দর্শনীয় মণ্ডপের ভিড়ে নিরাপত্তা কোথায়? দুর্গাপুজোয় বাড়ছে প্রশ্ন - 24 Ghanta Bangla News
Home

দর্শনীয় মণ্ডপের ভিড়ে নিরাপত্তা কোথায়? দুর্গাপুজোয় বাড়ছে প্রশ্ন

Spread the love

কলকাতা: দুর্গাপুজো (Durga Puja) মানেই শিল্প, সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য আর উৎসবের আবহ। পুজোর সময় কলকাতা কার্যত পরিণত হয় এক বিশাল মুক্তাঙ্গন শিল্প প্রদর্শনীতে। কোথাও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আদলে মণ্ডপ, কোথাও বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতির ছোঁয়া, আবার কোথাও সমসাময়িক সামাজিক বিষয় কিংবা কল্পনার জগৎ ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। নজরকাড়া প্রতিমা, অভিনব থিম এবং চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা দেখতে প্রতি বছর কলকাতায় ভিড় জমান দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ। কিন্তু মণ্ডপের জাঁকজমক ও দর্শনার্থীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন, দর্শনীয় মণ্ডপ তৈরির প্রতিযোগিতায় জননিরাপত্তা কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?

সৃজনশীলতা ও প্রতিযোগিতায় অনন্য কলকাতার পুজো

কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল থিমভিত্তিক মণ্ডপ নির্মাণ। প্রচলিত মন্দিরের আদলের বাইরে গিয়ে পুজো উদ্যোক্তারা কখনও ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ, কখনও গ্রামবাংলার স্থাপত্য, আবার কখনও আধুনিক শিল্পকলা কিংবা সামাজিক বার্তাকে মণ্ডপের নকশায় তুলে ধরেন। অস্থায়ী কাঠামো, শিল্পকর্ম, আলো এবং শব্দের পরিকল্পনায় বিপুল অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করা হয়। দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করা হয় এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।

এলাকার সম্মান, স্পনসরশিপ, পুজোর পুরস্কার এবং সমাজমাধ্যমে প্রচারের আকর্ষণ এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে। কোনও মণ্ডপের অভিনব নকশা বা বিশাল আয়োজন তাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। সেই জনপ্রিয়তার টানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে সেখানে পৌঁছন। শ্রীভূমি, কলেজ স্কোয়ার, দেশপ্রিয় পার্ক, মহম্মদ আলি পার্ক এবং সুরুচি সংঘের মতো পুজো কলকাতার পরিচিত আকর্ষণগুলির মধ্যে পড়ে।

কলকাতার দুর্গাপুজোর গুরুত্ব শুধু শহর বা রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালে ইউনেস্কোর মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় কলকাতার দুর্গাপুজো স্থান পায়। এই স্বীকৃতি উৎসবটির সামাজিক অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং সমষ্টিগত সৃজনশীলতার গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরে।

ALSO READ | দেবীপক্ষে অঘটন তিলোত্তমায়! চোর বাগানে পদপিষ্ট হয়ে এখনও পর্যন্ত মৃত ১৮

জনপ্রিয়তাই কখন নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে?

যে বিপুল জনপ্রিয়তা দুর্গাপুজোকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে, সেটিই বড় ধরনের ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কলকাতায় হাজার হাজার পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের আনাগোনা চলে। বিশেষ করে রাতের দিকে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে যাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলি এবং জনপ্রিয় পুজো এলাকার প্রবেশপথে ভিড় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

মণ্ডপের প্রবেশদ্বার, সরু রাস্তা, বাঁক কিংবা বেরোনোর পথের কাছে ভিড় জমলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মানুষের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেলে, লাইনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে কিংবা হঠাৎ ভিড়ের একটি অংশ সামনে এগিয়ে গেলে পদপিষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একসঙ্গে ঢোকা ও বেরোনোর ভিড়ের সংঘাত, আতঙ্ক, বৃষ্টি এবং পিচ্ছিল রাস্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

অস্থায়ী মণ্ডপের কাঠামো, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং জরুরি পরিষেবার রাস্তা আটকে যাওয়ার মতো বিষয়ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে অ্যাম্বুল্যান্স বা উদ্ধারকারী দলের দ্রুত পৌঁছতে না পারা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে।

ALSO READ | ;নগরপালের পদত্যাগ চাই!; চোর বাগান দুর্ঘটনায় দাবি কুনালের

উত্তর কলকাতার দুর্ঘটনা ফের সামনে আনল ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন

উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে সাম্প্রতিক ভিড়ের চাপ ও পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে এই উদ্বেগ আরও সামনে এসেছে। শনিবার সন্ধ্যার ঘটনার পর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানানো হয়। ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ, ভিড়ের চাপ বৃদ্ধির কারণ এবং হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা জরুরি।

এই ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, বড় উৎসবে শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্য বা দর্শনার্থীর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যায় না। কতটা সুশৃঙ্খলভাবে মানুষ প্রবেশ করছেন, কত সহজে বেরিয়ে আসতে পারছেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কত দ্রুত সাহায্য পৌঁছচ্ছে, সেগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভিড় নিয়ন্ত্রণে কী কী ব্যবস্থা জরুরি?

ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা পুজোর প্রস্তুতির শুরু থেকেই করা দরকার। প্রবেশ ও বেরোনোর জন্য আলাদা পথ, নিয়ন্ত্রিত সারি, পর্যাপ্ত আলো, নির্দিষ্ট জরুরি করিডর এবং কৌশলগতভাবে ব্যারিকেড বসানো বিপজ্জনক জট কমাতে সাহায্য করতে পারে। মণ্ডপের আশপাশে কতজন মানুষ একসঙ্গে থাকতে পারবেন, কোন পথে ভিড় সরানো হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে প্রবেশ সাময়িক বন্ধ করতে হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা জরুরি।

পুলিশের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, সিসিটিভি নজরদারি এবং বাস্তব সময়ে ভিড়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির পূর্বাভাস পাওয়া সহজ হতে পারে। ভিড় দ্রুত বাড়তে শুরু করলে আগেভাগে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা, দর্শনার্থীদের বিকল্প পথে পাঠানো এবং জরুরি পরিষেবার রাস্তা খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শুধু প্রযুক্তি বা ব্যারিকেডই যথেষ্ট নয়। উদ্যোক্তা, পুলিশ, প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয় থাকতে হবে। দর্শনার্থীদেরও নির্দেশ মেনে চলা, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি না করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি এড়ানো প্রয়োজন।

ঐতিহ্য রক্ষার শর্তই জননিরাপত্তা

কলকাতার দুর্গাপুজোর আকর্ষণ তার শিল্প, সৃজনশীলতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে। এই ঐতিহ্যকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরতে মণ্ডপের অভিনবত্ব ও আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা যেন পিছনে পড়ে না থাকে।

দুর্গাপুজো মানুষের আনন্দ, মিলন এবং সাংস্কৃতিক উদ্‌যাপনের উৎসব। তাই সুন্দর মণ্ডপ তৈরির পাশাপাশি নিরাপদে দর্শন, সুশৃঙ্খল চলাচল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তার নিশ্চয়তা দেওয়াও সমান জরুরি। উৎসবের সাফল্য শুধু কত মানুষ মণ্ডপ দেখতে এলেন, তা দিয়ে নয়, তাঁরা কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরলেন, তা দিয়েও বিচার করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *