *