রুশ জিপিএস জালিয়াতিতে পথভ্রষ্ট ইউক্রেনের ড্রোন? লিথুয়ানিয়ার কাছে ক্ষমা কিয়েভের
কিয়েভ: রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর অভিযানের সময় ইউক্রেনের ড্রোন ভুল করে লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে থাকতে পারে। এই ঘটনার জন্য রবিবার লিথুয়ানিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়েছে ইউক্রেন। কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির কারণে ড্রোনের গতিপথ বদলে গিয়ে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বাল্টিক অঞ্চলে একের পর এক ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনার মধ্যে রাশিয়ার জিপিএস সিগন্যাল বিকৃত করার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র হরহি তিখি সমাজমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অভিযানের সময় রুশ ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার কারণে ড্রোনের গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঘটনার জন্য লিথুয়ানিয়ার কাছে দুঃখপ্রকাশ করে তিনি জানান, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক তথ্য ভাগ করে নিতে প্রস্তুত কিয়েভ।
তবে ড্রোনটি ঠিক কীভাবে লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ঢুকেছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থাই এর কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।
কালিনিনগ্রাদ থেকে ৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত জিপিএস সিগন্যাল বিকৃতির আশঙ্কা
রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চলে জিপিএস সিগন্যাল বিকৃত করার পরিকাঠামো দ্রুত বাড়ছে বলে দাবি করেছে লিথুয়ানিয়া। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিথুয়ানিয়ার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপপ্রধান দারিউস কুলিয়েশিয়াস জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের গোড়ায় কালিনিনগ্রাদে তিনটি জিপিএস স্পুফিং অ্যান্টেনা ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৬ হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার একটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত এই ভূখণ্ডের একদিকে ন্যাটো সদস্য লিথুয়ানিয়া, অন্যদিকে পোল্যান্ড। কুলিয়েশিয়াসের দাবি, এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে জিপিএস সিগন্যাল বিকৃত করার সক্ষমতা থাকতে পারে রাশিয়ার।
লিথুয়ানিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থার তৈরি একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, এই ধরনের সিগন্যালের বিঘ্ন এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার বিস্তীর্ণ অংশ, পোল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকা এবং ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও বেলারুশের কিছু অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে পারে। বাল্টিক সাগর এলাকাও এর আওতায় পড়তে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিমান চলাচলের নজরদারি ব্যবস্থায় ব্যবহৃত এডিএস-বি সংকেতের বিঘ্ন বিশ্লেষণ করে এই সম্ভাব্য পরিসর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুলিয়েশিয়াস। তবে এই মানচিত্রে দেখানো অঞ্চলগুলির প্রতিটি অংশে একই মাত্রায় বা সব সময় সিগন্যালের বিঘ্ন ঘটছে, এমনটা নিশ্চিত নয়।
কী এই জিপিএস স্পুফিং?
জিপিএস স্পুফিং হল এমন একটি ইলেকট্রনিক কৌশল, যেখানে আসল স্যাটেলাইট সংকেতের পরিবর্তে বিভ্রান্তিকর বা ভুয়ো অবস্থান-সংক্রান্ত সংকেত পাঠানো হয়। এর ফলে কোনও ড্রোন, গাড়ি, জাহাজ বা অন্য নেভিগেশন ব্যবস্থা নিজের প্রকৃত অবস্থান ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
জিপিএস জ্যামিংয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। জ্যামিংয়ের ক্ষেত্রে শক্তিশালী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আসল সংকেত দুর্বল করা বা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, স্পুফিংয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে নেভিগেশন ব্যবস্থাকে ভুল অবস্থান বা দিক সম্পর্কে বিশ্বাস করানো।
ড্রোনের ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেক ড্রোনের উড়ানপথ নির্ধারণ, অবস্থান বোঝা এবং লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট নেভিগেশন বড় ভূমিকা পালন করে। সংকেত বিকৃত হলে ড্রোন নির্ধারিত পথ থেকে সরে যেতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ড্রোনের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ জিপিএস স্পুফিংই ছিল কি না, তা প্রমাণের জন্য আলাদা তথ্য ও তদন্ত প্রয়োজন।
লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তার আরও দাবি, কালিনিনগ্রাদের কাছে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কেও কিছু ক্ষেত্রে সিগন্যালের মান কমে যাচ্ছে। ক্লাইপেদা শহরে জিপিএসের উপর নির্ভরশীল অনলাইন বাসের সময়সূচি ও অবস্থান নির্ণয়ের পরিষেবাও সিগন্যালের বিঘ্নের সময় কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রাশিয়া অবশ্য ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ আগেও অস্বীকার করেছে। এই বিষয়ে রাশিয়ার ভিলনিয়াস দূতাবাসের কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এস্তোনিয়ার আকাশে সন্দেহভাজন ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছিল ন্যাটোর যুদ্ধবিমান
বাল্টিক অঞ্চলে ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা এই প্রথম নয়। ১৯ মে এস্তোনিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, রাশিয়ার দিক থেকে তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি সন্দেহভাজন ইউক্রেনীয় ড্রোনকে রোমানিয়ার একটি ন্যাটো যুদ্ধবিমান গুলি করে নামায়।
এস্তোনিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে ড্রোনটি দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় ঢোকে। দুপুর ১২টা ১৪ মিনিটে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। ওই সময় রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের কারণে জিপিএস স্পুফিং ও জ্যামিং চলছিল বলেও দাবি করেছিল এস্তোনিয়ার সামরিক বাহিনী।
ন্যাটো জানিয়েছিল, এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে রোমানিয়ার যুদ্ধবিমান এবং ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় জোট প্রস্তুত বলেও জানানো হয়েছিল।
একই দিনে লাতভিয়াতেও ড্রোন অনুপ্রবেশের পর বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। রুশ সীমান্তের কাছে বসবাসকারী মানুষকে ঘরের ভিতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ন্যাটোর বাল্টিক এয়ার পুলিশিং যুদ্ধবিমানকে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সতর্কতার কারণে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়, নবম শ্রেণির পড়ুয়াদের জাতীয় পরীক্ষা স্থগিত করা হয় এবং কিছু মুদি দোকান বন্ধ রাখা হয়।
তবে এস্তোনিয়া ও লাতভিয়ায় ঢোকা ড্রোন দুটি একই ছিল, নাকি আলাদা, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
ইউক্রেনের হামলার অধিকার মানলেও নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বাল্টিক দেশগুলি
লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার মতো বাল্টিক দেশগুলি রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ জানালেও নিজেদের ভূখণ্ড থেকে ইউক্রেনকে রাশিয়ায় হামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি বলে স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে রুশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপের অধিকার রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর আগে জানিয়েছিলেন, লাতভিয়ার আকাশসীমা সুরক্ষায় সহায়তা করতে বিশেষজ্ঞ পাঠাবে কিয়েভ। তবে ড্রোন অনুপ্রবেশের পুনরাবৃত্তি বাল্টিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও ন্যাটোর আকাশসীমা রক্ষার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ইউরোপীয় নেতাদের বিমানেও জিপিএস হস্তক্ষেপের অভিযোগ
এর আগেও কালিনিনগ্রাদের আশপাশে জিপিএস হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। গত বছর স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রব্লেসকে বহনকারী একটি সামরিক বিমানে ওই অঞ্চলের কাছে জিপিএসের বিঘ্ন ঘটেছিল বলে জানা যায়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনকে বহনকারী একটি বিমানও বুলগেরিয়া যাওয়ার পথে জিপিএস হস্তক্ষেপের মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ডও ওই অঞ্চলের আকাশসীমায় জিপিএস জ্যামিংয়ের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। ১৫ মে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি অঞ্চলে সন্দেহভাজন ড্রোনের উপস্থিতির খবরের পর বিমানবন্দরে প্রায় তিন ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনী যুদ্ধবিমান পাঠালেও শেষ পর্যন্ত কোনও ড্রোনের সন্ধান মেলেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাস থেকে ফিনল্যান্ড, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় একাধিক ইউক্রেনীয় সামরিক ড্রোন পথভ্রষ্ট হয়ে প্রবেশ করেছে। এই চারটি দেশই রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ন্যাটো সদস্য।
বাল্টিক অঞ্চলে ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাতভিয়ার সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল। ১৯ মে-র ঘটনার আগের সপ্তাহে ড্রোন অনুপ্রবেশ মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে লাতভিয়ার সরকার পদত্যাগ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাল্টিক অঞ্চলে জিপিএস স্পুফিং ও জ্যামিং নিয়ে উদ্বেগ শুধু সামরিক ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিমান চলাচল, মোবাইল পরিষেবা এবং পরিবহণ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় সাম্প্রতিক ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং রুশ ইলেকট্রনিক যুদ্ধের ভূমিকা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য ও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।