দিল্লি পুলিশের ১৫.৭ কোটি টাকার সিসিটিভি প্রকল্পে নজরদারি নিয়ে বিতর্ক - 24 Ghanta Bangla News
Home

দিল্লি পুলিশের ১৫.৭ কোটি টাকার সিসিটিভি প্রকল্পে নজরদারি নিয়ে বিতর্ক

Spread the love

নয়াদিল্লি: দিল্লি পুলিশের ১৫.৭ কোটি টাকার একটি সিসিটিভি প্রকল্প (Facial Recognition) ঘিরে গোপনীয়তা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজি (এফআরটি)-সহ ৩৩৮টি নজরদারি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) টেন্ডারের নথি বিশ্লেষণ করে একাধিক ত্রুটি ও সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতির কথা তুলে ধরেছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জনসমাবেশ ও বিক্ষোভের সময় মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার। আইএফএফের বক্তব্য, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, যাচাই ও সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই। অন্যদিকে, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের এক সূত্রের দাবি, এই প্রকল্প সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। প্রায় দু’বছর আগে শুরু হওয়া বৃহত্তর আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

টেন্ডারের সময় নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছে?

আইএফএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিট বা এনইইটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যন্তর মন্তরে চলা বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পাঁচ দিন পর সরকারি ই-প্রকিউরমেন্ট পোর্টালে এই টেন্ডার প্রকাশ করা হয়। সময়ের এই নৈকট্য নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

১১ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেয়। ভবিষ্যতের বিক্ষোভের জন্য রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং শাহদরার সিবিডি গ্রাউন্ডের মতো বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়।

এই ঘটনাক্রম নিয়ে আলোচনা বাড়ার কারণ, প্রস্তাবিত ক্যামেরাগুলির কয়েকটি স্থাপনের স্থান জনসমাবেশ ও প্রতিবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়। আইএফএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুলিশ যে এলাকাগুলিকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারণ করেছে, সেগুলির কয়েকটিতে আগেই মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিসহ নজরদারির পরিকল্পনা ছিল।

তবে আইএফএফ স্পষ্ট করেছে, বিক্ষোভস্থল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এবং ক্যামেরা বসানোর টেন্ডারের মধ্যে সমন্বিত কোনও পরিকল্পনা ছিল, এমন প্রমাণ তারা পায়নি। ফলে দুটি ঘটনার সময়গত নৈকট্য থেকে সরাসরি কোনও যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

দিল্লি পুলিশের সূত্রের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যে চলা আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

১৫.৭ কোটি টাকার প্রকল্পে কী রয়েছে?

পাঁচ বছরের চুক্তির আওতায় মোট ৩৩৮টি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৮টি স্থির ক্যামেরা, ৪৩টি প্যান-টিল্ট-জুম (পিটিজেড) ক্যামেরা এবং ৪৭টি স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ বা এএনপিআর ক্যামেরা রয়েছে।

ক্যামেরার পাশাপাশি প্রকল্পে ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার, তথ্য সংরক্ষণের হার্ডওয়্যার এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইএফএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ক্যামেরা বসানোর স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে রামলীলা ময়দানের ভিভিআইপি গেট, তুর্কমান গেট, দিল্লি গেট, রাজঘাট, ইন্ডিয়া গেটের কাছে সি-হেক্সাগন, মান্ডি হাউস এবং পাটিয়ালা হাউস আদালত চত্বর।

এ ছাড়া, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির উত্তর জেলায় ভিভিআইপি যাতায়াতের রাস্তাগুলিতে ১৯৪টি ক্যামেরা বসানোর জন্য ২২ মে আলাদা একটি ই-বিড প্রকাশ করা হয়েছিল।

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে গোপনীয়তার উদ্বেগ

আইএফএফের প্রধান উদ্বেগ, প্রস্তাবিত মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা টেন্ডারের নথিতে স্পষ্ট নয়।

সংস্থাটি যে ঘাটতিগুলি চিহ্নিত করেছে, সেগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) নেই: মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কখন, কীভাবে এবং কোন শর্তে ব্যবহার করা হবে, তার নির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি স্পষ্ট করা হয়নি বলে আইএফএফের অভিযোগ।
  • গোপনীয়তার প্রভাব মূল্যায়নের অভাব: প্রযুক্তিটি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তার মূল্যায়ন সংক্রান্ত নথির ঘাটতি রয়েছে বলে দাবি।
  • কোন ডেটাবেসে মুখের মিল খোঁজা হবে, তা অস্পষ্ট: সংগৃহীত মুখের ছবি কোন কোন তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে সংস্থাটির বক্তব্য।
  • তথ্য সংরক্ষণের নিয়ম স্পষ্ট নয়: সংবেদনশীল তথ্য কত দিন রাখা হবে এবং কখন তা মুছে ফেলা হবে, তার সুস্পষ্ট নিয়মের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
  • ভুল শনাক্তকরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা: প্রযুক্তির নির্ভুলতার ন্যূনতম মান এবং ভুল ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ঝুঁকি কমানোর পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়নি বলে আইএফএফের অভিযোগ।

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিতে ভুল মিলের সম্ভাবনা থাকায় এই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ব্যক্তির মুখের সঙ্গে কোনও রেকর্ডের মিল পাওয়া গেলেই তিনি অপরাধে জড়িত, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তাই শনাক্তকরণের ফল যাচাই, তথ্য ব্যবহারের সীমা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট নীতি থাকা জরুরি।

টেন্ডারের নথিতে ২৮টি প্রক্রিয়াগত ত্রুটির অভিযোগ

গোপনীয়তার প্রশ্নের পাশাপাশি টেন্ডারের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক দিকেও ২৮টি সম্ভাব্য ত্রুটি চিহ্নিত করেছে আইএফএফ।

সংস্থাটির দাবি, নথিতে পিটিজেড এবং এএনপিআর ক্যামেরার সংখ্যা নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। কিছু প্রযুক্তিগত বিবরণ পুরনো টেন্ডার থেকে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। পাশাপাশি, নথিতে এমন স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের উল্লেখ রয়েছে, যাঁদের সংক্রান্ত তথ্য পুরনো হতে পারে।

ক্যামেরা বসানোর ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। আইএফএফের দাবি, একটি ক্যামেরার অবস্থান এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যা দিল্লির প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্বে পড়ে।

এই ত্রুটিগুলি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া এবং নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে এগুলি আইএফএফের নথি বিশ্লেষণে চিহ্নিত অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাচাই বা জবাব ছাড়া প্রতিটি ত্রুটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যায় না।

বিক্ষোভে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এনইইটি-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যন্তর মন্তরে হওয়া বিক্ষোভের সময় পুলিশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত মানুষের মুখ স্ক্যান করে অপরাধসংক্রান্ত ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কথা জানানো হয়।

দিল্লি পুলিশের দাবি অনুযায়ী, মুখ শনাক্তকরণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের সাহায্যে বিক্ষোভস্থলে ২,৮৭৩ জনকে শনাক্ত করা হয়, যাঁদের সম্ভাব্য অপরাধমূলক অতীত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৯৮৯ জনের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি এবং অস্ত্র আইনের অধীনে অপরাধের মতো বিষয়ে অতীতের রেকর্ড থাকার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

তবে এই পরিসংখ্যান পুলিশের দেওয়া তথ্য। কেবল কোনও ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে বা তাঁর বিরুদ্ধে অতীতের কোনও রেকর্ড থাকার দাবি করা হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে তিনি সংশ্লিষ্ট বিক্ষোভে অপরাধ করেছেন। এই দুই বিষয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।

সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে কেন ফের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন?

বর্তমান বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ককক্রোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে দলটি। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় অনিয়ম হয়েছে।

কনট প্লেসে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ মিছিল আটকানোর জন্য পুলিশের পদক্ষেপও জনসমাবেশ পরিচালনা এবং নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে আলোচনাকে বাড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে, দিল্লি পুলিশের এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় শুধু ক্যামেরার সংখ্যা বা খরচ নয়। মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কোন তথ্যের সঙ্গে মুখের মিল খোঁজা হবে, তথ্য কত দিন রাখা হবে, ভুল শনাক্তকরণ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত ত্রুটিগুলি কীভাবে সংশোধন করা হবে, সেগুলিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রকল্পের পক্ষে পুলিশের বক্তব্য, এটি আগে থেকে পরিকল্পিত আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ। অন্যদিকে, আইএফএফের বিশ্লেষণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

Get your daily dose of tech news and insight.  Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *