শত্রু ড্রোন শনাক্তে সেনাদের পোশাকে বিশেষ সেন্সর আনছে আমেরিকা
নয়াদিল্লি: যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের ড্রোনের নজরদারি ও আকস্মিক হামলা থেকে সেনাদের রক্ষা করতে নতুন প্রযুক্তি (Military Technology) তৈরির পরিকল্পনা করছে আমেরিকার সেনাবাহিনী। এবার সেনাদের পরিধেয় হালকা সেন্সরের মাধ্যমে শত্রু ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি সফল হলে ড্রোনের আওয়াজ বিশ্লেষণ করে সেনাদের সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকল্পটি এখনও গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রযুক্তিটির বাস্তব পরীক্ষা এখনও হয়নি।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম Defense News-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীর Combat Capabilities Development Command-এর C5ISR Center এই প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। লক্ষ্য হল এমন ছোট ও হালকা সেন্সর তৈরি করা, যা ড্রোনের নির্দিষ্ট শব্দের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারবে। ভবিষ্যতে এই সেন্সরকে বিশেষ সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করে ড্রোনের ধরন চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সেনাদের সতর্ক করার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?
মার্কিন সেনাবাহিনীর C5ISR Center-এর ডিরেক্টর বেথ পেরি জানিয়েছেন, সেনাদের শরীরে বহনযোগ্য হালকা সেন্সরের মাধ্যমে ড্রোনের স্বতন্ত্র শব্দ শনাক্ত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, এটি একটি প্রাথমিক উদ্ভাবনী প্রকল্প। ভবিষ্যতে সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য সফটওয়্যারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে ড্রোন শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী সেনাদের বা তাঁদের ইউনিটকে পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করা যেতে পারে।
সোলজার অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম মিশন ইকুইপমেন্ট বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর জামি ডেভিসের মতে, কোনও মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা UAS তাঁদের উপর নজর রাখছে কি না, তা জানা সেনাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সেনাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ভারী সরঞ্জাম বহন করানো এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। বরং বর্তমানে ব্যবহৃত প্রযুক্তিকে আরও ছোট, হালকা এবং একীভূত করে এমন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে, যাতে সেনাদের চলাফেরার উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ কেন বদলে দিয়েছে সামরিক কৌশল?
ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখিয়েছে, তুলনামূলকভাবে ছোট ও সস্তা ড্রোনও যুদ্ধক্ষেত্রে বড় বিপদ তৈরি করতে পারে। নজরদারি ড্রোনের মাধ্যমে সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে কামানের গোলাবর্ষণ কিংবা ড্রোন হামলা চালানো সম্ভব।
বিশেষ করে ফার্স্ট-পারসন-ভিউ বা FPV ড্রোন, যেগুলি সরাসরি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ সামনের সারির কিছু এলাকাকে ‘কিল জোন’ বলে বর্ণনা করেছেন। এই এলাকায় সেনারা এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যাওয়ার সময় সহজেই নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারেন।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে Reuters-এর এক প্রতিবেদনে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন নজরদারির কারণে সেনাদের চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরিস্থিতির চাপে সেনাদের বিচ্ছিন্ন অবস্থানে আশ্রয় নিতে এবং ছোট দলে চলাচল করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ড্রোনের বিপদ শুধু বিস্ফোরক বহনকারী আক্রমণকারী ড্রোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নজরদারি ড্রোন সেনাদের অবস্থান প্রকাশ করে দিতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুপক্ষ কামানের গোলাবর্ষণ বা পরবর্তী হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।
কয়েক সেকেন্ডের সতর্কবার্তাও গুরুত্বপূর্ণ
যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও সেনা বুঝতে পারলেন যে কাছাকাছি শত্রু ড্রোন রয়েছে, তা হলে তিনি দ্রুত আড়ালে যাওয়া, চলাচল সীমিত করা কিংবা নিজের ইউনিটকে সতর্ক করার সুযোগ পেতে পারেন। এই ধরনের পরিধেয় প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য সেই আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
তবে সেন্সর ড্রোন শনাক্ত করতে পারলেই হামলা ঠেকানো নিশ্চিত হবে না। ড্রোন কত দূরে রয়েছে, পরিবেশের শব্দ কতটা বাধা সৃষ্টি করছে এবং সেন্সর কত দ্রুত সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারছে, তার উপরও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
ইউক্রেনের প্রযুক্তি থেকে শিক্ষা
ইউক্রেনেও ড্রোন শনাক্ত করার জন্য শব্দভিত্তিক সেন্সর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে। Sky Fortress, Zvook এবং FENEK-এর মতো ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম খরচের অ্যাকুস্টিক সেন্সর ব্যবহার করে ড্রোনের শব্দ শনাক্ত করা এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়।
মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রস্তাবিত প্রযুক্তির বিশেষত্ব হল, এই ধারণাকে সরাসরি ব্যক্তিগত সেনার কাছে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, কোনও আলাদা নজরদারি দল বা গাড়িতে বসানো ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে সেনা নিজেই ড্রোনের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেতে পারেন।
তবে প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় সেন্সরের নির্ভুলতা, কার্যকর দূরত্ব, ব্যাটারির স্থায়িত্ব কিংবা কবে এটি সেনাদের হাতে পৌঁছতে পারে, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সামরিক বাহিনীগুলিকে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরিতে বাধ্য করছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ সফল হলে শত্রু ড্রোনের উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পরীক্ষা ও উন্নয়নের উপর।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।