হে বাঙালি, তুমি আদতে কোথা হইতে আসিয়াছ?
সব বাঙালির ডিএনএ এক নয়
বাঙালির মধ্যে পূর্ব এশীয় বংশধারার গড় অবদান পাঁচ থেকে পনেরো শতাংশের মধ্যে বলে কিছু বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যা প্রত্যেক বাঙালির জন্য নির্দিষ্ট মাপ বা ‘বেঞ্চমার্ক’ নয়। অঞ্চল, সম্প্রদায় এবং পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী এই অনুপাত বদলে যায়। কিছু গোষ্ঠীতে উত্তর-পশ্চিম ইউরেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বংশধারার অবদান তুলনায় বেশি হতে পারে। অন্যদের মধ্যে আবার প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় বা পূর্ব এশীয় উপাদানের প্রভাব বেশি দেখা যায়। দীর্ঘ কাল ধরে সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহের নিয়ম এই পার্থক্য ধরে রাখতে ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতে এই ফারাক কতটা বদলাবে, তা নির্ভর করবে মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের উপর।
নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত যোগ
বাঙালির জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়গুলির একটি হলো দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের সঙ্গে সম্ভাব্য জিনগত যোগসূত্র। ব্রাজ়িলের গবেষকেরা আমেরিকার আদিবাসীদের জিনগত ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীদের পূর্বপুরুষেরা বহু হাজার বছর আগে এশিয়া থেকে সাইবেরিয়া হয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। সেই প্রাচীন বংশধারার সঙ্গে আজকের কোন এশীয় জনগোষ্ঠীর জিনগত মিল বেশি, তা খুঁজতে গিয়ে পরীক্ষিত নমুনাগুলির মধ্যে বাংলাদেশের বাঙালিদের একটি বংশধারার সঙ্গে তুলনামূলক মিল পাওয়া গিয়েছে বলে সেখানে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই মিলের অর্থ, বাঙালিরা আমেরিকার আদিবাসীদের প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষ, এমন নয়। কিংবা, বাঙালিরা আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিল, এমন দাবিও এর থেকে করা যায় না। বরং পরীক্ষিত জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি প্রাচীন সাধারণ বংশধারার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত উপাদানের মিলের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাসে অভিবাসন ও সংমিশ্রণের যে জটিল জাল রয়েছে, এই অনুসন্ধান তারই একটি সূত্র।
বাঙালির জিনগত পরিচয় কোনও একক উৎসের গল্প নয়। প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় শিকারি-সংগ্রাহক, ইরানের মালভূমির কৃষিজীবী, মধ্য এশিয়ার পশুপালক এবং পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন জনগোষ্ঠী— বিভিন্ন সময়ের নানা ধারার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ ইতিহাস। তবে চারটি উৎসের এই ব্যাখ্যা একটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক ছবির সরল রূপ মাত্র। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত বংশপরিচয় এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। দক্ষিণ এশিয়ার বহু জনগোষ্ঠীর শরীরে প্রধানত তিনটি বড় বংশধারার বিভিন্ন অনুপাতের মিশ্রণ দেখা যায়। বাঙালিদের ক্ষেত্রে পূর্ব এশীয় বংশধারার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি তাঁদের জিনগত ইতিহাসকে আরও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।