ভারতে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি ১১.৩৯%, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বাড়ছে চাপ - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভারতে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি ১১.৩৯%, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বাড়ছে চাপ

Spread the love

ভারতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ল। খাদ্যপণ্য, উৎপাদিত সামগ্রী এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জেরে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের পাইকারি মূল্যসূচকভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতি বা ডব্লিউপিআই ইনফ্লেশন (Wholesale Inflation) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১.৩৯ শতাংশে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই হার সংশ্লিষ্ট সূচকের সিরিজে সর্বোচ্চ। আগস্টে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৯.৯২ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ধাতুর দাম বেশি থাকা, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এই পরিস্থিতির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। এর প্রভাব আগামী মাসগুলিতেও বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি ৮.৬৬ শতাংশ

সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য সূচকের মুদ্রাস্ফীতি আগস্টের ৭.০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৮.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশেষ করে খাদ্যশস্য, ডাল, ফল এবং সবজির দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্যপণ্যের পাইকারি মূল্যসূচকে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা আইসিআরএ-র প্রধান অর্থনীতিবিদ রাহুল আগরওয়ালের মতে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি ২৩ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে উৎপাদক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। সেই চাপ পরবর্তী সময়ে খুচরো বাজারেও পড়তে পারে, যদিও পাইকারি ও খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার সব সময় একইভাবে পরিবর্তিত হয় না।

উৎপাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও রেকর্ড স্তরে

শুধু খাদ্যপণ্য নয়, উৎপাদিত সামগ্রীর ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত পণ্যের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি আগস্টের ৮.৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৯.৭৬ শতাংশ হয়েছে। এই হারও সংশ্লিষ্ট সূচকের সিরিজে সর্বোচ্চ বলে জানানো হয়েছে।

উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, ধাতু, জ্বালানি এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লে শিল্প সংস্থাগুলির সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সংস্থাগুলির মুনাফার হার, পণ্যের দাম নির্ধারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ২৫.৮৫ শতাংশ

সেপ্টেম্বরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি আরও বেশি ছিল। আগস্টের ২২.৯৩ শতাংশ থেকে বেড়ে এই হার ২৫.৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির একটি বড় অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।

জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে পরিবহণ, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অক্টোবরে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি ১২ শতাংশে পৌঁছতে পারে

আইসিআরএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্যের বাজারে স্বস্তি না ফেরায় ২০২৬ সালের অক্টোবরে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

সংস্থাটির মতে, প্রতিকূল বেস ইফেক্টও আগামী মাসগুলিতে মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়িয়ে দেখাতে পারে। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনামূলক কম মূল্যস্তরের কারণে বর্তমান বছরের বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বেশি দেখা যেতে পারে।

আইসিআরএ-র অর্থনীতিবিদ রাহুল আগরওয়াল আরও জানিয়েছেন, ২০২৭ অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিক জুড়েও পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আর্থিক পরিষেবা সংস্থা বার্কলেসও সতর্ক করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ধাতুর দাম উঁচু স্তরে থাকলে আগামী মাসগুলিতে পাইকারি এবং উৎপাদক মূল্যসূচকভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

উৎপাদক মূল্যসূচকেও বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধির চাপ

উৎপাদক মূল্যসূচক বা আউটপুট প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্সের মুদ্রাস্ফীতিও সেপ্টেম্বরে বেড়েছে। বার্কলেসের তথ্য অনুযায়ী, এই হার আগস্টের ৯.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে বার্ষিক হিসাবে ১১.৪ শতাংশ হয়েছে।

উৎপাদন ও খনন ক্ষেত্রের মূল্যবৃদ্ধি এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির চাপ শুধু পাইকারি বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরেও তার প্রভাব পড়ছে।

শিল্পমহলের সংগঠন পিএইচডিসিসিআই-এর সেক্রেটারি জেনারেল ও সিইও রণজিৎ মেহতার মতে, সর্বশেষ পাইকারি মূল্যসূচকের পরিসংখ্যান উৎপাদনের একাধিক স্তরে মূল্যবৃদ্ধির চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাইকারি দাম বাড়লেই খুচরো বাজারে একই হারে দাম বাড়ে না। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সংস্থাগুলির মুনাফা, কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে।

খুচরো মুদ্রাস্ফীতিও ২৩ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে

পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরো বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে খুচরো মুদ্রাস্ফীতি আগস্টের ৪.৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৫.৫৪ শতাংশ হয়েছে। এই হারও ২৩ মাসের সর্বোচ্চ।

খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই খুচরো মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির অন্যতম প্রধান কারণ বলে জানানো হয়েছে। এর অর্থ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার খরচেও চাপ বাড়ছে।

এদিকে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি কমিটি গত সপ্তাহে নীতিগত সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও এর প্রভাব ঋণের খরচ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপরও পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষ ও শিল্পক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়তে পারে?

পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি সরাসরি খুচরো মূল্যবৃদ্ধির সমান নয়। তবে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং উৎপাদনের উপকরণের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে ভোক্তা বাজারে পৌঁছতে পারে।

এর ফলে ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে এবং কিছু পণ্যের খুচরো দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য ও পরিবহণের খরচ বাড়লে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটেও চাপ পড়তে পারে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির রেকর্ড বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি, খাদ্যপণ্যের সরবরাহ এবং আগামী মাসগুলিতে মূল্যসূচকের গতিপ্রকৃতিই নির্ধারণ করবে এই চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *