শত্রুর রাডার ধ্বংসে নতুন হ্যামার, ২০২৮-এ রাফালে যুক্ত করতে চায় ফ্রান্স - 24 Ghanta Bangla News
Home

শত্রুর রাডার ধ্বংসে নতুন হ্যামার, ২০২৮-এ রাফালে যুক্ত করতে চায় ফ্রান্স

Spread the love

নয়াদিল্লি: শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে রাফালে যুদ্ধবিমানের জন্য আরও শক্তিশালী অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে ফ্রান্স। এ ক্ষেত্রে নতুন সংস্করণের এএএসএম হ্যামার (AASM HAMMER)…

নয়াদিল্লি: শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে রাফালে যুদ্ধবিমানের জন্য আরও শক্তিশালী অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে ফ্রান্স। এ ক্ষেত্রে নতুন সংস্করণের এএএসএম হ্যামার (AASM HAMMER) নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রস্তাবিত হ্যামার এক্সএলআর (Hammer XLR)-এ থাকবে ক্ষুদ্র টার্বোজেট ইঞ্জিন। বর্তমান হ্যামার সংস্করণগুলিতে ব্যবহৃত কঠিন জ্বালানির রকেট মোটরের পরিবর্তে এই ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে অস্ত্রটির পাল্লা বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে শত্রুর শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় না ঢুকেও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে ফরাসি রাফালে।

ফরাসি প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট Opex360-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ফ্রান্সের জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখার সময় এই অস্ত্রের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন ফরাসি এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল জেরোম বেলাঁজে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নতুন সংস্করণটি ফ্রান্সের এমন একটি সামরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে, যা ১৯৯০-এর দশকে AS-37 Martel অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল অবসর নেওয়ার পর হারিয়ে গিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে হ্যামার এক্সএলআর কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।

কীভাবে কাজ করবে নতুন হ্যামার এক্সএলআর?

হ্যামার নামটি এসেছে ফরাসি শব্দ Armement Air-Sol Modulaire থেকে। এটি সাফরান (Safran) নির্মিত একটি মডিউলার আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র। এর মধ্যে থাকে গাইডেন্স ব্যবস্থা, ওয়ারহেড এবং পাল্লা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিট। এই প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ বোমাকেও নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্রে রূপান্তর করা যায়। দূর থেকে অস্ত্র নিক্ষেপের সুবিধা থাকায় যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তুর একেবারে কাছে গিয়ে হামলা চালানোর ঝুঁকি নিতে হয় না।

প্রস্তাবিত এক্সএলআর সংস্করণে টার্বোজেট ইঞ্জিন যুক্ত হলে পাল্লা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অস্ত্রটির চূড়ান্ত পাল্লা, কার্যক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও নিশ্চিত নয়। এই ধরনের অস্ত্রের মূল লক্ষ্য শুধু কোনও স্থাপনায় আঘাত হানা নয়, বরং শত্রুর রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে অন্য যুদ্ধবিমানের জন্য নিরাপদ আকাশপথ তৈরি করা।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অস্ত্র?

ভারতীয় বায়ুসেনার রাফালে যুদ্ধবিমান ইতিমধ্যেই প্রচলিত হ্যামার অস্ত্র ব্যবহার করে। ২০২০ সালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর চিনের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে রাফালে বহরকে দ্রুত কার্যকর করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই সময় ভারত হ্যামার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালের মূল রাফালে অস্ত্র প্যাকেজে এটি ছিল না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইজরায়েলের SPICE 2000 অস্ত্র ব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ফরাসি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে আগে থেকেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় হ্যামারকে বেছে নেওয়া হয়, ফলে দ্রুত সংযুক্তিকরণ সম্ভব হয়েছিল।

ভারতীয় বায়ুসেনার অস্ত্রভাণ্ডারে হ্যামারের পাশাপাশি রয়েছে SCALP আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল এবং SPICE পরিবারের নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্র। তবে হ্যামার এক্সএলআর-এর সম্ভাব্য ভূমিকা কিছুটা আলাদা। এটি শত্রুর রাডার ও ভূমিভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

SEAD ও DEAD অভিযানে কী সুবিধা মিলবে?

শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল করার অভিযানকে বলা হয় Suppression of Enemy Air Defences (SEAD)। অন্যদিকে, শত্রুর রাডার, সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনা সরাসরি ধ্বংস করার অভিযান হল Destruction of Enemy Air Defences (DEAD)। এই দুই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য হল শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে অন্য যুদ্ধবিমান ও আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ তৈরি করা।

রাফালে যুদ্ধবিমানে থাকা SPECTRA ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা শত্রুর হুমকি শনাক্ত, বিশ্লেষণ এবং তার মোকাবিলায় সাহায্য করে। কিন্তু আত্মরক্ষামূলক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার বিকল্প নয় শত্রুর রাডার থেকে নির্গত সংকেত অনুসরণ করে আঘাত হানতে সক্ষম বিশেষ অ্যান্টি-রেডিয়েশন অস্ত্র। হ্যামার এক্সএলআর-এর মতো অস্ত্র এই ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে।

ভারতে হ্যামার উৎপাদনের পরিকল্পনা

ভারতের জন্য হ্যামারের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে দেশেই উৎপাদনের পরিকল্পনার কারণে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সংস্থা ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL) এবং ফ্রান্সের সাফরান হ্যামার অস্ত্র ভারতে উৎপাদন, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যৌথ উদ্যোগ সংক্রান্ত চুক্তি এবং একটি মাস্টার প্রোডাকশন চুক্তি স্বাক্ষর করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন সাপেক্ষে এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতীয় বায়ুসেনা ও নৌবাহিনীর চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশীয় উপাদানের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

তবে হ্যামার এক্সএলআর এখনও ফ্রান্সের প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবেই আলোচনায় রয়েছে। ভারত এই নতুন সংস্করণ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। তাই ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক গুরুত্ব মূলত বর্তমানে ব্যবহৃত হ্যামার অস্ত্র এবং দেশে তার উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনায়।

নিজস্ব অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইলেও এগোচ্ছে ভারত

শত্রুর রাডার শনাক্ত করে তাতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ভারত সম্পূর্ণভাবে বিদেশি অস্ত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। ভারতীয় বায়ুসেনা রুশ Kh-31 পরিবারের অ্যান্টি-রেডিয়েশন অস্ত্র ব্যবহার করে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) দেশীয় প্রযুক্তিতে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।

দেশীয় উদ্যোগের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল রুদ্রম-১ (Rudram-I)। ২০২০ সালের অক্টোবরে Su-30MKI যুদ্ধবিমান থেকে এই অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইলের উড়ান পরীক্ষা করা হয়। এতে রয়েছে ইনর্শিয়াল নেভিগেশন ব্যবস্থা, উপগ্রহ-সহায়ক নেভিগেশন এবং প্যাসিভ হোমিং হেড। এই ব্যবস্থা শত্রুর রাডার থেকে নির্গত সংকেত শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করে সেই অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তুর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করতে পারে। ফলে শত্রুর প্রতিরক্ষা বলয়ের খুব কাছে না গিয়েও হামলা চালানো সম্ভব হয়।

এর পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়েছে রুদ্রম-২ (Rudram-II) প্রকল্প। ২০২৬ সালের জুনে DRDO এবং ভারতীয় বায়ুসেনা এই আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের উড়ান পরীক্ষা চালায় বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছিল। মন্ত্রকের দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত হয় এবং পরীক্ষার সমস্ত উদ্দেশ্য পূরণ করে। রুদ্রম-২-এর লক্ষ্য রাডার-সম্পর্কিত স্থাপনার পাশাপাশি আরও বিস্তৃত ধরনের সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করার সক্ষমতা তৈরি করা।

ফলে ফ্রান্সের হ্যামার এক্সএলআর প্রকল্প ভারতের কাছে আগ্রহের বিষয় হলেও, দেশের নিজস্ব রুদ্রম কর্মসূচিও একই বৃহত্তর সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত, নিষ্ক্রিয় ও ধ্বংস করার সক্ষমতা বাড়ানো ভবিষ্যতের বিমানযুদ্ধে ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *