অ্যাপলে গোপন ফাইল ফাঁসের অভিযোগ, আদালতে OpenAI
ওয়াশিংটন: চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের (OpenAI) এক প্রাক্তন কর্মী অ্যাপলে যোগ দেওয়ার আগে সংস্থার অপ্রকাশিত একটি পণ্য সম্পর্কে ১০০টিরও বেশি গোপন ফাইল ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে তিনি সেই পণ্য সম্পর্কে অ্যাপলের শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে উপস্থাপনাও করেন বলে দাবি করেছে ওপেনএআই। অ্যাপল ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে চলতে থাকা বাণিজ্যিক গোপন তথ্য সংক্রান্ত আইনি বিরোধে আদালতে জমা দেওয়া নতুন নথিতে এই অভিযোগ সামনে এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসে ফেডারেল আদালতে জমা দেওয়া নথিতে ওপেনএআই জানিয়েছে, কয়েক মাস আগেই ওই উপস্থাপনা হয়েছিল। সংস্থার আশঙ্কা, তাদের গোপন বাণিজ্যিক তথ্য এখন অ্যাপলের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে অ্যাপলের ইঞ্জিনিয়াররা ভবিষ্যতের পণ্য তৈরি করতে পারেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওপেনএআই।
তবে অ্যাপল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থার বক্তব্য, অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট নীতি ও পদ্ধতি রয়েছে, যাতে কর্মীরা আগের নিয়োগকর্তার গোপন তথ্য ব্যবহার না করেন। অ্যাপল আরও জানিয়েছে, তাদের তদন্তে ওপেনএআইয়ের অভিযোগ সমর্থন করার মতো কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
১০০টিরও বেশি ফাইল পাঠানোর অভিযোগ
আদালতে জমা দেওয়া নতুন নথি অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের এক কর্মী সংস্থা ছেড়ে অ্যাপলে যোগ দেওয়ার সময় অপ্রকাশিত একটি পণ্য সম্পর্কে ১০০টিরও বেশি ফাইল ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ওই কর্মী অ্যাপলের শীর্ষ কর্তাদের সামনে পণ্যটি নিয়ে উপস্থাপনা করেন বলেও দাবি ওপেনএআইয়ের।
ওপেনএআইয়ের বক্তব্য, তাদের বাণিজ্যিক গোপন তথ্য এবং গোপনীয় নথি অ্যাপলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা ভবিষ্যতের পণ্য তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আদালতে সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবনী কাজের উপর ভিত্তি করে অ্যাপলের ইঞ্জিনিয়াররা নিজেদের আসন্ন পণ্যের পরিকল্পনা করতে পারেন বলে তারা উদ্বিগ্ন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ওই কর্মীর পরিচয় বা ফাইলগুলিতে ঠিক কী ধরনের তথ্য ছিল, তা প্রদত্ত নথির বিবরণে স্পষ্ট নয়। একইভাবে অ্যাপলের কোনও পণ্যে ওই তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও এখনও কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এই অভিযোগকে আপাতত ওপেনএআইয়ের দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
অ্যাপলের পাল্টা বক্তব্য কী?
অ্যাপল জানিয়েছে, ওপেনএআই যে দুটি ব্যক্তিগত ফোন নম্বরকে ফাইল পাঠানোর সম্ভাব্য প্রাপক হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলি ওই কর্মীর অ্যাপলে কাজের জন্য ব্যবহৃত নম্বরের সঙ্গে মেলে না। ১২ অক্টোবর ওপেনএআইকে পাঠানো একটি চিঠিতে অ্যাপলের আইনজীবীরা এই বক্তব্য জানান। বুধবার অন্য একটি আদালতের নথির মাধ্যমে চিঠিটি প্রকাশ্যে আসে।
অ্যাপলের আইনজীবীদের বক্তব্য, ওই কর্মী ওপেনএআইয়ে কাজ করার সময় যে দুটি নম্বরে ফাইল পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, সেগুলির তথ্য অ্যাপলের কাছে ছিল বা অ্যাপল সেগুলির নিয়ন্ত্রণ করত, এমন কোনও প্রমাণ নেই। পাশাপাশি, ওই কর্মীর কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সার্ভার ও ডিজিটাল তথ্যভান্ডার পরীক্ষা করেও অ্যাপলের সার্ভারে ওপেনএআইয়ের ফাইল থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
অ্যাপল আরও দাবি করেছে, ওপেনএআইয়ের অপ্রকাশিত পণ্য নিয়ে ওই কর্মী অ্যাপলের শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে কোনও উপস্থাপনা করেছিলেন, এমন তথ্যও তাদের তদন্তে সামনে আসেনি। এই বিষয়ে আরও তথ্য দেওয়ার জন্য ওপেনএআইকে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।
অ্যাপলের অভিযোগ, ওপেনএআই তাদের অনুরোধের জবাব না দিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, অভিযোগের তদন্তে তারা ওপেনএআইয়ের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
পুরনো মামলা থেকেই নতুন বিতর্ক
এই বিরোধের সূত্রপাত চলতি বছরের গোড়ায়। অ্যাপল তখন অভিযোগ করেছিল, তাদের কয়েকজন কর্মী সংস্থা ছেড়ে ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগে যোগ দেওয়ার সময় গোপন তথ্য সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। ওপেনএআই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এবার ওপেনএআইয়ের পাল্টা অভিযোগে দুই প্রযুক্তি সংস্থার মধ্যে চলা আইনি লড়াই আরও জটিল হয়েছে। একদিকে অ্যাপল অভিযোগ করছে, তাদের প্রাক্তন কর্মীরা গোপন তথ্য নিয়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের দাবি, তাদের এক প্রাক্তন কর্মী অ্যাপলে যোগ দেওয়ার আগে অপ্রকাশিত পণ্য সম্পর্কে ফাইল সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং পরে সেই তথ্য অ্যাপলের নেতৃত্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
দুই সংস্থার এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ প্রযুক্তি শিল্পে কর্মী নিয়োগ, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা এবং মেধাস্বত্বের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে ওপেনএআই যখন নিজস্ব গ্রাহককেন্দ্রিক হার্ডওয়্যার পণ্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে প্রভাবশালী অ্যাপলের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
আদালতে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের অনুমতি
চলতি সপ্তাহের গোড়ায় মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক এডওয়ার্ড ডাভিলা এই মামলায় অ্যাপলের একটি আবেদনের অংশবিশেষ মঞ্জুর করেছেন। এর ফলে অ্যাপল তার কয়েকজন প্রাক্তন কর্মীর ডিভাইস থেকে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এবং দ্রুত নির্ধারিত সময়সূচিতে তিনজনের জবানবন্দি নিতে পারবে।
এই তিনজনের মধ্যে রয়েছেন মামলার দুই অভিযুক্ত চ্যাং লিউ, যিনি আগে অ্যাপলের সিনিয়র সিস্টেমস ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, এবং ট্যাং ইয়ু ট্যান, যিনি আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের প্রোডাক্ট ডিজাইনের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আদালতের এই নির্দেশ মামলার তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
মামলাটির বিচার ২০২৭ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওপেনএআই আদালতে জানিয়েছে, তারা চাইলে ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যেই বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
প্রযুক্তি শিল্পে মেধাস্বত্ব নিয়ে বাড়ছে চাপ
ওপেনএআই ও অ্যাপলের মধ্যে এই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। অভিযোগের সত্যতা, ফাইলগুলির প্রকৃতি এবং সেগুলি কোনও পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা আদালতের প্রক্রিয়ায় আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বর্তমানে দুই সংস্থার বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ওপেনএআই গোপন তথ্য অন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অ্যাপল আবার জানিয়েছে, তাদের তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মেলেনি। ফলে আদালতের সামনে জমা পড়া নথি এবং পরবর্তী তদন্তের ফল এই মামলার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.