ভারত-পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা, বদলাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভারত-পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা, বদলাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ

Spread the love

নয়াদিল্লি: আধুনিক যুদ্ধে শুধু আকাশের দখল (Air Defence Systems) থাকলেই যে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সেই ধারণা ক্রমশ বদলাচ্ছে। উপগ্রহ, চালকবিহীন আকাশযান, উন্নত সেন্সর এবং দূরপাল্লার নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের কৌশলে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। যুদ্ধবিমানকে শত্রুর আকাশসীমায় পাঠানোর ঝুঁকি না নিয়েও কয়েকশো কিলোমিটার দূরের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় আঘাত হানার ক্ষমতা এখন সামরিক শক্তির অন্যতম মাপকাঠি।

ইরান, আমেরিকা ও ইজরায়েলকে ঘিরে সংঘাতের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনকে আরও সামনে এনেছে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মত। ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ব্যবহার করে দেশের সীমানার বাইরেও সামরিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএম ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই অস্ত্রের একটি হামলাকে রেকর্ড গড়া আঘাত বলে বর্ণনা করলেও হামলার নির্দিষ্ট স্থান ও দূরত্ব প্রকাশ করা হয়নি।

এই পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মে মাসে অপারেশন সিঁদুরের পর ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশই দূরপাল্লার প্রচলিত অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড গঠন এবং ভারতের দূরপাল্লার হামলা ও বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ সেই প্রতিযোগিতারই অংশ।

কেন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিচ্ছে?

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে উপগ্রহ, সেন্সর এবং চালকবিহীন আকাশযানের মাধ্যমে দূরের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে যুদ্ধবিমান সরাসরি শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে না পাঠিয়েও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে।

আমেরিকা ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকেই দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইলকে সামরিক অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহার করে আসছে। পরবর্তী সময়ে বলকান অঞ্চল, আফগানিস্তান, দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইরানকে ঘিরে অভিযানে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এই কৌশলের মূল সুবিধা হল, শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে চালকসহ যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সফলতা নির্ভর করে তার পাল্লা, নির্ভুলতা, প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের উপর।

ইরানের ক্ষেত্রেও ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশটির পুরনো যুদ্ধবিমান বহর সংঘাতের প্রথম দিকে বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও দূরপাল্লার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির সামরিক আধুনিকীকরণে বাধা তৈরি করলেও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার তাকে আঞ্চলিক সংঘাতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।

চিন ও রাশিয়ার কাছেও প্রচলিত এবং কৌশলগত অস্ত্র বহনে সক্ষম বিস্তৃত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী রয়েছে।

অপারেশন সিঁদুরের পর পাকিস্তানের নতুন পরিকল্পনা

২০২৫ সালের মে মাসে অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন ভারত পাকিস্তানের মুরিদকে ও বাহাওয়ালপুরে জঙ্গি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে ভোলারি, সরগোধা এবং নূর খান-সহ পাকিস্তানের একাধিক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তান জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং গুজরাটের বিভিন্ন ভারতীয় সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অধিকাংশ অস্ত্রই প্রতিহত বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ফতেহ-২ ক্ষেপণাস্ত্রের কথিত হামলার চেষ্টা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ মে দিল্লি অঞ্চলের দিকে ছোড়া একটি ফতেহ-২ হরিয়ানার সিরসার কাছে ভূপাতিত করা হয়। সিরসা নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই সংঘাতের পর পাকিস্তানের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ সামনে আসে। ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড বা এআরএফসি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। নতুন এই কমান্ডের উদ্দেশ্য হল প্রচলিত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলিকে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে আনা।

কী এই আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড?

পাকিস্তানের নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ডের নেতৃত্বে তিন-তারকা পদমর্যাদার এক জেনারেল থাকবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সামরিক গঠন এবং বিশেষ ইউনিটের প্রচলিত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে একত্রিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

আগে পাকিস্তানের ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ কৌশলগত ও পারমাণবিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হতো। অন্যদিকে, প্রচলিত রকেট আর্টিলারি ছিল সেনাবাহিনীর আর্টিলারি বিভাগের দায়িত্বে। ফলে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় পৃথক কমান্ড কাঠামো কাজ করত।

নতুন কমান্ডের মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করা এবং প্রয়োজনে একসঙ্গে বেশি অস্ত্র ব্যবহার করার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তান প্রচলিত যুদ্ধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমার মাঝখানে একটি কৌশলগত ঘাটতি অনুভব করেছে বলে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি আর শঙ্করের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রচলিত ও দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে পাকিস্তান।

তবে নতুন কমান্ড গঠনের অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পারবে। অস্ত্রের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রযুক্তি, লক্ষ্য নির্ধারণ, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর।

পাকিস্তানের ফতেহ ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের সক্ষমতা

পাকিস্তানের নতুন কমান্ডের মূল অস্ত্রগুলির মধ্যে ফতেহ পরিবারের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা বলা হয়েছে। এগুলির পাল্লা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য এক নয়।

ফতেহ-১: এটি একটি নিয়ন্ত্রিত মাল্টিপল রকেট লঞ্চার ব্যবস্থা। এর পাল্লা প্রায় ৭০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মূলত কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।

ফতেহ-২: এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বলে দাবি করা হয়। এতে ইনর্শিয়াল নেভিগেশনের সঙ্গে উপগ্রহভিত্তিক নির্দেশনা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের সংঘাতে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ফতেহ-২ এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ: ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পাকিস্তানের আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড এই সংস্করণটির পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে বলে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ এটিকে হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বলে বর্ণনা করেছে। তবে এই সংস্করণের পাল্লা প্রকাশ করা হয়নি এবং এর হাইপারসনিক সক্ষমতা যাচাই করার মতো প্রকাশ্য উড়ান-সংক্রান্ত তথ্যও প্রতিবেদনে দেওয়া নেই।

ফতেহ-৩ ও ফতেহ-৪: ফতেহ-৩-কে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ফতেহ-৪ একটি ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, যার ঘোষিত পাল্লা প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার।

এ ছাড়া, পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে চিন থেকে পাওয়া এ-১০০ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা রাশিয়ার স্মের্চ রকেট সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে তৈরি। ভারতও স্মের্চ ব্যবস্থা ব্যবহার করে।

প্রতিরক্ষা মহলে ফতেহ-৫ নামে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার একটি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে এর অস্তিত্ব নিশ্চিত নয়। একইভাবে, শাহিন, গৌরি এবং বাবর পরিবারের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলি নতুন কমান্ডের আওতায় আসবে কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে মতভেদ রয়েছে। একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনও এই বাহিনীর সম্ভাব্য অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পারমাণবিক কমান্ডের সঙ্গে এআরএফসির পার্থক্য কোথায়?

পাকিস্তানের আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড গঠনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দেশের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোর সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে।

পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশন বা এসপিডি ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির অধীনে দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের নিরাপত্তা ও পরিচালন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে, এআরএফসি মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার প্রচলিত রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার জন্য পৃথক সেনা কমান্ড হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এই বিভাজনের উদ্দেশ্য হল, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পর্যায়ে না গিয়েও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানোর বিকল্প তৈরি করা। ভারত ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই পার্থক্য কৌশলগত হিসাবকে আরও জটিল করে তোলে।

তবে দুটি কাঠামোর কাজ পুরোপুরি আলাদা করে রাখা সহজ নয়। ক্ষেপণাস্ত্রের প্রস্তুতি, মোতায়েন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং সংকটের সময়ে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন কমান্ড গঠনের ফলে কিছু ক্ষেত্রে পরিকাঠামো ও দায়িত্বের পুনরাবৃত্তিও হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত সীমিত সংখ্যায় কৌশলগত অস্ত্র তৈরির দিকে বেশি মনোযোগী। বৃহৎ সংখ্যায় প্রচলিত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের প্রয়োজন মেটাতে সেই ব্যবস্থাকে কতটা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়াচ্ছে ভারতও

অপারেশন সিঁদুরের আগেই ভারত প্রচলিত দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনী বিভিন্ন প্রয়োজন অনুযায়ী পিনাকা, স্মের্চ, প্রলয় এবং ব্রহ্মসের মতো অস্ত্রব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রলয় ক্ষেপণাস্ত্র: এটি কঠিন জ্বালানিচালিত, আধা-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ১৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম রি-এন্ট্রি ভেহিকল এবং প্রচলিত ওয়ারহেড ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক প্রায় ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের অনুমোদন দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রলয়ের পরপর দুটি ব্যবহারকারী পর্যায়ের পরীক্ষাও সম্পন্ন হয় বলে জানানো হয়েছে।

ব্রহ্মস: ক্ষেপণাস্ত্রটির পরবর্তী সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এই পাল্লা সংশ্লিষ্ট সংস্করণের জন্য সম্ভাব্য উন্নয়ন-লক্ষ্য, বর্তমান সব ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা নয়।

পিনাকা: এই রকেট ব্যবস্থার দীর্ঘপাল্লার নিয়ন্ত্রিত সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে। এর সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

দূরপাল্লার স্থলভিত্তিক ক্রুজ মিসাইল: ভারত সাবসনিক ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইলও তৈরি করছে। এর মধ্যে লং-রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল রয়েছে। ব্রহ্মসের তুলনায় কম খরচে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে বেশি সংখ্যায় মোতায়েন করার লক্ষ্য থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অস্ত্রগুলির মূল উদ্দেশ্য হল শত্রুর কমান্ড সেন্টার, গোলাবারুদের ভাণ্ডার, সেতু এবং রসদ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের মতো গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বিকল্প তৈরি করা।

যুদ্ধবিমান না পাঠিয়েও কেন হামলার বিকল্প জরুরি?

ঐতিহ্যগতভাবে শত্রুপক্ষের গভীর অঞ্চলে হামলা চালানোর জন্য বিমানবাহিনীর উপর নির্ভর করতে হয়েছে সেনাবাহিনীকে। কিন্তু আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক দূর থেকেই যুদ্ধবিমান শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারে।

অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতের এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে একটি পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার নির্দিষ্ট বিবরণ ও দূরত্বের বিষয়ে সরকারি নিশ্চিতকরণ যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে মূল কৌশলগত যুক্তিটি স্পষ্ট। শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে যুদ্ধবিমানকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো ব্যয়বহুল হতে পারে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সেই পরিস্থিতিতে বিকল্প আঘাত হানার ক্ষমতা দেয়। এতে যুদ্ধবিমানকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য প্রস্তুত রাখা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যখন বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনের সংখ্যা নিয়ে চাপ রয়েছে, তখন এই বিকল্পের গুরুত্ব বাড়ে।

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বলয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

দূরপাল্লার আক্রমণক্ষমতার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক সামরিক স্থাপনা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ইন্টিগ্রেটেড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা আইএসিএসিএস সীমান্তবর্তী এলাকার রাডার, সেন্সর এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি শনাক্ত করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ তৈরি হয়।

ভারতের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এস-৪০০, বারাক-৮ বা এমআর-স্যাম, আকাশ এবং কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা রয়েছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের সময় এই প্রতিরক্ষা কাঠামো কার্যকর ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে ভারত পাঁচটি এস-৪০০ স্কোয়াড্রনের জন্য প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকার চুক্তি করেছিল। সংঘাতের সময় তিনটি স্কোয়াড্রন কার্যকর ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কয়েকটি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, এস-৪০০, আকাশ-এনজি এবং এমআর-স্যাম ফতেহ-২-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। তবে কোন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ওই ক্ষেপণাস্ত্রকে ভূপাতিত করেছিল, তা ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

মিশন সুদর্শন চক্র ও প্রজেক্ট কুশা

ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘মিশন সুদর্শন চক্র’-এর কথা ঘোষণা করেছিলেন। ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত, বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলার লক্ষ্য এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বৃহত্তর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে প্রজেক্ট কুশা। এটি দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা এমআর-স্যাম এবং এস-৪০০-এর মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যবধান পূরণ করার জন্য পরিকল্পিত।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তিন ধরনের ইন্টারসেপ্টর থাকতে পারে, যাদের পাল্লা যথাক্রমে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার, ২৫০ কিলোমিটার এবং ৩৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

এই প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। অপারেশন সিঁদুরের পর প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাকে বা ডিআরডিও-কে উন্নয়ন দ্রুত করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় সাফল্যের কথাও প্রতিরক্ষা সচিব জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া আকাশ-এনজি, ভেরি শর্ট-রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা ভিশোরাডস এবং দুই স্তরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম পর্যায় যাচাই করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ভবিষ্যতের যুদ্ধ: আকাশের দখল নয়, পাল্লা ও প্রতিরোধের লড়াই

পাকিস্তান প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দূরপাল্লার আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কমান্ড ও একাধিক অস্ত্রব্যবস্থার উপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতও ব্রহ্মস, প্রলয় এবং উন্নত রকেট ব্যবস্থার মাধ্যমে দূরপাল্লার আঘাত হানার বিকল্প বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি, এস-৪০০-সহ বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ভবিষ্যতের ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রতিযোগিতার মূল প্রশ্ন শুধু কার হাতে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা নয়। কে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, কে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারে এবং কে পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, সেটিই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, পরীক্ষার দাবি এবং সংঘাতের ফলাফল সংক্রান্ত বহু তথ্য সরকারি ভাবে সম্পূর্ণ প্রকাশিত নয়। ফলে বিভিন্ন অস্ত্রের কার্যকারিতা বা দুই দেশের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *