SIR বিতর্কের আবহে মেটাকে কড়া বার্তা কেন্দ্রের, ভুয়ো ভিডিও নিয়ে সতর্কতা
নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিক্ষোভের আবহে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক সংস্থা মেটাকে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে আরও সতর্ক হতে বলল কেন্দ্রীয় সরকার। পুরনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে দেখানো, সম্পাদিত ছবি ছড়ানো এবং বিভ্রান্তিকর দাবিকে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY)।
পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর জারি করা এক পরামর্শ বিজ্ঞপ্তিতে মেটাকে তাদের কনটেন্ট সুপারিশ ও র্যাঙ্কিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে বলেছে মন্ত্রক। উদ্দেশ্য, ব্যবহারকারীরা যেন একটি নির্দিষ্ট বা সীমিত কয়েকটি বক্তব্যের মধ্যেই আটকে না পড়েন এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে এমন বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক বিষয়বস্তু অস্বাভাবিকভাবে বেশি প্রচার না পায়।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়নি। দিল্লিতে এসআইআর নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলির নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলার সময় এই নির্দেশিকা সামনে এসেছে।
মেটার অ্যালগরিদম নিয়ে কী উদ্বেগ কেন্দ্রের?
মন্ত্রকের পরামর্শে বলা হয়েছে, মেটার কনটেন্ট রেকমেন্ডেশন ব্যবস্থা এমনভাবে কাজ করা উচিত নয়, যাতে ব্যবহারকারীরা একই ধরনের বক্তব্য বা সীমিত কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়বস্তু বারবার দেখতে পান। তার পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বাসযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের নাগাল নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে সংস্থাকে।
মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, চলমান জনজীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কিছু ছবি, ভিডিও, বিবৃতি এবং গ্রাফিক্স মেটার প্ল্যাটফর্মে বিশেষভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে এবং ব্যবহারকারীদের কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে। এই বিষয়বস্তু যথেষ্ট প্রেক্ষাপট ছাড়া ছড়ালে বিভ্রান্তি, উদ্বেগ, হিংসা কিংবা জনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে এমন রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে মেটার অ্যালগরিদম সব ধরনের বক্তব্যকে সমানভাবে সামনে আনছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ধরনের বিষয়বস্তু অন্যগুলির তুলনায় বেশি প্রচার পাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পুরনো ভিডিও ও সম্পাদিত ছবি নিয়ে বিশেষ সতর্কতা
কেন্দ্রের পরামর্শে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এমন ছবি ও ভিডিওর উপর, যেগুলি পুরনো, অন্য কোনও ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা আংশিকভাবে সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জরুরি পরিস্থিতি, বিধিনিষেধ, পুলিশের পদক্ষেপ এবং সরকারি নির্দেশিকা নিয়ে যাচাই না করা বা বিভ্রান্তিকর দাবির বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত এমন অডিয়ো-ভিজ্যুয়াল বিষয়বস্তু, যেখানে ঘটনার যথাযথ প্রেক্ষাপট নেই, সেগুলিও মন্ত্রকের নজরে রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, হিংসা বা বেআইনি কাজের প্ররোচনা দিতে পারে এমন বিষয়বস্তু এবং সুপারিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে বেশি প্রচার পাওয়া বিভ্রান্তিকর উপাদান শনাক্ত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
কোনও ছবি বা ভিডিওর সময়, স্থান, সত্যতা কিংবা ঘটনার পরিস্থিতি সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে স্পষ্ট না হলে সেটির সঙ্গে যথাযথ প্রেক্ষাপট দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
আইটি বিধি মেনে চলার নির্দেশ
মেটা একটি অনলাইন মধ্যস্থতাকারী সংস্থা বা ইন্টারমিডিয়ারি হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি বিধি, ২০২১ অনুযায়ী প্রযোজ্য দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে মন্ত্রক।
এই বিধিতে ব্যবহারকারীদের এমন নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে, যা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে অথবা জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোনও আমলযোগ্য অপরাধে উসকানি দিতে পারে।
মন্ত্রকের নির্দেশিকায় মোট ছয়টি বিষয়ে পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইটি বিধির আওতায় পড়া বিষয়বস্তু শনাক্ত ও মোকাবিলার ব্যবস্থা জোরদার করা, কনটেন্ট সুপারিশ ও র্যাঙ্কিং ব্যবস্থার পর্যালোচনা এবং বিভ্রান্তিকর, সম্পাদিত বা প্রেক্ষাপটহীন বিষয়বস্তুর অতিরিক্ত প্রচার রোধ করা।
এ ছাড়া সুপারিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত ব্যাপক প্রচার পাওয়া এবং জনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন বিষয়বস্তু শনাক্ত করা, পর্যালোচনা করা ও প্রয়োজনে উচ্চতর পর্যায়ে পাঠানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার নির্দেশ
মেটাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অনুমোদিত সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সময়মতো সহযোগিতা করার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রক। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অবিলম্বে কার্যকর করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা মন্ত্রককে জানাতেও বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই নির্দেশিকার ভিত্তিতে নেওয়া যে কোনও পদক্ষেপ তথ্যপ্রযুক্তি আইন, আইটি বিধি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
সেন্সরশিপের আশঙ্কা ডিজিটাল অধিকার সংগঠনের
কেন্দ্রের এই পরামর্শ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে আপত্তি তুলেছে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক অপার গুপ্তার বক্তব্য, বিজ্ঞপ্তিটি আইনত বাধ্যতামূলক না হলেও এটি কার্যত ধারাবাহিক সেন্সরশিপের নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করতে পারে।
পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুপ্তা মন্ত্রককে বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি, এর প্রতিক্রিয়ায় মেটা যদি কোনও বিষয়বস্তু সরিয়ে দেয় বা তার প্রচার কমিয়ে দেয়, তবে প্রতিটি এমন পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ্যে জানানোর দাবিও তুলেছেন তিনি।
গুপ্তার আপত্তি, বিষয়বস্তু যথাযথ প্রেক্ষাপট ছাড়া দেখানো হচ্ছে কি না কিংবা জনশৃঙ্খলা নিয়ে সংবেদনশীল পরিস্থিতি চলছে কি না, এই ধরনের অস্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, এই শব্দবন্ধগুলির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা আইটি বিধির নির্দিষ্ট বিধানের সরাসরি সম্পর্ক স্পষ্ট নয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ভুয়ো তথ্য নিয়ন্ত্রণ
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে, পুরনো বা সম্পাদিত ছবি-ভিডিওকে বর্তমান ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া এবং হিংসায় উসকানি দেওয়ার মতো বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, কোন বিষয়বস্তুকে বিভ্রান্তিকর বা প্রেক্ষাপটহীন বলে চিহ্নিত করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রের বক্তব্য, মেটার সুপারিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে এমন বিষয়বস্তুর অতিরিক্ত প্রচার রোধ করা দরকার। ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, অস্পষ্ট মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে বৈধ বক্তব্যের প্রচারও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
মেটা এই বিজ্ঞপ্তির জবাবে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে পরামর্শ বিজ্ঞপ্তিটি বাস্তবে কনটেন্ট সুপারিশ, পোস্টের দৃশ্যমানতা বা বিষয়বস্তু অপসারণের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.