২০৩০ থেকে নতুন গাড়িতে বাধ্যতামূলক AEB? বড় নিরাপত্তা বদলের প্রস্তাব
নয়াদিল্লি: গাড়ি চালানোর সময় সামনে আচমকা কোনও গাড়ি থেমে গেলে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এবার সেই পরিস্থিতিতে গাড়িই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক কষে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে। ভারতে যাত্রীবাহী গাড়িতে অটোমেটিক ইমার্জেন্সি ব্রেকিং (AEB) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক (MoRTH)। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের অক্টোবর থেকে নতুন গাড়ির মডেলে এবং ২০৩২ সালের অক্টোবর থেকে বাজারে বিক্রি হওয়া সমস্ত প্রযোজ্য মডেলে এই প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু AEB নয়, স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ, লেন থেকে গাড়ি সরে গেলে সতর্কতা, চালকের ঘুম বা মনোযোগের অভাব শনাক্ত করার প্রযুক্তি, শিশুদের গাড়ির আসন সংযুক্ত করার ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার সময় লাগেজ যাত্রীদের দিকে ছিটকে আসা আটকানোর মতো বিষয়েও একাধিক নিরাপত্তা বিধির প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এগুলি এখনও চূড়ান্ত আইন নয়, খসড়া প্রস্তাব। প্রস্তাবগুলি অপরিবর্তিত অবস্থায় কার্যকর হবে কি না, তা সরকারি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে।
কী এই অটোমেটিক ইমার্জেন্সি ব্রেকিং?
AEB হল এমন একটি উন্নত গাড়ি-নিরাপত্তা প্রযুক্তি, যা সামনের রাস্তা পর্যবেক্ষণ করতে ক্যামেরা, রাডার অথবা দু’টিই ব্যবহার করতে পারে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ শনাক্ত হলে প্রথমে চালককে সতর্ক করে গাড়িটি। চালক সময়মতো প্রতিক্রিয়া না জানালে সিস্টেম নিজে থেকেই ব্রেক কষতে পারে।
এর উদ্দেশ্য হল দুর্ঘটনা এড়ানো অথবা সংঘর্ষ ঘটলেও আঘাতের তীব্রতা কমানো। এটি ADAS বা Advanced Driver Assistance Systems-এর একটি অংশ। তবে AEB বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোলের মতো ADAS-এর সব ফিচারও ব্যক্তিগত গাড়িতে বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।
কোন গতিতে কাজ করবে AEB?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রস্তাবিত AIS-185 মানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে AEB-এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
- সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে সংঘর্ষ সম্পূর্ণ এড়ানোর পরীক্ষা থাকবে।
- রাস্তা পার হওয়া শিশু-আকৃতির পরীক্ষামূলক পুতুলের ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে সংঘর্ষ এড়ানোর পরীক্ষা থাকবে।
- নির্দিষ্ট পরীক্ষায় এর চেয়ে বেশি গতিতে সংঘর্ষ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলে গাড়ির গতি কমিয়ে আঘাতের তীব্রতা হ্রাস করার সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
- ব্রেক কষার আগে চালককে অন্তত দু’ভাবে সতর্ক করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেমন শব্দ, কম্পন অথবা দৃশ্যমান সংকেত।
চালক স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বা অ্যাক্সিলারেটর জোরে চাপ দিয়ে সিস্টেমের হস্তক্ষেপ অতিক্রম করতে পারবেন বলে খসড়ার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে AEB বন্ধ করে রাখার সুযোগ থাকবে না বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে। চালক সিস্টেমটি বন্ধ করলেও গাড়ি পুনরায় চালু করলে তা আবার সক্রিয় হয়ে যাবে।
২০২৭ থেকে ২০৩২: কোন বছরে কী বদলাতে পারে?
খসড়ায় বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ধাপে ধাপে সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
| প্রস্তাবিত সময়সীমা | সম্ভাব্য পরিবর্তন |
| ১ অক্টোবর ২০২৭ | গাড়ির স্টিয়ারিং পরিচালনার জন্য নির্ধারিত AIS-193 মান পূরণের প্রস্তাব। গাড়িতে অটোমেটিক স্টিয়ারিং বা ইমার্জেন্সি লেন-কিপিং থাকলে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মানও পূরণ করতে হবে। |
| ১ অক্টোবর ২০২৮ | যে M1 শ্রেণির যাত্রীবাহী গাড়ি এবং ৩.৫ টন পর্যন্ত N1 শ্রেণির পণ্যবাহী গাড়িতে ইতিমধ্যেই AEB রয়েছে, সেগুলিকে প্রস্তাবিত AIS-185 পরীক্ষার মান পূরণ করতে হবে। |
| ১ অক্টোবর ২০২৯ | ট্যাক্সির মতো পরিবহণের কাজে নিবন্ধিত M1 শ্রেণির গাড়িতে নির্দিষ্ট অটোমেটিক স্টিয়ারিং ও ইমার্জেন্সি লেন-কিপিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। |
| ১ অক্টোবর ২০৩০ | নতুন M1 শ্রেণির যাত্রীবাহী গাড়ির মডেলে AEB বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। |
| ১ অক্টোবর ২০৩২ | বাজারে বিক্রি হওয়া সমস্ত প্রযোজ্য M1 শ্রেণির মডেলে AEB বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। |
এখানে M1 বলতে চালক ছাড়া সর্বোচ্চ আটজন যাত্রী বহনে সক্ষম যাত্রীবাহী গাড়িকে বোঝায়। N1 হল ৩.৫ টন পর্যন্ত ওজনের হালকা পণ্যবাহী গাড়ির শ্রেণি।
লেন-কিপিং ও চালকের ঘুম শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আসছে?
খসড়ায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রযুক্তির উল্লেখ রয়েছে।
অটোমেটিক স্টিয়ারিং বা ACSF: গাড়িকে লেনের মাঝখানে রাখতে সহায়তা করার মতো স্বয়ংক্রিয় স্টিয়ারিং ব্যবস্থা থাকলে ২০২৭ সালের অক্টোবর থেকে নির্ধারিত মান মেনে চলার প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৯ সালের অক্টোবর থেকে পরিবহণের কাজে নিবন্ধিত M1 গাড়িতে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
ইমার্জেন্সি লেন-কিপিং বা ELKS: চালকের অজান্তে গাড়ি নিজের লেন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে থাকলে এই ব্যবস্থা সতর্ক করতে পারে বা স্টিয়ারিংয়ে হস্তক্ষেপ করে গাড়িকে লেনে ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে এই প্রযুক্তি থাকা গাড়িকে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে। ২০২৯ সালে পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট গাড়ির ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক হতে পারে।
চালকের ক্লান্তি ও মনোযোগের সতর্কতা: AIS-184 অনুযায়ী, চালকের ক্লান্তি বা মনোযোগের অভাবের লক্ষণ শনাক্ত করে সতর্ক করার ব্যবস্থা নিয়েও নিয়ম আনার প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৭ সালে প্রযুক্তিটি থাকলে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে এবং ২০২৯ সাল থেকে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী গাড়িতে এটি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
শিশুদের সিট ও গাড়ির লাগেজ নিয়েও নতুন নিয়ম
শিশুদের গাড়ির আসন নিরাপদে সংযুক্ত করার জন্য ISOFIX অ্যাঙ্কর, টপ-টেথার পয়েন্ট বা i-Size আসনের ব্যবস্থা থাকলে সেগুলিকে নির্দিষ্ট মান মেনে তৈরি করার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, নতুন মডেলের ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের অক্টোবর এবং সব প্রযোজ্য মডেলের ক্ষেত্রে ২০২৮ সালের অক্টোবর থেকে এই নিয়ম কার্যকর হতে পারে। তবে এই প্রস্তাব নিজে থেকে প্রতিটি গাড়িতে ISOFIX ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করছে না।
গাড়ির বুটে রাখা লাগেজ দুর্ঘটনার সময় ছিটকে কেবিনে ঢুকে যাত্রীদের আঘাত করতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতে IS 15546:2005 অনুযায়ী লাগেজ ধরে রাখার নিরাপত্তা মান পূরণের প্রস্তাব রয়েছে। নতুন মডেলের ক্ষেত্রে ২০২৮ সালের এপ্রিল এবং সমস্ত প্রযোজ্য মডেলের ক্ষেত্রে একই বছরের অক্টোবর থেকে এটি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন গাড়ির দাম বাড়বে?
AEB-সহ উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করতে গাড়ি নির্মাতাদের অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। বিশেষত, যেসব সাশ্রয়ী গাড়িতে এখন এই প্রযুক্তি নেই, সেগুলির উৎপাদন খরচ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই খরচের কিছু অংশ গাড়ির দামে প্রতিফলিত হতে পারে।
তবে খসড়ায় এর ফলে গাড়ির দাম ঠিক কতটা বাড়তে পারে, তার কোনও নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি, ২০২৮ সাল থেকে যেসব গাড়িতে AEB থাকবে, সেগুলিকে নির্ধারিত পরীক্ষার মান পূরণ করতে হলে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
খসড়ার কোথায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা?
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হল, পরীক্ষার বিবরণে সাইকেল আরোহীদের জন্য AEB-এর সম্পূর্ণ পরীক্ষাব্যবস্থা এখনও অন্তর্ভুক্ত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় রাস্তায় সাইকেল, দু’চাকার গাড়ি, রাস্তা পার হওয়া পথচারী, গবাদি পশু এবং হঠাৎ লেন পরিবর্তন করা যানবাহনের উপস্থিতি বেশি। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পরীক্ষার গতি-সীমাও নির্দিষ্ট। সামনে থাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ১০ থেকে ৬০ কিলোমিটার এবং পথচারীর ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতির মধ্যে পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। পরীক্ষাগুলি দিনের আলোয় করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে রাতের অন্ধকারে বা উচ্চগতির মহাসড়কে AEB-এর কার্যকারিতা সম্পর্কে এই পরীক্ষার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না।
আরও একটি বিষয় হল, কোনও গাড়ির ফেসলিফ্ট বা নতুন ভ্যারিয়েন্টকে ২০৩০ সালের সময়সীমার ক্ষেত্রে ‘নতুন মডেল’ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ছোট পিকআপ ও অন্যান্য N1 শ্রেণির পণ্যবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে AEB বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও নেই; এই শ্রেণির গাড়িতে প্রযুক্তিটি থাকলে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে।
এখনও চূড়ান্ত নয় সরকারি সিদ্ধান্ত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর গেজেটে খসড়াটি প্রকাশ করা হয়েছে এবং জনসাধারণের মতামত জানানোর জন্য ৩০ দিন সময় রাখা হয়েছে। এরপর মন্ত্রক প্রস্তাবগুলি অনুমোদন করতে পারে, পরিবর্তন করতে পারে অথবা বাদও দিতে পারে।
খসড়া সম্পর্কে মতামত বা পরামর্শ পাঠানোর জন্য প্রতিবেদনে [email protected] ইমেল ঠিকানার উল্লেখ রয়েছে।
প্রস্তাবগুলি কার্যকর হলে ভারতের গাড়ির নিরাপত্তা বিধিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখনই গাড়ি কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে বর্তমান গাড়ির মালিকদের AEB বসানোর কোনও বাধ্যবাধকতার কথা এতে বলা হয়নি।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business